Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নিম্ন-মধ্য আয়ের ফাঁদেই আটকে দেশ

[লেখকের নিবেদন: আমি ২০১৪ সাল থেকে এই কলামটি লিখে আসছি। এর আগে, আমি ১৯৯৯-২০০৪ সাল পর্যন্ত এই কলামটি লিখেছিলাম। প্রতি সপ্তাহে একটি কলাম লেখার কাজটা কঠিনই, তবে আমি এটা পুরোপুরি উপভোগ করেছি। পত্রিকা সম্পাদকদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে কলামটি লেখা আমি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি কিন্তু বিরতিও নেব। পাঠক, কলামটি পড়েন, এটা আমার জন্য সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার এবং আপনাকে ধন্যবাদ জানাই।]

নিম্ন-মধ্য আয়ের ফাঁদেই আটকে দেশ
  • ২০ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

পি চিদম্বরম: [লেখকের নিবেদন: আমি ২০১৪ সাল থেকে এই কলামটি লিখে আসছি। এর আগে, আমি ১৯৯৯-২০০৪ সাল পর্যন্ত এই কলামটি লিখেছিলাম। প্রতি সপ্তাহে একটি কলাম লেখার কাজটা কঠিনই, তবে আমি এটা পুরোপুরি উপভোগ করেছি। পত্রিকা সম্পাদকদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে কলামটি লেখা আমি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি কিন্তু বিরতিও নেব। পাঠক, কলামটি পড়েন, এটা আমার জন্য সবচেয়ে বড়ো পুরস্কার এবং আপনাকে ধন্যবাদ জানাই।]

Advertisement

৯৩ বছর বয়সে (তাঁর জন্য শুভেচ্ছা রাখুন), ডঃ সি রঙ্গরাজন মুক্ত অর্থনীতি (ওপেন ইকোনোমি) এবং বিচক্ষণ রাজকোষ ব্যবস্থাপনার (প্রুডেন্ট ফিসকাল ম্যানেজমেন্ট) একজন অক্লান্ত প্রচারক। তিনি বহুবছর ধরে একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংকার এবং রিজার্ভ ব্যাংকের (আরবিআই) ১৯তম গভর্নর (১৯৯২-৯৭) ছিলেন। তিনি গত ১৪ অক্টোবর ডি কে শ্রীবাস্তবের সঙ্গে ভারতের সম্ভাব্য বৃদ্ধির হারের অনুমানের উপর একটি উপ-সম্পাদকীয় (অপ-এড) লেখেন এবং তাতে এই মত ব্যক্ত করেন যে, বৃদ্ধির হার হবে বছরে ৬.৫ শতাংশ। তিনি উদারভাবেই বলেছেন যে, ‘বর্তমান বিশ্ব পরিবেশে, বৃদ্ধির হার যথেষ্ট উঁচুর দিকেই আছে’, একইসঙ্গে তিনি যোগ করেছেন যে, ‘যদিও কর্মসংস্থানের হার বৃদ্ধির লক্ষ্যে সম্ভাব্য আর্থিক বৃদ্ধিকে আমাদের আরও এগিয়ে নিতে হবে।’
আমার মনে হয়, বেশ কয়েকবছর যাবৎ ৬.৫ শতাংশ বার্ষিক গড় বৃদ্ধির হার হতাশাজনক। এই হার ভারতকে নিম্ন-মধ্য আয়ের (লোয়ার-মিডল ইনকাম) দেশগুলির পঙ্‌঩ক্তিভুক্ত করে রেখেছে, সংজ্ঞা আনুসারে যাদের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় (গ্রস ন্যাশনাল ইনকাম বা জিএনআই) ১,১৪৬ মার্কিন ডলার থেকে ৪,৫১৫ মার্কিন ডলার (২০২৪-২৫ সালে)। ২০২৪ সালে ভারতের জিএনআই ছিল ২,৬৫০ মার্কিন ডলার। আমাদের দেশ তার সুবাদে মিশর, পাকিস্তান, ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম এবং নাইজেরিয়ার যে শ্রেণি তার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ভারতকে নিম্ন-মধ্য আয়ের গ্রুপ থেকে বের করে আনতে হলে মাথাপিছু জিএনআই দ্বিগুণ করা দরকার। ভারতের বর্তমান আর্থিক বৃদ্ধির হার যদি সুস্থায়ী থাকে, তাহলে সেই লক্ষ্য অর্জনে ন-বছর সময় লাগবে এবং তাতে বেকারত্বের পরিস্থিতি (আনএমপ্লয়মেন্ট সিচুয়েশন) আরও খারাপ হতে পারে।
আনুমানিক ঐকমত্য
আরবিআই ২০২৫-২৬ সালের জন্য বৃদ্ধির অনুমান ৬.৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬.৮ শতাংশ করেছে, কিন্তু বেকারত্বের সুরাহা সম্পর্কে তারা যথেষ্ট বলেনি (আরবিআই বুলেটিন, সেপ্টেম্বর ২০২৫, স্টেট অফ দি ইকোনোমি বা অর্থনীতির হাল): ‘কর্মসংস্থানের অবস্থার বিভিন্ন সূচক গত আগস্টে একটা মিশ্র চিত্র তুলে ধরেছে। সর্বভারতীয় বেকারত্বের হার ৫.১ শতাংশে নেমে এসেছে...।’ বেকারত্বের প্রতি খুব কম মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে। কারণ আরবিআই আইনে আরবিআইকে কর্মসংস্থানের কোনও উল্লেখ না করে আর্থিক এবং মূল্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রক, তাদের আগস্ট সংখ্যার মাসিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় (মান্থলি ইকোনোমিক রিভিউ), আগে দেওয়া পূর্বাভাস সীমার মধ্যেই (৬.৩-৬.৮ শতাংশ) রয়ে গিয়েছে। এই পর্যালোচনায় বেকারত্ব সম্পর্কে কোনও মতামত প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্ব ব্যাংকের অনুমান ছিল ২০২৫-২৬ সালে ভারতের বৃদ্ধির হার ৬.৫ শতাংশে পৌঁছাবে, কিন্তু ২০২৬-২৭ সালের জন্য তা কমিয়ে ৬.৩ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার (আইএমএফ) ২০২৫ সালের জন্য ভারতের বৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে করেছে ৬.৬ শতাংশ। আর সেখানেই ২০২৬ সালে তা হ্রাস পেয়ে ৬.২ শতাংশে দাঁড়াবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে তারা। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (অর্গানাইজেশন ফর ইকোনোকিম কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বা ওইসিডি) তাদের পূর্বাভাসে জানিয়েছে যে, ২০২৫-২৬ সালে ভারতের বৃদ্ধি হবে ৬.৭ শতাংশ এবং সেটা কমে ৬.২ শতাংশে নেমে আসবে ২০২৬-২৭ সালে।
জিএফসিএফ, দ্য স্পয়লার
সহমত এটাই যে, ভারতের বৃদ্ধির হার চলতি বছরে ৬.৫ শতাংশ হবে এবং আগামী বছরে কমে যাবে ২০ বেসিস পয়েন্ট। ডঃ রঙ্গরাজন যে উপসংহার টেনেছেন এই অনুমানগুলি সেটাকে ব্যাপকভাবে সমর্থন করে। ডঃ রঙ্গরাজন এই পরিমিত বৃদ্ধির কারণগুলি চিহ্নিত করেছেন: মোট স্থির মূলধন গঠন (গ্রস ফিক্সড ক্যাপিটাল ফর্মেশন বা জিএফসিএফ) হার গত কয়েকবছর ধরে স্থিতিশীল এবং স্থিতিশীল জিএফসিএফ হারের কারণগুলি। ২০০৭-০৮ সালে জিএফসিএফ ছিল জিডিপির ৩৫.৮ শতাংশ। সেটা ২০২৪-২৫ সালে সেখান থেকে নেমে এসেছে জিডিপির ৩০.১ শতাংশে। গত একদশকে এটা প্রায় ২৮ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে স্থিতিশীল ছিল।
বেসরকারি স্থির মূলধন গঠন (প্রাইভেট ফিক্সড ক্যাপিটাল ফর্মেশন বা পিএফসিএফ)—মোট জিএফসিএফের অংশ—২০০৭-০৮ সালে জিডিপির ২৭.৫ শতাংশ থেকে কমে ২০২২-২৩ সালে ২৩.৮ শতাংশে নেমে এসেছে (সর্বশেষ প্রাপ্ত সরকারি তথ্য)। ডঃ রঙ্গরাজন ক্রমবর্ধমান ঋণ আউটপুট অনুপাতের (ইনক্রিমেন্টাল ক্রেডিট আউটপুট রেশিও বা আইসিওআর) কথাও উল্লেখ করেছেন, কিন্তু আমি এটা বাদ দিয়েছি। কারণ এটা একটা প্রাপ্ত সংখ্যা (ডেরাইভড নাম্বার)। ডঃ রঙ্গরাজন যেমন উপসংহারে বলেছেন, জিএফসিএফ/পিএফসিএফ উন্নত না-হলে অথবা আইসিওআর হ্রাস না-পেলে, ভারত ৬.৫ শতাংশ বৃদ্ধির হারেই আটকে থাকবে।
বেসরকারি পুঁজি কেন ভারতে বিনিয়োগ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে? এর প্রধান কারণ হল, ভারত সরকার এবং শিল্পের মধ্যে আস্থার ঘাটতি। 
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন তাঁর তূণীরের প্রতিটি তিরই ব্যবহার করে ফেলেছেন, কিন্তু ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা তাঁর অনুরোধ, উপদেশ বা হুমকিতে মুগ্ধ হন না। তাঁরা পছন্দ করেন—নগদ অর্থ ধরে রাখতে, ধৈর্যসহকারে পরিস্থিতির উপর নজর রাখতে এবং দেউলিয়া কোম্পানিগুলি অধিগ্রহণ কিংবা বিদেশে বিনিয়োগ করতে।
মনমোহন সিংয়ের মতো সাহস
একটি উন্নয়নশীল দেশে সরকারের সাফল্যের মাপকাঠি হল—উন্নত গুণমানের পরিকাঠামো নির্মাণ এবং মানসম্পন্ন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার ক্ষমতা। গত দশকে পরিকাঠামো নির্মিত হয়েছে বিরাট পরিমাণে (এবং তার জন্য টাকা খরচও হয়েছে বিপুল), কিন্তু সেসব পরিকাঠামোর মান? ভয়াবহ—সেসব তৈরি হয়েছে সেকেলে ডিজাইন এবং টেকনোলজি ব্যবহার করে। তার ফলে ধসে পড়া সেতু, ভেঙে পড়া ভবন এবং এক বর্ষাতেই ভেসে যাওয়া নতুন হাইওয়ের বিপদ ক্রমবর্ধমান। মানসম্মত চাকরির কথা যত কম বলা যায়, ততই ভালো। ‘শিক্ষিত বেকারদের’ জন্য কোনও চাকরি নেই এবং তাদের মধ্যে বেকারত্বের হার ২৯.১ শতাংশ! ৪৫.৪ শতাংশ হল ‘যুবদের বেকারত্বের’ হার। স্কুলশিক্ষাপ্রাপ্ত এবং স্কুলছুট ছেলেমেয়েরা রকমারি কাজকর্ম করে কিন্তু সেসব কাজের কোনও স্থায়িত্ব নেই, অথবা তারা পরিযায়ী বৃত্তি গ্রহণে বাধ্য হয়। সরকারিভাবে সেপ্টেম্বরে ৫.২ শতাংশের বেকারত্বের হার এবং ১.৫৪ শতাংশ খুচরা মুদ্রাস্ফীতির হার দাবি করা হয়েছে। এই দুটি সরকারি দাবিই সমান রসিকতা।
জিডিপি বৃদ্ধির হার ৬.৫ শতাংশ, এটা কোনও উদযাপনের মুহূর্ত নয়। এর অর্থ হল—ভারত নিম্ন-মধ্য আয়ের ফাঁদেই আটকে আছে। এই ফাঁদ থেকে মুক্ত হওয়ার ধারণা বা সাহস কোনোটাই নেই সরকারের। মনমোহন সিংয়ের যে সাহস ছিল, সেটাই আহ্বান করার সময় এসেছে।
[এরপর: ৩ নভেম্বর, ২০২৫] 
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ