Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

মানুষের আস্থাটুকুই সিপিএমের অধরা

মহম্মদ সেলিমের গত কয়েকটা ব্রিগেড বক্তৃতায় একটি বাক্য ভীষণ ‘কমন’, ‘কমরেড... এখান থেকে ফিরে আর বিশ্রাম নয়।’ তাঁর বার্তা, ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে।

মানুষের আস্থাটুকুই সিপিএমের অধরা
  • ২২ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: মহম্মদ সেলিমের গত কয়েকটা ব্রিগেড বক্তৃতায় একটি বাক্য ভীষণ ‘কমন’, ‘কমরেড... এখান থেকে ফিরে আর বিশ্রাম নয়।’ তাঁর বার্তা, ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। লড়াই করতে হবে দুর্নীতি, পুঁজিবাদী শ্রেণি, আর সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে (তিনি নিজে কতটা অসাম্প্রদায়িক, সে ব্যাপারে তুমুল বিতর্ক চলতে পারে)। কিন্তু যে কথাটা তিনি বলেন না—এবার শূন্যের গেরো থেকে বেরতে হবে। ওটা বারবারই উহ্য থেকে যাচ্ছে। শূন্যের মাহাত্ম্য প্রবল, যদি তা কোনও সংখ্যার পরে বসে। আর সেই সংখ্যাটাই হাতড়ে চলেছেন মহম্মদ সেলিম। তাঁর সঙ্গে সিপিএমের বাকি কর্তাব্যক্তিরাও। ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন হয়তো তাঁরা দেখছেন, কিন্তু তা এখন ডিয়ার লটারিতে ৫ কোটি টাকা জেতার মতো আকাশ কুসুম ছাড়া কিছু নয়। আপাতত কেউ যেন শূন্য দিয়ে খোঁটা না দিতে পারে... এটাই অ্যাম্বিশন। রবিবারের ব্রিগেড কি তাঁদের জন্য আশার নতুন সূর্যোদয় ঘটাল? থাক... সূর্য না হোক, মৃদু টর্চের আলো কি পড়ল? 

Advertisement

বিধানসভা নির্বাচনের এখনও বছর খানেক বাকি। আর এখনও উত্তরটা ‘না’ ছাড়া কিছু নয়। প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘না’ কেন? সিপিএমের চারটি গণসংগঠনের ডাকে এই যে লাখখানেক লোক হল ব্রিগেডে, ১৮ থেকে ৮১ ভিড় করলেন, সাড়া দিলেন মেহনতি মানুষের সংগঠনের ডাকে... সেই সবই কি ফাঁকা কলসি নাকি? বাংলার রাজনীতি গত তিন দশকে একটা বিষয় দেখিয়েছে, জনসভায় কত লোক হল, তা দিয়ে ভোট হয় না। আমাদের রাজ্যে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি। গত বছরের লোকসভা ভোটের নিরিখে সিপিএমের প্রাপ্তি মাত্র ৬.৩৩ শতাংশ। তারা বলতেই পারে, কংগ্রেসের সঙ্গে জোট ছিল। না হলে আরও বাড়ত। কিন্তু বেড়ে কত হতো? ৮ শতাংশ! তাহলেও মোট প্রাপ্তিযোগ ৬০ লক্ষ ভোটারের আশপাশেই ঘোরাফেরা করত। কারণ, কংগ্রেসেরও কিছু কমিটেড ভোটার রয়েছে। সিপিএম হার্মাদদের অত্যাচার এত সহজে তাঁরা ভুলে যেতে পারছেন না। দুটো মেলালেও কিন্তু বাম-কংগ্রেসের কমিটেড ভোটার ১০ শতাংশ ছাড়াবে না। আর হ্যাঁ, শুধু কমিটেড ভোটার দিয়ে নির্বাচন জেতা যায় না। কোটি কোটি মানুষ রাজনীতির আঙিনার বাইরে আছেন। থাকেন। থাকবেন। ইভিএমের বোতামে চাপ দেওয়ার আগে তাঁদের মনে একটাই প্রশ্ন ভেসে ওঠে, এ আমার জন্য কী করবে? তখন কোনও তত্ত্বকথা, আদর্শ তাঁর সামনে আসে না। উঁকি দেয় শুধু ভবিষ্যৎ চিন্তা। আমার কাজ থাকবে তো? আমার হাতে টাকার জোগান কমে যাবে না তো? আমার সন্তান স্কুলে যেতে পারবে তো? আমার মেয়ের বিয়ে ঠিকমতো দিতে পারব তো? এই প্রশ্নগুলোই তখন তাড়া করে তাঁকে। আর তিনি ভাবেন একটি ছবি... যে দলকে ভোট দেবেন, তাঁর মাথায় যে বসে আছে। নেতৃত্বের ব্যাটন যার হাতে। গত ১৫ বছর ধরে সাধারণ মানুষের মনে তাঁর ছবিটা ধরে রাখতে পেরেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সিপিএম দাবি করে, তাঁরা মেহনতি মানুষের পার্টি। কিন্তু এই দেড় দশকে মেহনতি মানুষগুলোও যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই ভোট দিয়ে এসেছে! কেন? উত্তর একটাই—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতি আস্থা। আর সিপিএমের প্রতি অনাস্থা। মহম্মদ সেলিমকে দেখে সাধারণ মানুষ যে ভোট দিতে আসছেন না, সেটা একপ্রকার স্পষ্ট। কারণ, বামেদের প্রতি মানুষের হারানো আস্থা তিনি ফেরাতে পারেননি। প্রশ্ন হল, তাহলে কে পারবেন? আপনি যদি নিতান্তই অরাজনৈতিক ব্যক্তি হয়ে থাকেন, সিপিএমের কয়েকজন নেতানেত্রীর নাম মনে মনে ভেবে দেখতে পারেন। কার কার কথা মনে পড়ল? মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়ের নাম মনে পড়ল কি? এটারই সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ এই যুবনেত্রী যে কোনও ইস্যুতে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। মাটি কামড়ে পড়ে থাকছেন। মেঠো ভাষায় জ্বালাময়ী ভাষণ দিচ্ছেন। মানুষকে কানেক্ট করছেন। এবং প্রচারের আলোয় থাকছেন। কিন্তু তাঁর সমস্যা কী? যুব সংগঠনের বাইরে তিনি কিছুতেই যেতে চান না। ডিওয়াইএফআই তাঁর কমফর্ট জোন। বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হওয়া সিপিএম পার্টিতে মাত্র ৪০ বছর বয়সে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। তা সত্ত্বেও সাবালক রাজনীতির আঙিনায় আড়ষ্টতা কাটছে না তাঁর। নিন্দুকে বলে, ডিওয়াইএফআইতে তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য। ওখানে যে ছড়িটা তিনি ঘোরাতে পারেন, জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে সেটা সম্ভব হবে না। সেখানে তাঁকে শূন্য থেকেই শুরু করতে হবে। আর ‘শূন্য’ সিপিএমের জন্য ঘোর বাস্তব হলেও যেচে সেখানে ফিরে যাওয়াটা বিলকুল নাপসন্দ। তাই এই মুহূর্তে লাল পার্টির একমাত্র ক্রাউড পুলার হওয়া সত্ত্বেও মীনাক্ষী কিছুতেই ‘মুখ’ হয়ে উঠতে পারছেন না। একমাত্র কেন? এক এক করে দেখা যাক। প্রথমেই মহম্মদ সেলিম। তিনি পার্টির মধ্যে জনপ্রিয় হতে পারেন, দলের রাশ কড়া হাতে ধরতে পারেন, কিন্তু পাবলিক তাঁকে দেখে সভায় আসে না। ভোটও দেয় না। সেটা না হলে জেলায় জেলায় মহম্মদ সেলিমকে ভোটপাখি হয়ে ঘুরতে হতো না, আর কপালে শুধু হারও জুটত না। তাহলে কাকে দেখে ভোট হবে? সিপিএমের ভিতর-বাহিরে দাবি উঠছে নতুন মুখ লাও। লাও তো বটে, কিন্তু আনবে কে? কেনই বা তারা আসবে? সে কথায় না হয় পরে আসছি। এখন দেখা যাক, এই মুহূর্তে কারা দলে তথাকথিত ‘নতুন মুখ’? মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় সরে গেলে ডিওয়াইএফআইয়ের রাজ্য সম্পাদক হওয়ার দৌড়ে ধ্রুবজ্যোতি সাহা। তাঁকে ক’জন পাবলিক চেনে? কলতান দাশগুপ্ত নামটা তাও টিভি চ্যানেলের টক শোয়ের জন্য পরিচিত। ব্যাস, ওই পর্যন্তই। তাঁকে দেখে, বা তাঁর ভাষণ শোনার জন্য লোক হুমড়ি খেয়ে পড়বে, এমনটা আশা করাও ভুল। ডিওয়াইএফআইয়ের সর্বভারতীয় সম্পাদকের নাম হিমঘ্নরাজ ভট্টাচার্য। সত্যি বলতে, কেউ চেনে না। ভোট এলে ঐশী ঘোষ, দীপ্সিতা ধরের নাম শোনা যায়। তারপর সব ভোঁ ভাঁ। ১০০ দিনের কাজ বন্ধ হয়ে গেলে ‘মেহনতি মানুষ’রা কিন্তু তাঁদের পাশে পান না। তাই চিনতেও পারেন না। এঁদের তুলনায় খানিক বেশি পরিচিত মুখ বলতে সৃজন ভট্টাচার্য। এসএফআইয়ের সর্বভারতীয় যুগ্ম সম্পাদক। লোকের উৎসাহ আছে, কিন্তু ‘ইলেকশন এলিমেন্ট’ কি? 
প্রশ্ন আছে। থাকবে। কারণ, ঘুরেফিরে ওই একটা শর্ত—অনাস্থা। আদর্শ বুঝি না। যাকে ভোট দেব, তাকে চিনিই না। তাহলে ব্রিগেডের ভিড় ভোটযন্ত্র পর্যন্ত পৌঁছবে কীভাবে? আর ওই যে বললাম, জনসভার ভিড়ের সঙ্গে ভোটের কোনও সম্পর্ক নেই! থাকলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বহু আগেই রাজ্যে ক্ষমতায় এসে যেতেন।  তাঁর বাজানো ‘মৃত্যুঘণ্টা’, ব্রিগেড উপচে পড়া জনসমুদ্র... এই শতকের গোড়াতেই তো বিদায় হয়ে যেত সিপিএমের। তা কিন্তু হয়নি। কারণ, মানুষের আস্থা অর্জনে সময় লেগেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। আর সেই সময় তিনি দিয়েছেন। পড়ে থেকেছেন মানুষের মাঝে। বাংলার মানুষ বিশ্বাস করেছে, আপদে বিপদে এই ভদ্রমহিলাকে পাশে পাওয়া যায়। তারপরই কিন্তু এই ইমেজের প্রভাব পড়েছে ভোটযন্ত্রে। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোট থেকে ঘুরতে শুরু করেছে হাওয়া। সিপিএম এখনও এটাই মেনে নিতে পারছে না। হাতে ঘিয়ের গন্ধ শোঁকার নেশায় মাটি থেকে পা এখনও উঠে রয়েছে গগনে। ভাবছে, এ তো স্বপ্ন। এখনই শেষ হয়ে যাবে। অথচ, স্বপ্ন শেষ হচ্ছে না। মানুষের আস্থাও ফিরছে না। তার মধ্যে বংশগোপাল চৌধুরীর মতো প্রবীণ নেতার আদিরসাত্মক বাক্যালাপ ভাইরাল হয়। সেই প্রসঙ্গ রাজ্য সম্মেলনেও ওঠে। আর এক ‘যুব’ ইন্দ্রজিৎ ঘোষের চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন তোলে পার্টির অন্দরমহল। বিরোধী রাজনীতির বিস্তার তখনই শাসককে ছাপিয়ে যায়, যখন তা সততা এবং সংস্কারের গণ্ডির মধ্যে থাকে। তার বাইরে গেলেই দড়ির উপর হাঁটার মতো অবস্থা। সিপিএমের একাংশ দলীয় পদের (নাকি পোর্টফোলিও বললে ভালো হয়) ফায়দা নিয়ে এমনটাই করে চলেছে। তারপরও ভাবছে, ‘বিপ্লব আসবেই’।
বহু বাম সমর্থককে বলতে শুনেছি, সিপিএম নামেই কমিউনিস্ট পার্টি। এরা কোনওদিনই বামপন্থী নয়। এরা আদর্শে মার্ক্সবাদী। লোক দেখানোয় মেহনতি মানুষের সমর্থক। কিন্তু সবটাই ক্ষমতার আকর্ষণে। কেউ বলবেন ঠিক। কেউ বলবেন ভুল। একটা বিষয় কিন্তু সত্যি, সিপিএমের সাপ্লাই লাইন বেশ খারাপ। অর্থাৎ, যুব সম্প্রদায় সিপিএমের আদর্শের আকর্ষণে আর পার্টিতে আসছে না। হোল টাইমার হওয়ার জন্য পড়ে থাকছে না। বদলের স্বপ্নও দেখছে না। সিপিএমের অন্দরের যুক্তি (নাকি সাফাই) হল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভোট হচ্ছে না। ছেলেমেয়েরা আসবে কেন? তার মানে কি ক্ষমতার লোভেই এতদিন যুব প্রজন্ম এসএফআই করতে এসেছে? এই সার কথাটাই কি সিপিএমের দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা আজ ঘুরিয়ে স্বীকার করে নিচ্ছেন না?
দৈন্য যে প্রকট হয়েছে, তা নিয়ে সংশয় নেই। রবিবারের ব্রিগেডে বক্তাদের কথায় বারবার ঘুরে এসেছে ‘খেলা হবে’, স্বাস্থ্যসাথী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় না থেকেও হাজির হয়ে গিয়েছেন বাম গণসংগঠনগুলির ডাকা সমাবেশে। নেগেটিভ প্রচার? হতে পারে। কিন্তু প্রচার তো! একমাত্র বন্যা টুডুকে বলতে শোনা গিয়েছে, ১০০ দিনের কাজের জন্য আন্দোলন করবেন তিনি। দিল্লি যাবেন। দাবি জানাবেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে। দলে কোন পদে আছেন তিনি? কিছুই না। গুড়াপে এক সময় পঞ্চায়েত প্রধান ছিলেন। তৃণমূল জমানা শুরু হওয়া পর্যন্ত। তাও অন্তত সাধারণ মানুষের কষ্টের জায়গাটা ভুলে যাননি তিনি। মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায় বক্তা ছিলেন না। কিন্তু ব্রিগেডে ছিলেন। তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে কোনও নেতা নয়, শুধু সাধারণ মানুষের ছবি পোস্ট করেছেন। আম জনতা কিন্তু এতেই ভরসা পায়। তত্ত্বকথায় নয়, স্লোগানে নয়। ‘এগিয়ে চলো। আমি আছি তোমার সঙ্গে’... ছোট্ট দুটো বাক্য। এটা বলতে পারেন বলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও নির্বিকল্প। মহম্মদ সেলিমও নির্বিকল্প। তবে ‘শূন্য’ পাওয়ায়।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ