শান্তনু দত্তগুপ্ত: হরিপুরের লোয়ার প্রাইমারি স্কুলের যোগেন পণ্ডিতকে চিনেছিলাম সেই ছেলেবেলায়। প্রচণ্ড রাশভারী, খালি পায়ে এক ক্রোশ হেঁটে স্কুলে আসেন, ঘণ্টা দুয়েক ঘুমান, আর তারপর বটগাছের ডাল ভেঙে পড়া ধরতে বসেন। প্রতিদিনই পড়ানো শেষ করতে করতে ডালটা ফুটিফাটা হয়ে যায়। শুধু পড়ুয়া নয়, তাদের বাবা-মায়েদের কাছেও যোগেন পণ্ডিত ত্রাস। কোনও ছাত্র পড়া না করলে তার উপর উত্তম-মধ্যম তো পড়েই, বাড়ি গিয়ে বাবা-মাকেও ধমকে আসেন। আবার কোনও ছেলেমেয়ের অসুখ হলে নিজে গিয়ে সেবাও করেন। তাঁর স্কুলের কেউ ফেল করে না। বেশিরভাগই স্কলারশিপ পেয়ে পড়তে যায়। আর প্রত্যেকেই যাকে বলে ওয়েল ডিসিপ্লিনড।
চাকরিহারা আন্দোলনরত শিক্ষকদের হাইকোর্ট যখন বলল, ‘শিক্ষকদের মতো আচরণ করুন...’, একটাই প্রশ্ন তখন মাথায় এসেছিল—প্রকৃত শিক্ষকের আচরণ ঠিক কেমন হয়? আসলে শিক্ষক বললেই আমাদের মাথার মধ্যে দিয়ে কতকগুলো স্লাইড চলে যায়। ছোটবেলায় যাঁদের হাতে গড়েপিটে বড় হয়েছি, তাঁদের মুখ। আর একটা আদর্শবাদী দোহারা চেহারা। ধুতি-পাঞ্জাবি, পায়ে চপ্পল, বগলে ধরা বই, কাঁধে ঝুলে থাকা একটা কাপড়ের ব্যাগ। বই থেকে ব্যাগ— প্রত্যেকেই যেন তাঁর আদর্শ এবং ডিসিপ্লিনের ভয়ে তটস্থ হয়ে রয়েছে। এখনও শিক্ষকদের ভয়ে তটস্থ হওয়ার ঘটনা ঘটছে... তবে তা সাধারণ মানুষের। কখন তাঁরা ধর্নায় বসে পথঘাট বন্ধ করে দেবেন, সেটাই আতঙ্ক। কখনও বিকাশ ভবনের সামনে, কখনও আবার পর্ষদের অফিস। আম জনতা আগেভাগে ভাবতে শুরু করছে, আর কোন কোন সম্ভাব্য জায়গা অবরোধের জন্য বাকি থাকতে পারে! আগাম বুঝে নিতে হবে। নাহলে হঠাৎ গিয়ে হয়তো দেখা যাবে, রাস্তা বন্ধ। তখন বাস থেকে নেমে হাঁটা, অথবা অটো রিকশয় ঘুরপথে। ১২ টাকার ভাড়া তখন সেই অটোওয়ালাই ২০ টাকা হাঁকবে। রিকশ বা টোটোওয়ালা বলবে, ‘ঘুরে যেতে হচ্ছে দাদা। ১০টা টাকা বেশি দিয়ে দেবেন।’ সারাদিন ঘুরে, সেলসের কাজ করে যে ছেলেটি মাসে হাজার ছয়েক টাকা রোজগার করে, তার কিন্তু ট্রাভেল অ্যালাওয়েন্স বাড়বে না! ওইটা তার গচ্চার খাতায়। হয়তো তাকে বাবার ওষুধ কাটছাঁট করতে হবে, কিংবা নিজের টিফিনের খরচ। কারণ, শিক্ষকরা ধর্নায় বসেছেন। সুপ্রিম কোর্ট তাঁদের চাকরি খেয়েছে। তবু তাঁরা রাজ্য সরকারি দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ করছেন। রাজ্য সরকার ‘যোগ্য’দের ভাতা দিচ্ছে, তবু তাঁরা সরকারি কর্মীদেরই ঘেরাও করছেন। শিক্ষা দুর্নীতির দায়ে এ রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী জেল খাটছেন, তারপরও তাঁরা বিকাশ ভবনের গেট ভাঙছেন, পুলিসের উর্দিও ছিঁড়ে দিচ্ছেন। এই ছবি আমরা লাইভ দেখছি। ও হ্যাঁ, আমাদের সন্তানরাও দেখছে। ভাবছে, শিক্ষকরা বোধহয় এরকমই হয়ে থাকেন। এটাই হয়তো শিক্ষকসুলভ আচরণ!
কোনও সন্দেহ নেই যে, শিক্ষাক্ষেত্রে নিয়োগে কেন, কোনও অবস্থাতেই দুর্নীতি মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু শিক্ষকদের এই আচরণও তো কাঙ্ক্ষিত ছিল না! টিভির সামনে বসে থাকা বহু ছাত্রছাত্রীকে তো আপনারাই পড়িয়েছেন। তারা ছবিটা দেখেই চেঁচিয়ে উঠে বাড়ির লোককে ডেকেছে, ‘ওই দেখো, আমার স্কুলের স্যার।’ সেটা কি আপনাদের জন্যও খুব সম্মানের? নাকি হাইকোর্ট যখন বলছে, ‘প্রকৃত শিক্ষকের মতো আচরণ করুন’... সেটা খুব স্বস্তির? দুটোর একটাও না। হাইকোর্ট কিন্তু পুলিসকে নির্দেশ দিয়েছে, আন্দোলনরত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কোনও কঠোর পদক্ষেপ করা যাবে না। কেন দিয়েছে ভেবে দেখেছেন? কারণ, নির্দেশ ঘোষণার সময় সেই বিচারপতির চোখেও ভাসে ফ্ল্যাশব্যাক। তিনিও তো কারও ছাত্র! শিক্ষকদের হেনস্তা তিনি তো বটেই, সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন কেউই সহ্য করবেন না। কিন্তু যে পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গিয়েছে, তাকে খণ্ডন করার উপায় কারও কাছে নেই! চাকরিহারা শিক্ষকদের কাছে নেই। রাজ্য সরকারের কাছে নেই। সাধারণ মানুষের কাছেও নেই। তাহলে উপায় কী?
এক্ষেত্রে তিনটি পথ তিনদিকে চলে গিয়েছে। একটি চাকরিহারা শিক্ষকদের, একটি রাজ্য সরকারের, আর একটি সুপ্রিম কোর্টের। তিনটি পথ আলাদা কেন? কারণ, তিন পক্ষ তিন রকমভাবে এই সমস্যার সমাধানসূত্র ভাবছে। প্রথমত সুপ্রিম কোর্ট। ৩ এপ্রিল রায়দানের সময় শীর্ষ আদালত পুরো প্যানেলটাই বাতিল করেছিল। কারণ, রাজ্যের বিপক্ষ আইনজীবী (বাম) সুপ্রিম কোর্টে কার্যত প্রমাণ করে দিতে পেরেছিলেন, গোটা প্যানেলে গলদ রয়েছে। কাজেই অযোগ্য বলে চিহ্নিত ছাড়া বাকিদের উপরও কলঙ্কের দাগ লেপে দেওয়া হয়ে গিয়েছিল সেই মুহূর্তে। সেদিন এবং তারপর ছাত্রছাত্রীদের অসুবিধার কথা মাথায় রেখে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত সমাধানসূত্র ছিল— ১) চাকরি সবারই বাতিল হবে। কিন্তু ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যাঁরা অযোগ্য বলে চিহ্নিত নন, তাঁরা কাজ করতে পারবেন। বেতনও পাবেন। ২) ৩১ মে’র মধ্যে নতুন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে রাজ্যকে। ৩) ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নিয়োগ সম্পূর্ণ করতে হবে। অর্থাৎ, এই ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্ট যে কোনওভাবেই মানবিকতার অঙ্কে রায় পুনর্বিবেচনা করবে না, সেটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। আন্দোলনকারীরাও দিল্লি গিয়ে দরবার করছে না, বা বলছে না যে, নিট দুর্নীতির ক্ষেত্রে যদি ঢাকিসুদ্ধ বিসর্জন না হয়ে থাকে, তাহলে এক্ষেত্রে একইরকম রায় হল না কেন? মানবিকতার যে ছায়া ওই মামলায় দেখা গিয়েছিল, এসএসসি’র ক্ষেত্রে তা উধাও হয়ে গেল কীভাবে? আন্দোলনকারীদের দাবি হল, নিয়োগে দুর্নীতি হয়েছে মানে রাজ্য সরকারকেই দায় নিতে হবে। সবার জন্য পাকা ব্যবস্থা করতে হবে। নতুন পরীক্ষা তাঁরা দেবেন না। কারণ, বহু বছর পরীক্ষা সংক্রান্ত চর্চায় এই শিক্ষক-শিক্ষিকারা নেই। সবার সঙ্গে পরীক্ষা দিতে বসলে সদ্য পাশ করে বেরনো ছেলেমেয়েদের কাছে তাঁরা হেরে যাবেন। তাই অন্য কোনওভাবে তাঁদের জন্য ব্যবস্থা করে দিতে হবে রাজ্য সরকারকে। সেই ব্যবস্থায় সুপ্রিম কোর্টের রায়ের অবমাননা হবে না তো? এমন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় অবশ্য আন্দোলনকারীদের নেই। প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, এটাও কি শিক্ষকসুলভ আচরণ?
এবার আসা যাক রাজ্য সরকারে। নিয়োগের ক্ষেত্রে যে দুর্নীতি হয়েছিল, তা রাজ্য মেনে নিয়েছে। তদন্তে সহযোগিতা করেছে। উপরন্তু চাকরিহারাদের মধ্যে অনেক ‘যোগ্য’ প্রার্থী এই জাঁতাকলে পড়ে যাওয়ায় তাঁদের জন্য রিভিউ পিটিশনও দিয়েছে। বাকি ছিলেন শিক্ষাকর্মীরা। সুপ্রিম কোর্ট তাঁদের ‘ব্র্যাকেটে’র মধ্যে রাখার যোগ্য বলে মনে না করলেও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মানবিকতার খাতিরে সহমর্মিতা দেখিয়েছেন। চাকরিহারা শিক্ষকদের পাশাপাশি শিক্ষাকর্মীদের জন্যও ভাতার ব্যবস্থা করেছে রাজ্য। অনেকে বলছে, এটা রাজ্য সরকারের প্রায়শ্চিত্ত। নিয়োগে দুর্নীতি হয়েছিল বলেই এখন এই প্রলেপ দিতে হচ্ছে। তার বিরোধিতা রাজ্যও করছে না। বরং চেষ্টা করছে, এর একটা স্থায়ী সমাধানসূত্রে পৌঁছতে। কী সেই সূত্র? নতুন নিয়োগের পাশাপাশি চাকরিহারাদের একটা গতি করে দেওয়ার। এই ভাবনায় কি বাধা নেই? সেও আছে। কারণ, ৩১ মে’র মধ্যে নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারি করে দিলে, ওবিসি সংক্রান্ত মামলার কী হবে? তার জন্য তো সব নিয়োগই ঝুলে রয়েছে। ফলে বিজ্ঞপ্তি জারি করতে গেলে এর একটা ফাঁক খুঁজে বের করতে হবে। অন্য সমস্যা হল, সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে চাকরিহারাদের বাড়তি সুবিধা পরীক্ষায় দেওয়া যাবে না। তাহলে রাজ্য কী করতে পারে? প্যানেলের মেয়াদ এক বছরের বদলে দেড় বছর করা, কিংবা বয়সের ঊর্ধ্বসীমা বাড়িয়ে দেওয়া... এর বেশি খুব একটা কিছু করার সুযোগ রাজ্যের কাছেও নেই। চাকরিহারাদের যদি আলাদাভাবে নিয়োগের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়, তখন কিন্তু এই আন্দোলনকারীদের তথাকথিত ‘সহমর্মী’রাই মামলা করে সেই চাকরিতে ঢ্যাঁরা মেরে দেবেন। তখন কী হবে? তখন কোন শিক্ষকসুলভ আচরণ এই আন্দোলনের গর্ভগৃহ থেকে উঠে আসবে?
কাজেই একটা বিষয় স্পষ্ট— রাস্তায় বসে আন্দোলন করলে সুপ্রিম কোর্টের রায় বদলাবে না এবং রাজ্য সরকারও কিছু করতে পারবে না। শীর্ষ আদালতই রাজ্য সরকারের হাত বেঁধে দিয়েছে। আর গত কয়েকটা আবেদনের গতিপ্রকৃতি জানান দিচ্ছে, রিভিউ পিটিশনেও কিছু হবে না। সর্বোচ্চ আদালত ৩ এপ্রিলের মূল রায় বদলাবে না। এটা বুঝতে হবে চাকরিহারাদেরও। তির একবার ধনুক থেকে বেরিয়ে গেলে তা ফেরত আসে না। দুর্নীতি, ফাঁকা ওএমআর, নিয়োগ এবং চাকরি বাতিল... এই সবটাই বেরিয়ে যাওয়া তিরের মতো। সময়ের চাকা ঘুরেছে। তাকে আর উল্টোদিকে চালানো যাবে না। আলোচনাই একমাত্র উপায়। রাজ্যের সঙ্গে। উপায় যদি বেরয়, সেখানেই বেরবে। রাস্তার উপর শতরঞ্চি বা চেয়ার পেতে নয়। ওভাবে পিকনিক হয়, ভবিষ্যৎ তৈরি হয় না। আম জনতা প্রতিনিয়ত যদি আন্দোলনের জন্য পথ-যন্ত্রণায় পড়তে থাকে, তাহলে চাকরিহারাদের উপর থেকে সমবেদনাটুকুও উধাও হয়ে যাবে। সত্যি যদি পথে দাঁড়িয়ে আন্দোলনের প্রয়োজন হয়, তখন পাশে আর আম বাঙালিকে পাওয়া যাবে না। এই আম বাঙালি মানে কিন্তু ফেসবুকে ঝড় তোলা বিপ্লবী নয়! তাঁদের ওই সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেই দেখা যায়। সেখানে সংখ্যাটা ১০০ হলে প্রকৃত মঞ্চে দশেও পৌঁছয় না। আম জনতা হল সেই সেলসের ছেলেটি, আন্দোলনের জন্য ১৫ দিনে যার অন্তত ৫০০ টাকা বেশি খরচ হয়েছে। আম জনতা সেই অভিভাবক... দিনমজুরের কাজ করেও যে তার ছেলেকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর জন্য স্কুলে পাঠাচ্ছে। সে দেখছে, তার ছেলের স্কুলের শিক্ষক বিকাশ ভবনের সামনে টিভি ক্যামেরায়। ক্লাস? বন্ধ। আম জনতা বিকাশ ভবনে কাজে যাওয়া সেই থার্ড পার্টি কন্ট্রাকচুয়াল কর্মীও... যে এখনও সরকারি পে-রোলে ঢোকার মতো কন্ট্রাক্টে আসেনি, সামান্য কয়েকটা টাকা বেতন পায়, বছর বছর ইনক্রিমেন্ট হয় না এবং আন্দোলনের জন্য রাত ১০টা পর্যন্ত আটকে থাকে অফিসেই। বেহালার বাড়িতে তার জন্য হয়তো অপেক্ষা করে বছর আষ্টেকের মেয়েটা। মা বাড়ি এলে রান্না হবে, তারপর তার খাওয়া জুটবে। আম জনতার আচরণ যেমন মেনে নেওয়া... তেমনই জল গলার উপর উঠে গেলে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটানোও। শিক্ষকসুলভ আচরণ তাঁরাও আশা করেন। বনফুলের লেখনীতে জন্ম নেওয়া যোগেন পণ্ডিতকে দেখার কথা ভাবেন না তাঁরা। সামান্য বেতনেও ছাত্রছাত্রীদের বই কিনে উপহার দিতেন যোগেন পণ্ডিত। প্রাক্তন ছাত্র স্কুল ইনসপেক্টর হয়ে এলে গর্বে ক্লাস ছুটি দিয়ে দিতেন। আবার তাঁর রাশভারী-কঠোর আচরণের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা পড়েছে শুনলে এক কথায় চাকরি ছেড়েও দিতেন। আজকের দিনে ওই ইনভলভমেন্ট, আদর্শ হয়তো ব্যাকডেটেড। এখন মনে হবে, ওটাই হয়তো প্রকৃত শিক্ষকসুলভ আচরণ ছিল না! যোগেন পণ্ডিতের কাছে সম্মানটাই শেষ কথা ছিল। কয়েকটা টাকা মাইনের চাকরি নয়। এসব আজ চলে নাকি? ও হ্যাঁ, ওই যে স্কুল ইনস্পেক্টর ভূতনাথ ভৌমিক... কিন্তু অদ্ভুত এক আচরণ করেছিলেন। তাঁর ছেলেবেলার মাস্টারমশাইকে বলেছিলেন, আপনি চাকরি ছেড়ে কোথায় যাবেন? আমার বাড়ি চলুন। আমার ছেলেদুটোর দায়িত্ব নিন। আমি নিশ্চিন্ত হব।
প্রকৃত ছাত্রের আচরণ। যোগেন পণ্ডিতের মতো শিক্ষকের হাতে পড়েই না ভূতনাথদের জন্ম...!