সাধারণ মানুষ ভালো থাকে জিনিসপত্রের দাম কম থাকলে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধ্যের মধ্যে থাকলে একটি সাধারণ পরিবার প্রয়োজন মতো জিনিস কিনতে পারে। তাদের খাওয়া, পরার কষ্ট হয় না। তারা ছেলেমেয়েদের পড়াতে পারে। স্বাস্থ্য পরিষেবা, বিনোদনের জন্য খরচ করার সুযোগ পায়। এমনকী, সাহস পায় কিছু অর্থ সঞ্চয় করতেও। অন্যদিকে, জিনিসপত্র অগ্নিমূল্য হলে এসবই নস্যাৎ হতে থাকে। সাধারণ মানুষের দুর্দশার শেষ থাকে না। দরিদ্র এবং দারিদ্র্যসীমার নীচের পরিবারগুলির কী ভয়াবহ অবস্থা হয়, তা সকলেই জানেন। শুধু পর্যাপ্ত উৎপাদনই জিনিসপত্রের দাম যুক্তিগ্রাহ্য রাখার নিশ্চয়তা দেয় না। পণ্যমূল্য অনেকাংশেই ওঠানামা করে খনিজ তেলের দামের উপর। কারণ পরিবহণ এবং উৎপাদন ক্ষেত্র তেলের উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু সব জেনেও সরকার দেশবাসীকে যুক্তিগ্রাহ্য দামে পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিন, রান্নার গ্যাস বেচতে রাজি নয়। পেট্রল-ডিজেলের দাম কীভাবে স্থির হয়? আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দামের অনুপাতেই পেট্রপণ্যের মূল্য স্থির হয়। ২০১৪ সালের অক্টোবর থেকে পেট্রপণ্য সম্পূর্ণ ‘ডিরেগুলেটড’ হয়ে গেলেও এই রীতি মোদি সরকারকে অনুসরণ করতে দেখা যায় না। আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হলে তৎক্ষণাৎ দেশে দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। অথচ উল্টোটা হলে তার সুফল আম জনতাকে দেওয়া হয় না। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম তলানিতে নামলেও দেশবাসীকে চড়া দামেই পেট্রল, ডিজেল, কেরোসিন প্রভৃতি কিনতে হয়। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় রাশিয়া আন্তর্জাতিক প্রতিরোধের মুখে পড়ে সস্তায় তেল বেচতে বাধ্য হয়। ভারত ওই তেল কিনেছে এবং মজুত করেছে রেকর্ড পরিমাণে। কিন্তু মোদি সরকার সাধারণ ক্রেতাকে তার কোনও সুবিধাই দেয়নি। পেট্রল, ডিজেলের খুচরো দাম দীর্ঘদিন একই জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল। সস্তায় তেল কিনে চড়া দামে দেশবাসীকে বেচে, তেল উৎপাদন সংস্থাগুলি মারফত বিপুল মুনাফা ঘরে তুলেছে মোদি সরকার। গত এগারো বছরে এই মুনাফার মোট পরিমাণ প্রায় ৪০ লক্ষ কোটি টাকা! ভেবে দেখুন, অঙ্কটি ভারতের একটি অর্থবর্ষের পূর্ণাঙ্গ বাজেট বরাদ্দের সমান প্রায়।
এই হিসেব সামনে এনেই শনিবার মোদি সরকারকে ‘ট্যাক্স-লুটেরা’ আখ্যা দিয়েছে দেশের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। তাদের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম এখন তলানিতে। কিন্তু ভারতের সরকারি তেল উৎপাদন সংস্থাগুলি পেট্রলে লিটার প্রতি অতিরিক্ত মুনাফা লুটছে অন্তত ১৫ টাকা! অঙ্কটা ডিজেলের ক্ষেত্রে ৬ টাকা। কংগ্রেসের দাবি, পেট্রপণ্যের দাম এখনই লিটার প্রতি চার-পাঁচ টাকা হারে কমানো সম্ভব। পেট্রল-ডিজেল নিয়ন্ত্রণহীন হলেও সরকারি সংস্থার পুরো নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রেরই হাতে। তবু তেল অগ্নিমূল্য রয়ে যাওয়ার একটাই অর্থ, মোদি সরকার তা কমাতে রাজি নয়। এই সরকার জনগণকে নানাভাবে আরও লুটে নেওয়ারই পক্ষে। রাহুল গান্ধীর দল রীতিমতো পরিসংখ্যানসহ দাবি করেছে, ২০১৪ সাল থেকে এভাবেই জনতাকে পেট্রপণ্যের দামে উপযুক্ত সুরাহা দেয়নি মোদি সরকার। বরং পেট্রপণ্যের উপর বলবৎ শুল্ক আদায় বাবদ তারা মুনাফা লুটেছে ৩৯.৫৪ লক্ষ কোটি টাকা। একইভাবে তেল সংস্থাগুলিও চড়েছে লাভের পাহাড়ে। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তারা সস্তায় অশোধিত তেল কিনেছে। অথচ আম জনতার কাছে তা বেচা হচ্ছে অন্যায় বেশি দামে। পেট্রল এবং ডিজেলের উপর কেন্দ্র, রাজ্য উভয় সরকারই শুল্ক চাপায়। কেন্দ্রীয় সরকারের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎসগুলির একটি হল এই এক্সাইজ ডিউটি। ২০১৪ সালের মে মাসে এক্সাইজ ডিউটির হার ছিল পেট্রলে লিটারে ৯.২০ টাকা এবং ডিজেলে ৩.৪৬ টাকা। ১১ বছর পর পেট্রলের এক্সাইজ ডিউটি হয়েছে লিটারে প্রায় ২০ টাকা! অন্যদিকে, সেটি ১৫.৮০ টাকা ডিজেলের ক্ষেত্রে। এরই সঙ্গে যুক্ত হবে কৃষি ও পরিকাঠামো সেস। সেই হিসেবে শুল্ক বাবদ প্রতি লিটারে আদায় হয় পেট্রলে প্রায় ২২ টাকা এবং ডিজেলের ১৭.৮০ টাকা।
আরও লক্ষণীয় যে, অস্বাভাবিক মুনাফা কেবল ভারত সরকারই লুটছে না। বেসরকারি সংস্থাগুলিও ৪০ শতাংশ সস্তা দরে তেল কিনছে। সব মিলিয়ে এটাই দাঁড়াচ্ছে যে মুনাফা লুটছে সরকার, কর্পোরেট জুটি বেঁধে। স্বভাবতই লোকসানের ভাগীদার একমাত্র হতভাগ্য আম জনতা! প্রসঙ্গটি এই প্রথম সামনে এল, এমন নয়। চালাকিটা যে দেশবাসী আগেই ধরে ফেলেছে, সেটা মোদি সরকারের গোচরে আনা হয়েছে একাধিক বার। সরকারের উচিত, দেশবাসীকে সুরাহা দেওয়ার জন্য দ্রুত পদক্ষেপ করা। পরিবহণ ব্যয় কমানো, মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস, উৎপাদনে গতিসঞ্চার, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি প্রভৃতি লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এই পদক্ষেপ জরুরি। সরকার এখনও গররাজি হলে গড়ে উঠুক সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ।