হারাধন চৌধুরী: দক্ষিণ এশিয়ায় নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজের জয়যাত্রা আর করাচিতে নৌসেনা বিদ্রোহ উপমহাদেশে ইংরেজের জন্য শেষঘণ্টা বাজিয়ে দিয়েছিল। ১৯৪৬-এর দাঙ্গার সময়ই স্পষ্ট হচ্ছিল যে ভারতের স্বাধীনতা আসন্ন। একমাত্র চার্চিল তা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। যুদ্ধোত্তর নির্বাচনে চার্চিল পরাজিত হতেই পরিস্থিতি বদলে গেল। লেবার পার্টির নেতা এটলি প্রধানমন্ত্রী হলেন। তাঁর ঘোষণায় স্বাধীনতার সূর্যও হল নিকটবর্তী। একইসঙ্গে ধন্দ তৈরি হল যে, এটলি একজন চার্চিল নন ঠিকই, কিন্তু হাড়ে-মজ্জায় তো ইংরেজই। সোনার ডিম পাড়া একটা তাজা হাঁস কি হাসিমুখে ছেড়ে দিয়ে যাবে ইংরেজ? এই সংশয় গভীরতর হচ্ছিল সবারই মনে। তবে শেষ নষ্টামি করার জন্য ইংরেজকে কোনও গবেষণা কিংবা কসরত করতে হয়নি। ভারতবাসীরাই তাদের হাতে হিন্দু-মুসলিম অনৈক্যের লোপ্পা ক্যাচ তুলে দিয়েছিল। উপমহাদেশের এই দুই প্রধান ধর্মীয় সম্প্রদায়ের কতিপয় নেতা একসঙ্গে থাকতে রাজি হয়নি। ‘হিন্দুস্থান’ থেকে কিছু ভূমিভাগ কেটে নিয়ে পৃথক ‘পাকিস্তান’ নামক রাষ্ট্রে শান্তিতে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চেয়েছিল একদল মুসলিম নেতা। কিন্তু ভারতভাগের মতো সর্বনাশা সিদ্ধান্তে সায় ছিল না গান্ধীসহ কিছু নেতৃত্বের। তাঁরা মনে করতেন, আর একটু সবুর করলেই মেওয়া ফলবে। কিন্তু অন্য পক্ষের তাড়া ছিল লক্ষণীয়, তার মধ্যে দুই নবীন রাষ্ট্রের সর্বেসর্বা হওয়ার লোভ যে বিস্তর ছিল তা বুঝতে কারও দেরি হয়নি।
যাই হোক, স্বাধীনতার দাবি প্রতিষ্ঠার নামে আমরা উপহার পেয়েছিলাম ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’! দেশভাগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতেই সব সরকারি কর্মচারীর সামনে অপশন ছিল ‘হিন্দুস্থান’ অথবা ‘পাকিস্তান’ যেকোনও একটি স্বাধীন রাষ্ট্র বেছে নেওয়ার। এই প্রসঙ্গে ভবতোষ দত্ত তাঁর ‘আট দশক’ গ্রন্থে স্মৃতিচারণা করেছেন, ‘‘ইসলামিয়া কলেজে ছাত্র এবং মুসলমান অধ্যাপক প্রায় সকলেই লিগপন্থী। ...আমাদের মুসলমান সহকর্মীরা সবাই লিখলেন, ‘পাকিস্তান, প্রেফারেবলি ক্যালকাটা’। তাঁরা চাইছিলেন, অবিভক্ত বঙ্গদেশের সবটাই পাকিস্তানে যাক, আর তা না-হলে অন্তত কলকাতাসুদ্ধ গঙ্গার পূর্বতীরে হোক সীমারেখা। ...ছেচল্লিশের দাঙ্গার ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’-এর একটা নতুন সংস্করণ ‘লড়কে লেঙ্গে কলকাতা’ কখনো কখনো শোনা যেত।’’
যাই হোক, এই পৃথিবীতে এমন কোনও বস্তু বা বিষয় নেই যা বিবদমান দু’পক্ষেরই সব আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারে। ভারতের ভূগোল পাল্টে দিয়ে স্বাধীনতার জন্য রচিত নয়া ইতিহাসকেও একইরকম অসহায় দেখেছি আমরা। এই যেমন বহু প্রবীণ ব্যক্তি আজও হা হুতাশ করেন, ‘‘আমাদের যশোর-খুলনা, কুমিল্লাসহ অনেক হিন্দুপ্রধান জায়গা পূর্ব পাকিস্তানে ঢুকে গেল!’’ মুসলিমপ্রধান মুর্শিদাবাদ, মালদহ প্রভৃতির ভারতভুক্তিও দুঃখ দিয়েছিল পাকিস্তানের দাবিদারদের। সর্বোপরি, কলকাতা ভারতের রয়ে যাওয়ার বেদনা আজও ক্রোধের রূপ হয়ে ফুটে বেরতে দেখি ইউনুস জমানার ঢাকায়।
বাঙালির সেই লড়াই আজও অব্যাহত—‘সংখ্যালঘু’ পরিচয়ে। পশ্চিমবঙ্গে সংখ্যালঘু মুসলিমরা, হিন্দুরা সংখ্যালঘু পাকিস্তানে (১৯৭১ থেকে বাংলাদেশে)। বাংলাভাষী বা বাঙালি জাতিকে নানাভাবে ‘সংখ্যালঘু’ করে দিতে পেরেছিল ইংরেজ, এটাই তাদের সবচেয়ে বড় ‘সাফল্য’! যখন ভারতের শাসনদণ্ড ব্রিটিশের হাতছাড়া হয়ে গেল, তখন চার্চিল ভারত সম্পর্কে অত্যন্ত অবমাননাকর মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর মোদ্দা বক্তব্য ছিল, এই অশিক্ষিত, বিশৃঙ্খল, ক্ষমতালোলুপ জাতি স্বাধীনতা বেশিদিন টিকিয়ে রাখতে পারবে না। নিজেদের মধ্যে খেয়োখেয়ি করেই একে ধ্বংস করে ফেলবে। চার্চিলের বিলো দ্য বেল্ট মন্তব্যে সেদিন অনেকেই আহত হয়েছিলেন, এবং তাঁর বাপান্তও করেছিলেন অনুমান করতে পারি। কিন্তু তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী কি খুব ভ্রান্ত ছিল? জিন্নার সাধের ‘ইসলামিক রিপাবলিক অফ পাকিস্তান’ তার অখণ্ডতা সিকি শতকও ধরে রাখতে পারেনি। ভারতবাসী, বাঙালি কেউই নিজের ভাগ্য গড়ে নিতে যত্নবান নয়, বস্তুত আমরা প্রাণপাত করে চলেছি চার্চিলের স্বপ্নপূরণ করার জন্যই।
স্বাধীনতার ৭৮ বর্ষপূর্তি থেকে মাত্র ১৫ দিন দূরে দাঁড়িয়ে কী দেখছি আমরা? এপার বাংলায় নতুন করে ‘ভাষা আন্দোলনে’ নেমেছে একদল বাঙালি। আর এক দল বাঙালিই তার তীব্র বিরোধিতা এবং উপহাস করছে তাকে। সমস্যা একটাই, কেন্দ্রীয় শাসকের পরোক্ষ মদতে বাংলা ভাষার মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত এবং বাঙালির সম্মান ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। এই অনাচার বিজেপি/এনডিএ-শাসিত রাজ্যগুলিতেই সর্বাধিক। সবচেয়ে বেড়ে খেলছে একদা ‘বঙ্গাল খেদা’ খ্যাত অসম, যে-রাজ্যের গেরুয়া কর্ণধার হিমন্ত বিশ্বশর্মা, যাঁর একটি ডায়ালগ যাকে বলে মারাত্মক ভাইরাল হয়েছে, ‘‘মাতৃভাষা ‘বাংলা’ লিখলে ‘বিদেশি’ (পড়ুন, বাংলাদেশি নাগিরক) চিনে নিতে আমাদের সুবিধা হবে!’’ বলার অপেক্ষা থাকে না যে, ভারতের বহু স্থানে বাঙালি-বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেওয়ার পিছনে রয়েছে গরিব শ্রমিক শ্রেণির মুসলিম বাঙালিদের বিপন্ন করে তোলার মতলব। নেপথ্যে ভোটের অঙ্ক কতখানি তুড়ুক তুড়ুক করছে তা শিশুরাও ধরে ফেলেছে।
অন্যদিকে, বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের গায়ে ফের পাকিস্তানের আলখাল্লা, অলংকার চাপিয়ে দেওয়ার জন্য মরিয়া ইউনুসরাজ! অতএব, পড়শি দেশে হিন্দুসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জিনা হারাম করে তোলা হচ্ছে। সেখানে হারাম গণ্য হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের লেখা জাতীয় সংগীত এবং বিশ্বকবির যাবতীয় পুণ্যস্মৃতিও। এছাড়া, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী এবং আরও অসংখ্য অমুসলিম মনীষীর কীর্তিগাথা মুছে ফেলার আয়োজন সেখান সম্পূর্ণ হওয়ার পথে। সবার আগে আক্রান্ত হয়েছেন দেশটির স্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমান স্বয়ং। ‘সাহসী’ কালো হাতগুলি অন্যান্য দিকে উদ্যত হয়ে চলেছে অতঃপর। বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা, বিশেষত হিন্দুরা নিপীড়নের শিকার দেশভাগের পর পরই। ভাষা আন্দোলনের সোনার ফসল ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ পেয়ে সবাই ভেবেছিল, এবার বৈষম্যের অবসান হবেই। কিন্তু অচিরে মুজিব-হত্যার মধ্য দিয়ে পাকপন্থীরা বুঝিয়ে দিয়েছিল সেই ভাবনা কত বড় ভুল ছিল। পরবর্তীকালে তারা প্রমাণ সাজিয়ে রেখেছে থরে থরে। হিন্দুবিতাড়নে রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। এই ব্যাপারে কোন জমানা এগিয়ে কিংবা পিছিয়ে, তার বিচার অর্থহীন।
তবে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেল যা হয়, ২০২৪-এ বাংলাদেশের হিন্দুরা ঘুরে দাঁড়াবার সংকল্প নেয়। তারা প্রতিবাদে গর্জে ওঠে এবং ঘোষণা করে যে, ‘আমার দেশ আমার মা/ আমি আর ছাড় না।’ হিন্দুদের এই দাবি এক অভূতপূর্ব আন্দোলনেরই রূপ পায় সেখানে। তবে হুমকি-ধমকিতে কাজ না-হওয়ায় সরাসরি কালা কানুন হাতিয়ার করে এই আন্দোলন ভেঙে দিতে মরিয়া ইউনুস প্রশাসন। রাষ্ট্রদ্রোহের মিথ্যে অভিযোগে গত ২৫ নভেম্বর সনাতন আন্দোলনের বিশিষ্ট মুখ প্রভু চিন্ময়কৃষ্ণ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে এবং দেশজুড়ে বহু হিন্দু নাগরিককে নানাভাবে হেনস্তা এখনও অব্যাহত বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আর এসব হবে নাই-বা কেন? বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানের নরকে পাঠাবার খোয়াব নিয়ে যারা মশগুল তারা তো ফিল্ড মার্শাল (যদিও বহু পাক নাগরিক মুখ টিপে বলছেন ‘ফেইলড মার্শাল’) আসিম মুনিরের ভাবশিষ্য। মুনির তো শেষকথা বলেই দিয়েছেন, ‘‘হিন্দু-মুসলমান সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতি। তারা কখনোই একসঙ্গে থাকতে পারে না।’’
আমেরিকাসহ উন্নত গণতান্ত্রিক দুনিয়া দুই দেশে রকমারি কায়দায় সংখ্যালঘু শ্রেণি তথা বাঙালিদের মানবাধিকারহরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কিন্তু অভিযুক্তরা এসব আদৌ পাত্তা দেয় কি? না। কারণ তারা যে পেশাদার! ক্ষমতা দখলের রাজনীতি করেই তাদের পেটের ভাত জোগাড় করতে হয়। চার্চিল থেকে মুনির টাইপের কিছু নিকৃষ্ট লোকজনই তাদের গুরুঠাকুর। আমাদের স্বাধীনতালাভের মুহূর্তটা ছিল মধ্যরাত্রি। শোনা যায়, বিশিষ্ট জ্যোতিষীদের পরামর্শে ওই মাহেন্দ্রক্ষণ নির্বাচন করা হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক উৎসবে মহাত্মা গান্ধী শামিল হননি। রাত ১২টায় বেতারে জওহরলাল নেহরুর আবেগকম্পিত কণ্ঠ শুনেছিল দুনিয়া, ‘‘বহু বছর আগে আমাদের ভাগ্যদেবতার সঙ্গে যে অভিসারের সংকল্প আমরা নিয়েছিলাম তা পূর্ণ করার সময় এসেছে।’’ এরপর প্রথম প্রধানমন্ত্রীর দূরদৃষ্টির প্রতি কতটা শ্রদ্ধা রাখতে পারি আমরা ‘নিজভূমে পরবাসী’ বাঙালিরা?