‘আত্মনির্ভর ভারত’-এর বার্তা দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যার অর্থ, নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে দেশকে। এ জন্য স্বদেশি পণ্য কেনাবেচার উপর জোর দিয়েছেন তিনি। এতে ভারতের বাজার সমৃদ্ধশালী হবে। গতি পাবে অর্থনীতি। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় সরকার ও শাসকবাহিনীর নিরন্তর প্রচার হল, ভারত ইতিমধ্যেই চতুর্থ বৃহত্তর অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে। আর কয়েকবছরের মধ্যে আরও একধাপ এগিয়ে তৃতীয় স্থান দখল করবে এই দেশ। দেশের প্রধান শাসক ও তাঁর দলবলের এমন বার্তা ও ঘোষণায় বুকের ছাতি ৫৬ ইঞ্চি হওয়ার কথা। কিন্তু তা হতে পারছে না প্রকৃত সত্য সামনে চলে আসায়। সেই সত্য হল, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বদলে দেশের প্রায় প্রত্যেক নাগরিকের মেরুদণ্ড এখন সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। ‘সৌজন্য’ মোদির ‘আচ্ছে দিন’-এর সরকার। দেশের সর্বোচ্চ ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক জানিয়েছে, কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের জমানায় নাগরিকদের উপর ঋণের বোঝা বেড়েই চলেছে। সহজ কথায়, ধার করে ঘি খাওয়াচ্ছে মোদি সরকার। কেন্দ্রের সরকার চলছে ধারের টাকায়।
সরকার চালাতে গেলে বাজার থেকে ধার করতে হবে— এ চিরকালীন সত্য। সরকারি তথ্য বলছে, ২০১৪-তে মোদি যুগ শুরুর সময় ভারত সরকারের ঋণ ছিল ৭০ লক্ষ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ -এর অর্থবর্ষের শেষে তা ২০০ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর অর্থ, দেশের প্রতিটি নাগরিকের মাথায় এখন ১ লক্ষ ৪২ হাজার টাকা ঋণের বোঝা ঝুলছে! এগারো বছর আগে ঋণের পরিমাণ ছিল দেশের জিডিপির ৫১.৫ শতাংশ। মোদির ‘সুশাসনে’ সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬ শতাংশ। এই বিপুল ধারের মধ্যে শুধু বিদেশি ঋণের পরিমাণই টাকার অঙ্কে প্রায় ৬৫ লক্ষ কোটি টাকা। এই হার গত আর্থিক বছরের তুলনায় ১০.১ শতাংশ বেশি। সরকার জানিয়েছে, চলতি অর্থবর্ষে এই বিদেশি ও অভ্যন্তরীণ ঋণ পরিশোধ করতে শুধু সুদ গুনতে হবে আনুমানিক ১২ লক্ষ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। তবে শুধু কেন্দ্রেই নয়, সম্প্রতি সিএজি-র অডিট রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, দেশে ২৮টি রাজ্যের মোট ঋণের পরিমাণ ২০১৩-১৪ সালের ১৭.৫৭ লক্ষ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২০২২-২৩ সালে দাঁড়িয়েছে ৫৯.৬ লক্ষ কোটি টাকায়। তালিকার শীর্ষে রয়েছে পাঞ্জাব।
বিরোধীরা একে ‘আচ্ছে দিনের ঋণ’ বলে কটাক্ষ করে বলেছে, কেন্দ্রের বিজেপি সরকার কর্পোরেট ও ধনী ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেওয়ার জন্য সাধারণ নাগরিকদের ঋণের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টাকার দাম পড়ে যাওয়া বিদেশি ঋণ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। সরকারের দাবি, রাজকোষ ঘাটতি কমিয়ে ধার কমানোর চেষ্টা করছে কেন্দ্র। গত অর্থবর্ষে জিডিপি-র প্রেক্ষিতে ঘাটতি ছিল ৪.৮ শতাংশ। চলতি অর্থবর্ষের বাজেটে তা ৪.৪ শতাংশে নামানোর লক্ষ্যমাত্রা ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু ঋণের দায় কমানোর জন্য দেশের আর্থিক বৃদ্ধির হারকে ঠেলে উপরে তোলার জন্য যে পরিকল্পনা দরকার— তা হচ্ছে না বলেই মত বিশেষজ্ঞদের। তাছাড়া পরিকাঠামো উন্নয়নের বদলে দান-খয়রাতি বা বহুবিধ প্রচারে লাগামছাড়া খরচ চলতে থাকলে ঋণ শোধের অর্থ কোথা থেকে আসবে— সেই প্রশ্নও উঠেছে। একদিকে কেন্দ্রের করুণ আর্থিক দশা, অন্যদিকে রাজ্যগুলিকে ক্রমাগত আর্থিকভাবে বঞ্চিত করে ঋণ করার দিকে ঠেলে দিচ্ছে মোদি সরকার। যেমন, সেস ও সারচার্জ বাবদ কেন্দ্রের প্রতিবছর আয় হয় ১.৭ লক্ষ কোটি টাকা। অথচ এর কোনও ভাগ পায় না রাজ্যগুলি। সদ্য জিএসটির হার কমায় রাজ্যগুলির যে ক্ষতি হবে, তা পূরণেও কোনও উচ্চবাচ্য করছে না কেন্দ্র। ফলে রাজ্যগুলি রাজস্ব হারাচ্ছে। রাজ্যগুলি থেকে কর বাবদ কেন্দ্র যা আদায় করে, তার ৪৫-৫০ শতাংশ অর্থ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিও মানেনি মোদি সরকার। উপরন্তু বাংলার মতো বিরোধী শাসিত রাজ্যকে ভাতে মারতে একাধিক কেন্দ্রীয় প্রকল্পের ন্যায্য পাওনা আটকে রেখেছে কেন্দ্র। টাকার অঙ্কে যা ২ লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি। এক কথায়, ন্যায্য পাওনা ও বঞ্চনার মাধ্যমে রাজ্যগুলিকে অর্থনীতিতে দেউলিয়া করে দেওয়ার নীতি চলছে মোদি যুগে। সব মিলিয়ে তাই আগামী দিনে নাগরিকদের উপর ঋণের বোঝা বাড়ার সম্ভাবনা প্রবল। রাজ্যগুলির আরও বিপদে পড়ার সম্ভাবনা বেশি। প্রশ্ন উঠেছে, এই নীতিতে ‘আত্মনির্ভর’ হবে ভারত?