Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দাম কমাতে করছাড় জরুরি

রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষ আসনে নরেন্দ্র মোদির উদয় স্বাধীন ভারতে অন্যতম সেরা চমক। আর মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বেশি ভরসা রেখেছেন চমকের উপরেই।

দাম কমাতে করছাড় জরুরি
  • ৩১ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষ আসনে নরেন্দ্র মোদির উদয় স্বাধীন ভারতে অন্যতম সেরা চমক। আর মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে সবচেয়ে বেশি ভরসা রেখেছেন চমকের উপরেই। যখন শাসক দল বিপাকে পড়ে, সরকার সম্পর্কে জনমানসে বিতৃষ্ণা মারাত্মক আকার নেয়, তখনই মোদি একটা ‘ধামকা’ ঘটিয়ে ফেলেন। নোটবন্দি, থালা-ঘটি বাজানো, এয়ারস্ট্রাইক, সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল, অপারেশন সিন্দুর আরও কত কী! এছাড়া বছরে ২ কোটি চাকরি এবং সবার অ্যাকাউন্টে ১৫ হাজার টাকা জমার প্রতিশ্রুতি তো দশকজুড়ে ‘ভাইরাল’! গেরুয়া শিবির বিপাকে পড়লে ভোটে কামাল করার জন্য চালু আছে ‘মোদি হ্যায় তো মুমকিন হ্যায়’ বোলচাল। তাঁকে ‘বিশ্বগুরু’ হিসেবে তুলে ধরার রসিকতাও চালু আছে গেরুয়া শিবিরে। তবে রাজনীতির রকমারি ধ্যাষ্টামি রামা কৈবর্ত, গফুর মিঁয়াদের গায়ে না মাখলেও চলে। যেটা তাদের না ভাবলে একেবারেই চলে না তা হল খেটে খাওয়ার ব্যবস্থা। সেখানেই তো কোপ মেরে চলেছে সরকার নিপুণভাবে। তাদের নাটকের বলি হচ্ছে আম জনতা। ছোটখাট ব্যবসাপত্তর এবং চাকরিবাকরির দফারফা হয়ে গিয়েছে। কৃষকের যন্ত্রণা বেড়েছে বই কমেনি। শুধু জুটেছে গালভরা ‘অন্নদাতা’ তকমা, সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পীড়ন। ২০২২ সালের ভিতরে কৃষকের আয় দ্বিগুণ হওয়ার প্রতিশ্রুতি বাকি প্রতিশ্রুতিগুলির মতোই হাস্যকর দেখাচ্ছে এখন। যাঁরা অর্থনীতির চর্চা করেন, তাঁরা বলছেন অকৃষি ক্ষেত্রেও শ্রমিকের প্রকৃত আয়বৃদ্ধির নামগন্ধ নেই, ছ’বছর যাবৎ তা থমকে রয়েছে। 

Advertisement

মানুষের ভালো থাকা সম্ভব দু’ভাবে—আয় বাড়িয়ে এবং খরচ কমিয়ে। আয়ের সঙ্গে যেন জম্মের আড়ি ভারতবাসীর! অন্যদিকে, খরচ কমাবারও উপায়ও অধরা। তার জন্য জিনিসের দাম কমা দরকার। জিনিসের দাম কমে না, উল্টে বেড়েই চলে। এক্ষেত্রে খরচ কমাবার অন্য যে বিকল্পটি আমাদের হাতে আছে সাধারণ মানুষ সেটাই বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে—ভোগব্যয় কমাচ্ছে। কীভাবে? প্রয়োজনীয় জিনিসও তুলনায় কম কিনছে। পাঁচশো গ্রাম মাছ/মাংসের বদলে দু’শো-তিনশো গ্রাম কিনছে বহু পরিবার। মাথাপিছু একটি ডিম খাওয়ার বদলে একটি ডিম দু’জনে মিলে ভাগ করে খাওয়া হচ্ছে। হয়তো একবেলার টিফিন ‘মায়া’ হয়ে যাচ্ছে কারও কারও ক্ষেত্রে। এসি’র বদলে নন-এসি বাস চড়ছেন কিছু লোক। বাদ রাখছেন ট্যাক্সি/ক্যাব চড়া। সব মিলিয়ে মানুষের কষ্ট ও দুর্ভোগ বাড়ছে। তার বিরূপ প্রভাব পড়ছে বাজারের উপর। সাধারণ চাকরিজীবী এবং ছোট ব্যবসায়ী বা পেশাজীবীরা খরচ কমানোয় শ্রমিক শ্রেণির আয় কমছে নির্ঘাত। 
সংসারনির্বাহ যখন এতটাই কঠিন ঠিক তখনই বিপদ বাড়াচ্ছে জিনিসের দামবৃদ্ধি। বস্তুত মাছ, মাংস, সব্জির পাশাপাশি তেল-মশলাও হয়ে উঠেছে অগ্নিমূল্য। শুধু টের পাচ্ছে না সরকার। মোদি সরকারের দাবি, খাদ্যদ্রব্যের দামে অনেকটাই লাগাম পরানো গিয়েছে। কিন্তু আমাদের রোজকার অভিজ্ঞতা কি একেবারে উল্টো নয়? বাঙালির প্রিয় সর্ষের তেলের দাম তো রকেট গতিতে ঊর্ধ্বমুখী! বাজারে সর্ষের তেলের খুচরো দাম কেজি প্রতি কোথাও ২০০ টাকা, কোথাও আবার ২১০ টাকা। কেন্দ্রের তথ্যই বলছে, পশ্চিমবঙ্গে একবছরে তেলের দাম বেড়েছে কেজিতে ৫০ টাকার বেশি। প্যাকেট বা শিশি বন্দি সর্ষের তেল সামান্য সস্তা। কিন্তু সাধারণ মানুষকে সেই দর স্বস্তি দিতে পারছে না। বাজার বিশেষজ্ঞদের দাবি, এবার সর্ষের উৎপাদন কমার কারণে এটা হতে পারে। এদেশে বেশিরভাগ ‘সাদা’ তেল বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব তেলের দামবৃদ্ধির প্রভাব পড়ে এদেশেও। সাদা তেলের দর বেড়ে গেলে বাজারের চাহিদা ও জোগানের নিজস্ব নিয়মে সর্ষের তেলও মহার্ঘ হয়। সামগ্রিক পরিস্থিতির জন্য অনেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধিকেই দায়ী করছেন। কিন্তু একবছর যাবৎ রান্নার তেলের লাগাতার দামবৃদ্ধি দেখেও সরকার ঘুমোচ্ছে কেন? পর্যাপ্ত করছাড় না দিলে তেলের দামে লাগাম পড়বে না। দিল্লির তরফে সেই তৎপরতা কোথায়? মোদি সরকারকে অনেক বেশি বাস্তববাদী হতে হবে। ছাড়তে হবে চমক আর চালাকির রাজনীতি। সাধারণ মানুষকে বাঁচতে দিয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে হলে গালভরা বুলি আওড়ানো ছাড়তে হবে। ‘সব কা সাথ সবকা বিকাশ’ স্লোগানেই হতে হবে আন্তরিক।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ