প্রতিটি ভাষা ও সংস্কৃতির কিছু নিজস্ব রীতি আছে। সেই ভাষা ও সংস্কৃতিভুক্ত ব্যক্তিকে, সমাজবদ্ধ জীব হিসেবে, তা অনুসরণ করে চলতে হয়। কোনও একটি ভাষা ও সংস্কৃতি একা বিকশিত হতে পারে না। এজন্য দরকার হয় অন্যান্য সংস্কৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন গড়ে তোলা। রবীন্দ্রনাথ এটাকেই ‘দিবে আর নিবে মেলাবে মিলিবে’ বলে সহজ করে দিয়েছেন। সংস্কৃতি হল সবচেয়ে বড়ো সম্পদ। বস্তুগত সম্পদ কিছু দিলে কমে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর এখানেই মাহাত্ম্য সাংস্কৃতিক সম্পদের। এই সম্পদ অকাতরে বিলিয়ে দিলেও কমে না, বরং পারস্পরিক শ্রীবৃদ্ধির পরিসর বৃদ্ধি পায়, ঠিক যেমন জ্ঞানবিজ্ঞান। সাংস্কৃতিক বিনিময় কতটা হয়েছে তা বোঝা যায়, আমরা প্রতিবেশীর সংস্কৃতি কতটা আত্মীকরণ করতে পারলাম তার কিছু নমুনা দেখে। যদি একজন হিন্দু প্রতিবেশী মুসলিম রীতিনীতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হন এবং ভাববিনিময়ের সময় তা পালন করেন তবে তা ভালো প্রতিবেশীর নমুনা হয়ে ওঠে। বিষয়টি বিপরীত দিক থেকেও সত্য। এটা শুধু হিন্দু বা মুসলমানের ব্যাপার নয়, অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
বাঙালি ‘স্যার’ বা ‘ম্যাডাম’ কালচারে অভ্যস্ত হওয়ার আগে সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি ‘বাবু’ সম্বোধনটা ছিল সম্মানসূচক। অন্যদিকে সম্ভ্রান্ত মহিলাদের ‘দেবী’ সম্বোধন করার রীতি আমরা দেখেছি। তবে একেবারে পারিবারিক পরিসরে জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা গোত্রের ব্যক্তিদের ‘দাদা’ সম্বোধন করা হয়ে থাকে। পরিবারবহির্ভূত জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকেও ‘দাদা’ সম্বোধনের প্রচলন থাকলেও তার সীমাবদ্ধতাও লক্ষণীয়। বঙ্গীয় সমাজে কিছু গুণী মানুষ ‘মহাশয় ব্যক্তি’ হিসেবেই সম্মানিত। এই গোত্রভুক্ত ব্যক্তিদের কোনওভাবেই ‘দাদা’ সম্বোধন করা চলে না। তাঁদের ‘দাদা’ সম্বোধনে সম্মানপ্রদর্শন যথাযথ তো হয়ই না, বরং তাঁদের স্তরটা নামিয়ে আনা হয়। যেমন বাংলার রাজনীতিতে কোনও বড়ো কমরেডকেও জ্যোতি বসুকে ‘জ্যোতিদা’ বলতে শোনা যায়নি। সাধারণ মানুষ থেকে দলীয় সতীর্থ প্রায় সকলেই তাঁকে ‘জ্যোতিবাবু’ বলতেন। আর রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, শ্রীঅরবিন্দ, স্বামী বিবেকানন্দ, সুভাষচন্দ্র, প্রফুল্লচন্দ্র, জগদীশচন্দ্র প্রমুখ মনীষী বাঙালির ক্ষেত্রে এমন সম্বোধনের কথা বাঙালিরা কল্পনাই করতে পারে না। বিদ্যাসাগরকে ‘মহাশয়’, বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে ‘সাহিত্যসম্রাট’, রবীন্দ্রনাথকে ‘গুরুদেব’, বিবেকানন্দ সম্পর্কে ‘স্বামীজি’ আর প্রফুল্লচন্দ্র ও জগদীশচন্দ্রকে ‘আচার্য’ বলে সম্মান জানানো হয়। সত্যি কথা বলতে কী, এঁরা কেবল মনস্বী নন, বাঙালির একেকটি আবেগ বিশেষ। এঁদের প্রতি সামান্যতম অবহেলা, অসম্মান বাঙালি কোনও দিনই মেনে নিতে পারে না। আর সেটাই করে বসেছেন স্বয়ং দেশের প্রধানমন্ত্রী। তাও আবার সংসদের ভিতরে। স্বাধীনতার মন্ত্র ‘বন্দে মাতরম্’-এর স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্রকে তিনি ‘বঙ্কিমদা’ সম্বোধন করে বসেছেন! তাও একবার নয়, বারবার!
ফলে মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছে এমনটা ভেবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে নরেন্দ্র মোদি ইচ্ছাকৃভাবে কিংবা জেনে বুঝে সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে অসম্মান করেছেন, এমনটাও নিশ্চয় নয়। কিন্তু দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে এই ‘বিপর্যয়’ প্রত্যাশিত ছিল না। এই অবাঞ্ছিত কাণ্ড মোদিজি একা করেননি, সঙ্গে ‘দোসর’ কেন্দ্রীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী গজেন্দ্র সিং শেখাওয়াত। লোকসভার ভাষণে সাহিত্যসম্রাটকে তিনি ‘বঙ্কিম দাস চ্যাটার্জি’ নামে চেনালেন! ভারতের মতো সুবৃহৎ যুক্তরাষ্ট্রের শাসক পক্ষের চেহারা এমন করুণ, ভাবা যায়! এই কেলেঙ্কারি হবে নাই-বা কেন? মোদিজির মাথায় তো তখন ‘বন্দে মাতরম্’ বন্দনার চিন্তা ছিল না। তাঁর মগজে গিজ গিজ করছিল নেহরু এবং কংগ্রেসকে পেড়ে ফেলার প্রতিহিংসার আগুন। প্রধান বিরোধী দলের উদ্দেশে সেই অগ্নিবর্ষণ করতে গিয়েই মোদিজি কালিমালিপ্ত করে বসলেন সংসদের গরিমাকে। তাতে এটাও বেআব্রু হয়ে পড়ল যে রাজনীতিক হিসেবে নরেন্দ্র মোদি যত বড়ো ধুরন্ধর ততোধিক অজ্ঞ নিজের দেশ এবং দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে। হিন্দু, হিন্দি, হিন্দুস্তান জপ করতে করতে ভারতের বহুত্বের সাধনার আদ্যশ্রাদ্ধ করে বসেছে গেরুয়া বাহিনী।