মৃণালকান্তি দাস: শুল্ক নিয়ে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চারবার ফোন করেছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে, কিন্তু একবারও ফোন ধরেননি নরেন্দ্র মোদি। এমনই খবর জার্মানির সংবাদপত্র ‘ফ্রাঙ্কফুর্টার অ্যালজেমেইন জেইটুঙ্গ (ফাজ)’-এর। তারা লিখেছে, মোদির এই মনোভাব শুধু তাঁর ‘ক্রোধের গভীরতাই নয়, তিনি কতটা সতর্ক পদক্ষেপ নিচ্ছেন’, তা-ও বোঝাচ্ছে। একই খবর ছাপিয়েছে জাপানি সংবাদপত্র ‘নিক্কেই এশিয়া’।
ফাজ লিখেছে, ভারতের কৃষি ও ডেয়ারি বাজার উন্মুক্ত করার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন প্রবল চাপ দিচ্ছে। ফোন না ধরে মোদি তা বুঝিয়ে দিয়েছেন— সেটা অসম্ভব। পাশাপাশি তিনি এটাও বোঝাতে চেয়েছেন, রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে ভারত রাজি নয়। শুধু তাই-ই নয়, নয়াদিল্লি দ্রুত তার কূটনৈতিক মনোভাব বদলাচ্ছে। সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) শীর্ষ বৈঠকে যোগ দিতে সাত বছর পর চীনে পা রেখেছেন মোদি। তাঁর এই সিদ্ধান্ত চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, ট্রাম্পের নীতিই ভারতকে আরও বেশি করে রাশিয়া-চীনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই শুল্কযুদ্ধে ভারত যে মার্কিন চাপের কাছে মাথা নোয়াবে না, তা স্পষ্ট। মোদি যে অপমানিত হয়েছেন, তা পরিষ্কার। ফোন না ধরার মধ্য দিয়ে বোঝা গিয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের আচরণে মোদি কতটা বিরক্ত!
সমরাস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করার চেয়ে বাণিজ্য-যুদ্ধ করাই শ্রেয় মনে করছেন ট্রাম্প। বাণিজ্যকে রীতিমতো যুদ্ধাস্ত্র বানিয়ে ফেলেছেন তিনি। শুল্ক ও বাণিজ্যনীতি এখন কেবল অর্থনৈতিক স্বার্থে নয়, ট্রাম্প এখন তা ভূরাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যযুদ্ধ, রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা ও ভারতের উপর অস্বাভাবিক শুল্কসংক্রান্ত চাপ— সব মিলিয়ে ওয়াশিংটন কার্যত বাণিজ্যকে কূটনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেছে। কোনও দেশের উত্থান ঠেকাতে যেভাবে বাণিজ্যকে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা আমেরিকা ও পশ্চিমিদের নেতৃত্বে তৈরি হওয়া মুক্তবাণিজ্য ব্যবস্থারই পরিপন্থী। কিন্তু আমেরিকা আধিপত্য ধরে রাখতে নিজেদের উদ্ভাবিত মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থাই জলাঞ্জলি দিতে বসেছে। শুল্ক নিয়ে চমকানি-ধমকানি। চাপ তৈরি করতে বড় বড় হাঁকডাক। কিন্তু, সবই যেন ব্যুমেরাং হয়ে বিদ্যুৎগতিতে ছুটে আসছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দিকে! এক কথায় নিজের জালেই জড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ভেবে থাকেন, তিনি চাপ দিয়ে ভারতকে বশে আনতে পারবেন, তবে ঘটনাপ্রবাহ মোটেও তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী এগচ্ছে না। এই সময়ে মোদি দুবার তাঁর ‘বন্ধু’ ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাঁর বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্করকে মস্কোয় পাঠিয়েছেন। দীর্ঘদিনের দূরত্ব ভুলে চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিনপিং আয়োজিত তিয়ানজিন শহরে সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (এসসিও) সম্মেলনে মোদি অংশ নিয়েছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতিই রাশিয়া, ভারত এবং চীনকে আরও কাছাকাছি এনে নয়া ত্রিদেশীয় অক্ষ গঠনের সম্ভাবনা উস্কে দিয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। সে ক্ষেত্রে ইসলামাবাদ হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সম্পর্ক আগের তুলনায় ‘স্বাভাবিক’ করলেও, দক্ষিণ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে পাকিস্তান ফের ‘একঘরে’ হয়ে যেতে পারে বলে মত কূটনীতিবিদদের একাংশের।
কারণ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সামনে দাঁড়িয়ে সন্ত্রাসবাদে মদত নিয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন মোদি। তাঁর লক্ষ্য যে পাকিস্তান, তা তিনি স্পষ্ট করতে পহেলাগাঁও হামলার প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। সাফ জানিয়েছেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী লড়াইয়ে কোনও দ্বিচারিতা থাকতে পারে না। ‘পহেলাগাঁওয়ে সন্ত্রাসবাদী হামলা তো শুধু ভারতের আত্মায় আঘাত নয়, বরং তা সেই সমস্ত দেশের প্রতি খোলামেলা চ্যালেঞ্জ, যারা মানবতায় বিশ্বাস রাখে। আমাদের এটা নিশ্চিত করতে হবে যে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কোনও দ্বিচারিতা বরদাস্ত করা হবে না। গত চার দশক ধরে ভারত এই সন্ত্রাসবাদের শিকার। যে সমস্ত দেশ আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, তাদের ধন্যবাদ।’ মাথানিচু করে শাহবাজ শরিফকে শুনতে হয়েছে, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথাও। মোদির কথায়, ‘জঙ্গিবাদ, চরমপন্থা মানবতার জন্য যৌথ চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ থাকলে কোনও দেশ, কোনও সমাজ সুরক্ষিত বোধ করতে পারে না। নিরাপত্তা সকল দেশের অধিকার।’ কূটনীতিকদের দাবি, ভারতের জন্য এই প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেওয়ার মাস্টারমাইন্ড আসলে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।
রাশিয়া এমনিতেই ভারতের ‘বিশ্বস্ত বন্ধু’ বলে দীর্ঘদিন ধরেই পরিচিত। ‘অপারেশন সিন্দুর’-এর সময়েও রাশিয়ান অস্ত্র এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাহায্য পেয়েছে ভারত। অন্যদিকে, মস্কোর সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্ক কখনওই খুব একটা মসৃণ নয়। ঠান্ডাযুদ্ধের সময় পাকিস্তান যখন আমেরিকার ঘনিষ্ঠ হয়, সেই সময়ও ভারতকে সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়ন (অধুনা রাশিয়া) ঘেঁষা মনে করা হতো। প্রতিরক্ষা, অর্থনীতির মতো একাধিক ক্ষেত্রে ভারত এবং রাশিয়ার বোঝাপড়া এখনও অটুট। আর ইসলামাবাদ এখন ‘বন্ধু’ চীনকে আবর্জনায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তৈলমর্দন করতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নামে নোবেল কমিটির কাছে মনোনয়ন পত্র পাঠিয়েছে। কিন্তু ভারত তা করেনি। এরপর থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে পাকিস্তানের আগের শীতল সম্পর্ক উষ্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, ইউক্রেন সঙ্কট মেটাতে ভারত এবং চীনের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। কয়েক দিন আগেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম পরামর্শদাতা পিটার নাভারো ইউক্রেন যুদ্ধকে ‘মোদির যুদ্ধ’ বলে দাবি করেছিলেন। নিজের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেছিলেন, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কিনছে বলেই ওই টাকা ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঢালছে মস্কো। পুতিন সেই দাবি নস্যাৎ করে জানিয়েছেন, আমেরিকার নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ন্যাটো
আর পশ্চিমি দুনিয়া হস্তক্ষেপ করার জন্যই এই যুদ্ধের শুরু। পুতিনের বার্তা, ‘একাধিপত্যের বদলে বহুমেরু বিশ্বের’।
২০০১ সাল থেকে ওয়াশিংটন চেষ্টা করে আসছে ভারতকে তাদের প্রভাববলয়ে আনতে। উদীয়মান চীনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক হিসেবে। কিন্তু ট্রাম্প আমেরিকা–ভারত সম্পর্কে আগুনে লাগিয়ে দিয়েছেন। প্রথমে ভারতীয় পণ্য রপ্তানির উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে, এরপর রাশিয়ান তেল কেনার কারণে দিল্লিকে শাস্তি দিতে দ্বিগুণ চাপ প্রয়োগ করে। এর সঙ্গে ট্রাম্প অপমানের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন বন্ধুত্ব গড়ে তুলে, যে দেশ ভারতের চরম শত্রু। তিনি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে হোয়াইট হাউসে মধ্যাহ্নভোজে পর্যন্ত আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। থিঙ্কট্যাঙ্করা সতর্ক করছেন, এত কঠোরভাবে শক্তি প্রয়োগ করে ট্রাম্প উল্টো ফল ডেকে আনছেন— মস্কো ও বেজিংয়ের সঙ্গে ভারতকে আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলছেন। হয়েছেও তাই!
দৃশ্যগুলি আজ আমেরিকার কাছে ভয়ঙ্কর! এসসিও সম্মেলনে যোগ দিতে আগেই চীনে পৌঁছেছিলেন পুতিন। সম্মেলনের মঞ্চে মোদি এবং জিনপিংয়ের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। মোদিকে দেখেই জড়িয়ে ধরেন রুশ প্রেসিডেন্ট। তার পর একান্তে আলোচনা করতে করতে তাঁদের মঞ্চের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। এরপর জিনপিং আসেন এবং তিন রাষ্ট্রপ্রধান আলাদা করে দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ কথা বলেন। ছবিতে দেখা গিয়েছে, জিনপিংকে কিছু বলছেন মোদি। আঙুল দেখিয়ে পায়ের দিকে ইঙ্গিত করছেন। জিনপিংয়ের মুখে হাসি। পাশে দাঁড়িয়ে পুতিনও হাসছেন। মোদি নিজে এই ছবি পোস্ট করেছেন। এ ছাড়া দ্বিতীয় ছবিতে তিন রাষ্ট্রপ্রধানকে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে এসসিও সম্মেলনের মঞ্চের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা গিয়েছে। মোদি এই দুই ছবির সঙ্গে লিখেছেন, ‘তিয়ানজিনে আলোচনা চলছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন এবং প্রেসিডেন্ট জিনপিংয়ের সঙ্গে ভাবভঙ্গির বিনিময়।’ যা মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায়।
আমেরিকার অস্বস্তি বাড়িয়ে তিয়ানজিন শহরে ঘণ্টাখানেকের বেশি সময় ধরে জিনপিং এবং মোদির দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়। বৈঠকে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার বার্তা দিয়ে মোদি বলেছেন, ‘আমাদের পারস্পরিক সংহতির উপর ভারত এবং চীনের ২৮০ কোটি মানুষের স্বার্থ জড়িয়ে। এতে গোটা দুনিয়ার কল্যাণ হবে। পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্মান এবং সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে আমরা এই সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে আগ্রহী।’ মোদিকে স্বাগত জানিয়ে জিনপিংও পারস্পরিক সমন্বয়ের বার্তা দেন। বলেন, ‘আমাদের বন্ধুত্ব, প্রতিবেশী হিসেবে একে অপরের পাশে থাকা জরুরি। ড্রাগন এবং হাতির একজোট হওয়া দরকার।’ সীমান্তবাণিজ্য ফের শুরু করার বিষয়ে মোদি এবং জিনপিং দু’জনেই একমত। দুষ্প্রাপ্য খনিজ, কৃষিকাজে ব্যবহৃত সার এবং টানেল বোরিং মেশিন বা সুড়ঙ্গ খনন করার যন্ত্র আমদানির জন্য ভারত চীনের উপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। কেন্দ্রের একটি সূত্রের খবর, এই পণ্যগুলি ভারতে সরবরাহ করার বিষয়ে মোদিকে আশ্বস্ত করেছেন জিনপিং।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, আসলে এই এসসিও বৈঠক ঘিরে দানা বেঁধেছে ‘রাশিয়া-ভারত-চীন ত্রিশক্তি জোট’ বা ‘রিক ট্রয়িকা’ (রাশিয়া-ইন্ডিয়া-চায়না ট্রয়িকা)। যা ওয়াশিংটনের পক্ষে উদ্বেগের। ভারতের রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজন মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যা করেছেন, তা ভারতের কাছে ‘ওয়াক আপ কল’ বা ঘুম থেকে জেগে ওঠার বার্তা। ভারতের আর কখনও কোনও এক দেশের প্রতি অতিনির্ভর হওয়া উচিত হবে না। আজকের ভূরাজনীতিতে বাণিজ্য ও লগ্নির মতো অর্থনৈতিক বিষয় আধিপত্য বিস্তারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের কাছে এই শুল্কযুদ্ধ তাই ঘুম ভাঙানোর ঘণ্টা!
এর অর্থ: এরপরও একদিন হয়তো মোদি ও ট্রাম্পের সম্পর্ক জোড়া লাগবে, কিন্তু ‘ব্রোমান্স’ সম্ভবত শেষ। বিয়ে টিকে থাকবে, কিন্তু তা হবে ভালোবাসাহীন, কেবল প্রয়োজনের তাগিদে!