অরুণ মুখোপাধ্যায়: ‘মহাপুরুষচরিতম’ নামক গ্রন্থে লেখা আছে ‘তস্মিন হুগলি প্রথিত বিষয়ে গুপ্তপল্লীতি নাম।’ হুগলিতে গুপ্তপল্লি নামক একটি পল্লির কথা রয়েছে। এই গুপ্তপল্লি যে আসলে গুপ্তিপাড়া তা মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর লেখায় পাই। ‘বাম ভাগে শান্তিপুর ডাহিনে গুপ্তিপাড়া।’ দুর্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘গঙ্গাভক্তিতরঙ্গিণী’ কাব্যে আছে, ‘অম্বিকা পশ্চিম পারে শান্তিপুর পূর্ব ধারে/ রাখিল দক্ষিণে গুপ্তিপাড়া।’
ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের জন্য গুপ্তিপাড়া একসময় প্রখ্যাত ছিল। গুপ্তিপাড়ার মাটির গুণে দেবের ভাষা মানুষ জানে। এই ছড়ার যে চল ছিল তা তো প্রকারান্তরে এখানকার পণ্ডিতদেরই প্রশংসা করেছে। গুপ্তিপাড়ার রথ জগৎবিখ্যাত। গুপ্তিপাড়ার মঠ দশনামী শৈব সম্প্রদায়ের মঠ এবং তারকেশ্বরের মোহান্তর অধীন। সত্যদেব সরস্বতী শান্তিপুরের এক ভক্ত গৃহস্থের বাড়ি থেকে শ্রীবৃন্দাবনচন্দ্রকে এনে গুপ্তিপাড়ার কাছে কৃষ্ণবাটি নামক এক অরণ্যের মধ্যে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর শিষ্য রাজা বিশ্বেশ্বর রায় ঠাকুরের জন্য যাবতীয় সম্পত্তি উৎসর্গ করে দেন। যেখানে শ্রীবৃন্দাবনচন্দ্র বিরাজ করেন স্বাভাবিক সৌন্দর্যের জন্য সেই স্থানটিকে গুপ্ত বৃন্দাবন নামেও আখ্যা দেওয়া হয়েছে। মন্দিরের ছাদ আটচালা ঘরের ধরনে নির্মিত। চালার উপর থাক আছে। তার ওপর তিনটি কলসি স্থাপনও করা আছে। পুরনো মন্দির একসময় কালের নিয়মে ভেঙে গেলে বাগবাজার নিবাসী গঙ্গানারায়ণ সরকার ১৮৩৮ খ্রিস্টাব্দে এই মন্দির নির্মাণ করে দেন। অনেক পরে মোহান্ত রামানন্দ স্বামী শ্রীরাধিকার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। রাজা বিশ্বেশ্বর রায় বৃন্দাবনচন্দ্রের সেবার জন্য গুপ্তিপাড়ার দক্ষিণ দিকে সোমরা গ্রাম দেবোত্তর হিসেবে দান করেন। বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দিরের শ্রীজগন্নাথের রথযাত্রা গুপ্তিপাড়ার অন্যতম প্রধান পালাপার্বণ। ‘এইরূপ অত্যুচ্চ রথ বাংলাদেশে আর কোথাও দেখিতে পাওয়া যায় কি না সন্দেহ।’ এ কথা জানিয়েছেন ‘হুগলি জেলার ইতিহাস ও বঙ্গসমাজ’-এর লেখক সুধীরকুমার মিত্র। একমাত্র পুরী ছাড়া আর কোথাও কোনও রথ এত দীর্ঘ পথ পরিক্রমা করে না। রথযাত্রা উপলক্ষে গুপ্তিপাড়ায় খুব বড় মেলা হয়। রেভারেণ্ড লং সাহেব ‘কলিকাতা রিভিউ’ নামক পত্রিকায় লিখেছিলেন, যে ১৮৪৫ খ্রিস্টাব্দে গুপ্তিপাড়ায় রথযাত্রা উপলক্ষে লক্ষাধিক লোকের সমাবেশ হয়েছিল। রথের মেলা দেখতে যাওয়ার সময় একটি নৌকো উল্টে গিয়ে ৪৫ জন লোকের মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছিল।
উল্টোরথের আগের দিন দেবতার ভোগ ঠাকুরকে নিবেদন করার পর পুরোহিতমশাই মন্দিরের সবক’টি দরজা খুলে দেন এবং জনসাধারণ সেই প্রসাদ লুট করে। একে বলা হয় ভাণ্ডার লুট। গুপ্তিপাড়ায় বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দিরে এই ভাণ্ডার লুট একটি বিশেষ অধ্যায়।
গুপ্তিপাড়ার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দ্রষ্টব্য হচ্ছে শ্রীরামচন্দ্রের মন্দির। শেওড়াফুলির রাজা হরিশচন্দ্র রায় এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। বলা দরকার, রাজা হরিশচন্দ্র রায় শেওড়াফুলির নিস্তারিণী কালীমন্দিরেরও প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু তথ্য বলছে, এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন শেওড়াফুলির রাজা মনোহর রায়। শেওড়াফুলির রাজবংশের কন্যা বাসবী পাল এই তথ্যকে সমর্থন করলেন ও জানালেন, শ্রীরামচন্দ্রের এমন দণ্ডায়মান অসাধারণ মূর্তি আর কোথাও নেই। গুপ্তিপাড়ার ব্রাহ্মণদের সম্পর্কে ‘তীর্থ মঙ্গল’ কাব্যে বিজয়রাম সেন লিখেছেন, ‘গুপ্তিপাড়ায় ব্রাহ্মণের কি করিব নীত।/ মহাতেজ ধরে তারা বিচারে পণ্ডিত।।’
গুপ্তিপাড়ার শ্রীশ্রীবৃন্দাবনচন্দ্রজিউ মঠের মোহান্ত মহারাজের পরিচালনায় গুপ্তিপাড়ার প্রসিদ্ধ ভাণ্ডার লুট ও শ্রীশ্রীজগন্নাথদেবের পুনর্যাত্রা উৎসব যথারীতি সম্পন্ন হয়। ভাণ্ডার লুট উৎসবটির বিশেষত্ব হল এই উৎসব পশ্চিমবঙ্গের অন্যত্র দেখা যায় না। গুণ্ডিচা বাড়িতে বিশ্রামরত জগন্নাথদেবের পুনর্যাত্রার পূর্ব দিন গোপ সম্প্রদায়ের জনগণ কর্তৃক জোরপূর্বক ভাণ্ডার লুণ্ঠন করা হয়। যা এই উৎসবের প্রধান অঙ্গ। এই উৎসব দেখতে প্রায় হাজার হাজার পুণ্যার্থীর সমাগম হয়। এটা কোনও শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠান নয়। এক ধরনের লোকাচার অনুষ্ঠান।
গুপ্তিপাড়ার স্নানযাত্রা অনুষ্ঠানে সাক্ষী থাকার জন্য নদীর এপার ওপার থেকে বহু মানুষ এসে উপস্থিত হন। উত্তর ২৪ পরগনা, নদীয়া, বর্ধমান, হুগলির কয়েক হাজার মানুষ মন্দিরের সামনে হাজির হন। গুপ্তিপাড়া মন্দিরের মোহান্ত স্বামী গোবিন্দানন্দপুরী জানিয়েছেন, প্রথা মেনে জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রাকে মন্দিরের সামনে নাট-মন্দিরে বের করে আনা হয়। দেবতার নিজস্ব স্নানমঞ্চে দেবস্নান হয়। এরপর দুধ মিশ্রিত ১০৮ কলসি গঙ্গাজলে প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে তিন বিগ্রহকে স্নান করানো হয়। এত জল ঢালা কি দেবতার সহ্য হয়? হয় না। স্বভাবতই গায়ে জ্বর আসে। দু’জন ডাক্তারের চিকিৎসায় ক’দিনের মধ্যেই দেবতাত্রয় সুস্থ হয়ে ওঠেন। পনেরো দিন পর দেবতার ইচ্ছে হয় রথে চড়ে মাসির বাড়ি বেড়াতে যাবেন। সাজানো হয় রথ। বড় বড় দু’টি কাঠের ঘোড়া রথ টানে। সঙ্গ দেয় এলাকার সমস্ত শ্রেণির মানুষ এবং দর্শনার্থী। সবাই রথ টানায় যোগদান করেন। প্রায় এক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে রথ। দু’পাশে অগণিত দোকানদার তাদের পসার সাজিয়ে বসে। বাজারের ভেতর দিয়ে সুভদ্রা, বলরাম ও জগন্নাথ পাইকবরকন্দাজ সঙ্গে নিয়ে মাসির বাড়ি উপস্থিত হন। রথের সামনে পিছনে অগণিত মানুষ। মানুষের মেলা চলে উল্টোরথ পর্যন্ত। এই মেলার বিশেষ আকর্ষণ হল বাজারে হিমসাগর, ফজলি আম এবং কাঁঠালের সম্ভার। মেলায় যাঁরা আসেন তাঁরা কাঁঠাল কিনে মেলায় বসেই তা ভেঙে মুড়ি দিয়ে খান। এটা গুপ্তিপাড়ার রথের মেলার বৈশিষ্ট্য। কাঠের আসবাবপত্র, লোহার জিনিস, মণিহারি দ্রব্যাদি নিয়ে দোকান খুলে বিক্রেতারা বসে। রথযাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হয় নয় দিন। মাসির বাড়ির আদর, ভালো ভালো খাবার খেয়ে জগন্নাথের তখন আর বাড়ি ফিরতে ইচ্ছা হয় না। তা দেখে পাড়ার ছেলেদের হিংসে হয়। তারা যুক্তি করে পরের দিন মাসির বাড়ির ভাণ্ডার লুট করবে। গুপ্তিপাড়ার জগন্নাথ মন্দিরেই একমাত্র ভাণ্ডার লুটের উৎসব হয়। প্রায় ৫৫০ টি মালসায়, যার প্রতিটিতে প্রায় ৮ কিলো করে খাবার থাকে, এগুলির মধ্যে থাকে গোবিন্দ ভোগ চালের খিচুড়ি, বেগুনভাজা, কুমড়ো ভাজা, ছানার রসা, পনির, পায়েস, ক্ষীর, ফ্রায়েড রাইস, মালপোয়া, সন্দেশ, রাবড়িসহ ৫২টি পদ।
কারও কারও মতে, বৃন্দাবনচন্দ্রের প্রচুর ধনসম্পত্তি ছিল। রাজা তাঁর রাজ্যের শক্তিমানদের চিহ্নিত করার জন্য এই ভাণ্ডার লুটের আয়োজন করেছিলেন। যারা বেশি সংখ্যায় ভাণ্ডার লুট করত তাদেরই স্বয়ং বৃন্দাবনচন্দ্র তাঁর মন্দির পাহারার দায়িত্বে রাখতেন। এ সবই শোনা কথা।
জগন্নাথদেব ভাণ্ডার লুটের ভয়াবহ ঘটনা দেখে আর কী করেন, মনের দুঃখে পরের দিন রথ উল্টো দিকে ঘুরিয়ে দেন। রথের উল্টোদিকে ঘোড়া লাগিয়ে রথের দড়ি খুলে উল্টোদিকে বেঁধে রথকে মন্দিরের দিকে চালাতে নির্দেশ দেন। রথের রশিতে টান পড়ে। বৃন্দাবনচন্দ্র তাঁর সব বন্ধুবান্ধব সাঙ্গ-পাঙ্গ নিয়ে নিজের বাড়ির দিকে যাত্রা করেন। যা জগন্নাথের উল্টো রথযাত্রা নামে পরিচিত।
আষাঢ় মাসে রথের মেলার সময় ভরা বর্ষা থাকে। কাঁঠাল, আমের গন্ধ, বাদাম ভাজা, গরম গরম জিলিপির মৌতাতে রথ এগতে থাকে। সমগ্র রাস্তা ম ম করে।
ষোড়শ শতাব্দীতে, তখন জগৎগুরু শংকরাচার্যের ভক্ত সন্ন্যাসীদের কোনও একজন ব্রাহ্মণ ব্যক্তি, নদীয়া জেলার শান্তিপুরে ভোরবেলায় গঙ্গাস্নানে গিয়ে স্বপ্নদৃষ্ট শ্রীশ্রীবৃন্দাবনচন্দ্রের দারুবিগ্রহ উদ্ধার করেন। ব্রাহ্মণ আদেশ পান, শ্রীকৃষ্ণের ওই মূর্তি শ্রীবৃন্দাবনচন্দ্রের নামে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ওই সুন্দর সুদর্শন সন্ন্যাসী গুপ্তিপাড়ার বৃন্দাবন মন্দিরে বিগ্রহ হিসেবে শ্রীবৃন্দাবনচন্দ্রকে প্রতিষ্ঠা করেন। অনেকের মতে, এই বিগ্রহের সঙ্গে গুপ্তিপাড়ার নামকরণের সম্পর্ক জড়িয়ে আছে। বিধর্মীর অত্যাচারে এই বিগ্রহকে গুপ্তভাবে হয়তো কোথাও লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। তারপর থেকেই এই স্থানের নাম হয় গুপ্তপল্লি বা গুপ্তিপাড়া। অনেকের মতে, গুপ্তদের বাস থেকেই গুপ্তিপাড়া। যাই হোক, বৃন্দাবনচন্দ্রের মন্দির যখন নির্মাণ হয়নি, প্রথমাবস্থায়, ছোট্ট একটি কুটিরে তিনি বাস করতেন। পরবর্তীকালে বাগবাজারের জমিদার গঙ্গানারায়ণ সরকার বহু অর্থ ব্যয় করে বিভিন্ন রকম কারুকার্যখচিত এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন। বৃন্দাবনচন্দ্রের পিছনের উঁচু বেদিতে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা মূর্তির অধিষ্ঠান। একেবারে সামনে রয়েছেন গরুড়। মন্দিরের গর্ভগৃহে অনেক আঁকা ছবি আছে। যাকে বলে ফ্রেসকো। এই কাজ এখন প্রায় দুর্লভ। জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রার মূর্তিগুলি নিমকাঠের তৈরি। ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে বৃন্দাবন মঠের নবম দণ্ডীস্বামী মহারাজের উদ্যোগে নানা কারুকার্য বিশিষ্ট ১৩ চূড়ার এক বিশাল রথ নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই হিসেবে এই বছর রথের বয়স ২৮৫ বছর। শোনা যায়, রথের আকার পুরীর রথের চেয়েও বড়ো ছিল। পরবর্তীকালে ২৪তম দণ্ডীমহারাজ পূর্ণানন্দ স্বামীর আমলে সংস্কারের মাধ্যমে রথের আকার কিছুটা ছোট করা হয়। ২৩তম দণ্ডী মহারাজ পৃথানন্দ স্বামীর আমলে শ্রীজগন্নাথদেবের রথযাত্রার সময় রথের চাকায় পিষ্ট হয়ে কয়েকজনের মৃত্যু পর্যন্ত হয়। নিজে আহত হন। অল্পদিনের মধ্যেই সমাধিস্থ হন। তখনই পূর্ণানন্দ স্বামী রথের আকার তেরো চূড়া থেকে কমিয়ে ন’টি চূড়ায় পরিণত করেন। গুপ্তিপাড়ার রথ উচ্চতায় ৫১ ফুট। ৩৬টি চাকা রথ চলতে সাহায্য করে। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে যখন ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল তখন রথ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ১৯৫৭ সালে ২৮তম দণ্ডীমহারাজ খগেন্দ্রানন্দ স্বামীর সময় নতুন করে রথটি সারানো হয়েছিল।
শ্রীশ্রীবৃন্দাবনচন্দ্র মঠের প্রশাসক মহান্ত স্বামী গোবিন্দানন্দপুরী জানিয়েছেন, লক্ষ্মীর সঙ্গে মন কষাকষি হওয়ায় জগন্নাথদেব লুকিয়ে মাসির বাড়িতে আশ্রয় নেয়। লক্ষ্মী ভাবলেন স্বামী বোধহয় পরকীয়া টানে মজে গিয়েছে। অন্য কোথাও চলে গিয়েছে। বৃন্দাবনের কাছে জানতে পারলেন মাসির বাড়িতে রয়েছেন জগন্নাথ স্বামী। মন ঠিক করাতে লক্ষ্মী দেবী লুকিয়ে ওই বাড়িতে সর্ষে পোড়া ছিটিয়ে আসেন। কাজ না হওয়ায় লক্ষ্মীর অনুরোধে বৃন্দাবন ও কৃষ্ণচন্দ্র লোকলস্কর নিয়ে মাসির বাড়ি যান। ‘গুপ্তিপাড়ায় শ্রীশ্রীবৃন্দাবনজিউর আবির্ভাব ও রথযাত্রা’ বইতে প্রফুল্লকুমার পান লিখেছেন দু লাইনের একটি কবিতা। ‘লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় ভোগ উপাচার/ তাতে জগন্নাথে হয় চেতনা সঞ্চার।’ এখন সেই মালসাগুলোয় থাকে অনেক রকম খাবার। গুপ্তিপাড়ার বেশ কিছু বাড়িতে সেই রাতে ও পরের দিনও রান্না করার প্রয়োজনই পড়ে না। ১৮৫৮ সালে খাবার তৈরির ব্যাপারে নাকি ১ লক্ষ লোকের সমাবেশ হয়েছিল ভাণ্ডারা লুট অনুষ্ঠানে। ২৮৫ বছরের প্রাচীন এই রথ চারতলা সমান উঁচু। উচ্চতা প্রায় ৩৬ ফুট। দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ৩৪ ফুট। আগে রথে ১৩টি চূড়া ছিল। এখন চূড়ার সংখ্যা ৯টি। বৃন্দাবন মন্দির থেকে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা রথে চড়ে যান প্রায় এক কিলোমিটার দূরে গোঁসাইগঞ্জ বড়বাজারে মাসির বাড়ি গুণ্ডিচা বাড়িতে। রথে থাকে চারটি দড়ি। প্রতিটি প্রায় ৩০০ ফুট দৈর্ঘ্য। কেবল মহিলাদের জন্যই একটি দড়ি বরাদ্দ। দড়ির আঁশ ঘরে রাখলে মঙ্গল হতে পারে এই বিশ্বাসে অনেকে চেষ্টা করেন রথের দড়ির আঁশ খুলে নিতে। প্রফুল্লকুমার পান লিখছেন, ‘গুপ্তিপাড়া- রথ-কাছি ক্রমে ছোট হয়।/ রথের টান-কালে তা ছিঁড়ে ছিঁড়ে নেয়।।/ ছেঁড়া-কাছি ঘরে রাখে শান্তির কারণে।/ কত শত মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয় মনে।।’
রথের দিন সকাল দশটায় ঠাকুরের ভোজন হয়ে যায়। বেলা বারোটায় প্রথম রথের টান শুরু হয়। ৫০০ মিটারের মতো দূরে গিয়ে তখনকার মতো রথটান শেষ হয়। তারপর বিকেল চারটের সময় বাকি পথ রথ পরিক্রমা করে। মোটামুটি এক কিলোমিটারের মতো রাস্তা। পরিক্রমায় সময় লাগে বহুক্ষণ। কারণ রাস্তায় প্রচুর লোক থাকে। রথযাত্রা লোকারণ্য মহা ধুমধাম। সোজা রথে পূর্ব থেকে পশ্চিমে আর উল্টো রথে উত্তর থেকে দক্ষিণে রথ পরিক্রমা করে। ফলে চারদিকই পরিক্রমা হয়ে যায় গুপ্তিপাড়ার রথের। প্রবাদ এই যে, গুপ্তিপাড়ার রথ টানলে পুরীর রথ টানার ফল ভোগ করা যায়।