Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পরীক্ষিত বন্ধুত্ব

ভ্লাদিমির পুতিনের ভারত সফরের চুলচেরা বিশ্লেষণে মত্ত আমেরিকা-সহ পশ্চিমি বিশ্ব। দু’দিনের জন্য এসে সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে নয়াদিল্লির হাতে কী কী ‘কৌশলগত উপহার’ তুলে দিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট? এই নিয়ে কূটনৈতিক মহলে তুঙ্গে উঠেছে জল্পনা।

পরীক্ষিত বন্ধুত্ব
  • ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

ভ্লাদিমির পুতিনের ভারত সফরের চুলচেরা বিশ্লেষণে মত্ত আমেরিকা-সহ পশ্চিমি বিশ্ব। দু’দিনের জন্য এসে সম্পর্ককে আরও মজবুত করতে নয়াদিল্লির হাতে কী কী ‘কৌশলগত উপহার’ তুলে দিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট? এই নিয়ে কূটনৈতিক মহলে তুঙ্গে উঠেছে জল্পনা। তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে বার বার খবরের শিরোনামে এসেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত পর্যায়ের ‘বন্ধুত্ব’। ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে চলতি বছরে ‘বন্ধু’ পুতিনের ভারত সফরে একাধিক বার প্রোটোকল ভেঙেছেন মোদি। বর্তমান জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

Advertisement

দিল্লির হায়দরাবাদ হাউসে ২৩তম ভারত-রাশিয়া শীর্ষবৈঠকে যোগ দেন মোদি ও পুতিন। সেখানে রুশ প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়িয়ে মোদি বলেন, ‘আমরা নিরপেক্ষ নই, তবে আমরা শান্তির পক্ষে রয়েছি।’ ওই অনুষ্ঠানে অপরিশোধিত খনিজ তেল নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন রুশ প্রেসিডেন্ট। মার্কিন ‘রক্তচক্ষু’ উপেক্ষা করে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ঘোষণা করেন, কোনও বাধা ছাড়াই ভারতের বুকে বয়ে যাবে রুশ তেল। রাশিয়ার থেকে সস্তা দরে অপরিশোধিত খনিজ তেল কেনার জন্য ভারতীয় পণ্যে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সম্প্রতি এ বিষয়ে বিস্ফোরক দাবি করেন তিনি। ট্রাম্পের যুক্তি, তাঁর হুমকির জেরে মস্কো থেকে ‘তরল সোনা’ আমদানি হ্রাস করেছে নয়াদিল্লি। এই পরিস্থিতিতে পাশাপাশি বসে মোদি-পুতিনের দেওয়া বার্তাকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। জ্বালানির পাশাপাশি ২০৩০ সাল পর্যন্ত দু’দেশের মধ্যে কৌশলগত অর্থনৈতিক বিস্তারে মোদি ও পুতিন সম্মত হয়েছেন বলে জানা গিয়েছে। যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে পুতিনকে পাশে নিয়ে মোদি বলেন, রাশিয়ান পর্যটকদের জন্য এ বার বিনামূল্যে ৩০ দিনের ই-ভিসা চালু করবে ভারত। বৃত্তিমূলক শিক্ষা, দক্ষতা এবং প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবে নয়াদিল্লি ও মস্কো। ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ কম নয়। কিন্তু তাতে ভারতের রপ্তানি যৎসামান্য। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বহর পৌঁছেছিল ৭০০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি। যার মধ্যে ভারতের রপ্তানি ছিল মাত্র ৪৯০ কোটি। সেখানে রাশিয়ার ৬৩৮০ কোটি। ২০৩০ সালের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ১০,০০০ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে দু’পক্ষ। একইসঙ্গে জাহাজনির্মাণ শিল্প, অসামরিক পারমাণবিক শক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ খনিজ বিনিয়োগ নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। রাশিয়া আরও জানিয়েছে, ভারতের সবচেয়ে বড়ো পারমাণবিক প্রকল্প নির্মাণেও সাহায্য করবে রাশিয়া। একইসঙ্গে দুই দেশ সম্মত হয়েছে, রাশিয়ায় তৈরি অস্ত্রশস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে প্রযুক্তির প্রয়োজন, তা তৈরি করবে ভারত। মনে করা হচ্ছে, এর মাধ্যমে ভারত এবং রাশিয়ার প্রতিরক্ষা বিষয়ে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা আরও বৃদ্ধি পাবে। ভারতীয় সেনাদের একাংশের অভিযোগ ছিল যে, রাশিয়া থেকে আমদানি করা অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে অনেক সময় সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় তাদের। সেই অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্রও। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের অধীনে এ দেশে সেই প্রযুক্তি তৈরি হলে সমস্যা মিটবে বলে মনে করা হচ্ছে। রুশ প্রেসিডেন্টের কথায়, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে ভারত ও রাশিয়ার লেনদেন পৌঁছে গিয়েছে ৬৪ বিলিয়ন ডলার। শীঘ্রই এই অঙ্কটা পৌঁছে যাবে ১০০ বিলিয়ন ডলারে। এই বাণিজ্যের ৯৬ শতাংশই হয়েছে দেশীয় মুদ্রায় অর্থাৎ ভারতের টাকা ও রাশিয়ার রুবেলে মাধ্যমে। অর্থাৎ ডলারকে পাশ কাটিয়ে দেশীয় মুদ্রায় লেনদেনের ক্ষেত্রে জোয়ার এনেছে দুই দেশ। যা আমেরিকার ডলার অস্ত্রকে কড়া জবাব বলেই মনে করা হচ্ছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল স্নায়ুযুদ্ধের সময়। তখন সদ্য স্বাধীন দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জোটনিরপক্ষ’ ছিল। নতুন রাষ্ট্র হিসেবে পথচলার শুরুতে শিল্প ও অর্থনীতিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের অনেক সাহায্য পেয়েছিল। অবশ্য ভারতের মস্কোর দিকে ঝুঁকে পড়ার শুরু ১৯৭০-এর দশকে। তার কারণ, তখন ভারতের প্রধান প্রতিপক্ষ পাকিস্তানকে সামরিক ও আর্থিক সাহায্য বাড়াচ্ছিল আমেরিকা। পালটা রাশিয়াও ভারতকে অস্ত্র সরবরাহ করতে শুরু করে এবং মস্কো ভারতের কাছে একটি নির্ভরযোগ্য বন্ধুরাষ্ট্র হয়ে ওঠে। রাশিয়ার এই ভূমিকাকে এখনও গভীরভাবে মূল্যায়ন করে ভারত। তা টের পাওয়া গিয়েছে পুতিনের সদ্য ভারত সফরে। পুতিনের জন্য লালগালিচা বিছিয়ে নয়াদিল্লি পশ্চিমি দুনিয়া ও চীন— দুই পক্ষকেই একটাই বার্তা দিয়েছে, ভারত ‘নিসঙ্গ’ নয়। বেজিং ও ওয়াশিংটনকে বুঝিয়ে দিয়েছে, দিল্লির হাতেও তৃতীয় বিকল্প আছে। ভারত মনে করে, আমেরিকার সঙ্গে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাণিজ্য চুক্তি থাকা আর রাশিয়ার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার মতো সম্পর্ক রাখা কখনওই স্ববিরোধী নয়। ক্রেমলিনের সঙ্গে বোঝাপড়া এই আত্মবিশ্বাসকে শক্তিশালী করেছে। ভারতের এখন বড়ো চ্যালেঞ্জ, কৌশলগত ভারসাম্য—ওয়াশিংটনের চাপ সামলানো ও মস্কোর উপর নির্ভরতার মধ্যে নিজস্ব স্বাধীনতা বজায় রাখা।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ