Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সুষ্ঠু সমাধানের দায়িত্ব কমিশনের

অতিসম্প্রতি বিহারে স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশনে (এসআইআর) একলপ্তে ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে এই ‘অন্যায়’ বিরোধীরা এবং আম জনতা ভালোভাবে নেয়নি।

সুষ্ঠু সমাধানের দায়িত্ব কমিশনের
  • ২১ আগস্ট, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

অতিসম্প্রতি বিহারে স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশনে (এসআইআর) একলপ্তে ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে এই ‘অন্যায়’ বিরোধীরা এবং আম জনতা ভালোভাবে নেয়নি। দেশজুড়ে তারা প্রতিবাদে মুখর। বিবাদ গড়িয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অব্দি। একদিকে অব্যাহত বিরোধী শিবিরের গর্জন, আর অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টও এই ‘জাতীয় সমস্যা’য় হস্তক্ষেপ করেছে বলা যায়। স্বভাবতই এই ইস্যুতে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। মঙ্গলবার ইসিআই রীতিমতো বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়ে দিল, খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটাররা আধার কার্ড দিয়ে ফের আবেদন করতে পারবেন। তারপর আবেদনগুলি তারা রিভিউ করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে। এদিনের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাদ পড়া ভোটাররা এপিক নম্বরের মাধ্যমে খসড়া তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য জানতে পারবেন। জানা যাবে নাম বাদ যাওয়ার বিস্তারিত কারণও। বিহারের মোট ভোটার সংখ্যা ৭ কোটি ৮৯ লক্ষ। এসআইআরের পর, ১ আগস্ট কমিশনের তরফে প্রকাশিত খসড়া তালিকায় ৭ কোটি ২৪ লক্ষের নাম রয়েছে। অর্থাৎ উধাও পুরনো ৬৫ লক্ষ ভোটদাতার নাম! এই বিপুল সংখ্যক বাতিল নামের তালিকা কমিশন থেকে প্রকাশ্যে টাঙিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসিআই। ওই রাজ্যের প্রতিটি ব্লক, পঞ্চায়েত এবং পুরভবনে তা টাঙিয়ে দেওয়া হবে। এই তালিকা দেখা যাবে প্রতিটি বুথেও। অর্থাৎ ওই সরকারি জায়গাগুলিতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ভোটদাতারা বিষয়টি যাচাই করে নিতে পারবেন। এনিয়ে কোনওরকম আপত্তি থাকলে আধার কার্ড জমাসহ দ্রুত অভিযোগ জানানো যাবে।

Advertisement

উল্লেখ্য, এত নাম বাতিলদের পক্ষে কমিশনের যুক্তি কী কী? ৩৬ লক্ষ ভোটারের বসবাসের ঠিকানা স্থায়ীভাবে বদলে গিয়েছে। অর্থাৎ তাঁরা এখন অন্যত্র বসবাস করছেন। আর বাকি ২২ লক্ষ? তাঁরা ইহলোক ত্যাগ করেছেন বা ‘মৃত’। রাতারাতি এত নাম বাদ পড়ায় দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। উঠেছে একাধিক সংগত প্রশ্নও: মাত্র গতবছরই লোকসভা নির্বাচনে যাঁরা ভোট দিলেন, তাঁদের মধ্যে ২২ লক্ষ মানুষ এই অল্প সময়ে মারা গেলেন! এই দুর্ভাগ্য, এই বিস্ময়ক কাণ্ড মড়ক না লাগলে সম্ভব কী করে? আর ৩৬ লক্ষ মানুষ মাত্র একবছরে রাজ্য ছেড়ে চলেও গেলেন? নীতীশ কুমারের রাজত্ব, মানে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ রাজ্য বিহার কি হঠাৎ এতটাই বাসযোগ্যতা হারাল? যে দুই যুক্তিতে লক্ষ লক্ষ নরনারীকে বিহার ছাড়া দেখানো হচ্ছে, তা কোনওভাবেই গেরুয়া প্রশাসনের গর্বের ব্যাপার হতে পারে না। মোদি-শাহরা তো ‘রামরাজ্য’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ফেরি করেন। রামরাজ্য মানে কী? পৃথিবীর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত বাসস্থান। বিহার তো গেরুয়া মানচিত্রেরই অন্তর্গত। তাহলে এই সামান্য সময়ে এত মানুষ মারা গেলেন এবং রাজ্যছাড়া হলেন কোন কারণে? হয় বিজেপিকে এই ‘লজ্জা’ মেনে নিতে হবে অথবা উত্তর দিতে হবে ডাল মে যে কালা হ্যায় সেটা কী? জন্ম ও মৃত্যু স্বাভাবিক ব্যাপার। মৃত ব্যক্তিদের নাম বাদ দেওয়াই দায়িত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। একইসঙ্গে নতুনদের নামও তুলতে হবে। বিহারের জন্মহার ধরলে গত লোকসভা ভোটের পর থেকে কয়েক লক্ষ তরুণ-তরুণীর ভোটার হওয়ার বয়স হয়ে গিয়েছে। তাঁদের নাম কি এবারের তালিকায় সংযুক্ত হয়েছে? তাহলে এত ভোটার কমে যায় কোন যুক্তিতে? 
সোজা কথায়, এসআইআরের বিশ্বাসযোগ্যতা, স্বচ্ছতা, সহায়ক প্রমাণ (সাপোর্টিং এভিডেন্স) এবং যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্তের খামতি প্রকট হয়ে পড়েছে। কোনও আগাম অনুমান (প্রিয়োরাই অ্যাসাম্পশন) থেকেই এই এসআইআর এবং সেই অনুমানগুলিকেই ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য এই কিছু পদক্ষেপ করা হয়েছে। মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। যে-দেশে জনসংখ্যা বার্ষিক ০.৮৯ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে সেখানে ভোটার তালিকার যেকোনও সংশোধনের পর ভোটার সংখ্যা বেড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই বিহারের উলটপুরাণের এসআইআর’কে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেওয়া কঠিন। বিরোধীদের সমর্থক ভোটার সংখ্যা হালকা করে দেওয়ার জন্যই কি কোনও হীন কৌশল? ‘ভোটচুরির নতুন অস্ত্র এসআইআর’—বিরোধীদের এই গুরুতর অভিযোগ খণ্ডন করার যাবতীয় দায় কমিশনকেই নিতে হবে। বিহারবাসীসহ সমগ্র দেশবাসী সদুত্তর না পেলে আগামী দিনে অন্যান্য রাজ্যে এসআইআর করা কঠিনই হতে পারে। কেননা, প্রকৃত নাগরিকের ‘বেনাগরিক’ হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা, ভয় সুস্থসমাজ কোনওভাবেই মেনে নেবে না। এরপর কেন্দ্রের মর্জিতে ইসিআই জবরদস্তি করলে তার ফল যে সুখকর হবে না, সেই সিঁদুরে মেঘ যেন এখন থেকেই উঁকি দিচ্ছে। অপারেশন সিন্দুরের বীরগাথায় এই মেঘ কিন্তু চাপা পড়বে না।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ