নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: হাসপাতালের আইসিইউ থেকে হেলতে দুলতে বেরিয়ে আসছে সে। জামার কলার তোলা। হাতে পিস্তল। মুখ ঢাকার চেষ্টাও নেই। সিসি ক্যামেরার ওই ফুটেজ পুলিসকে দেখিয়ে দিয়েছে শ্যুটার তৌসিফ ওরফে বাদশাকে। পুলিস বুঝে গিয়েছিল, গোটা অপারেশন লিড করেছে ওই। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠও ছিল। কারণ, ওই ফুটেজ ভাইরাল। গোটা দেশে। ফলে চোখে পড়েছে তৌসিফেরও। তখনই প্ল্যান ছকে ফেলে সে। পালাতে হবে। কোথায়? আপাতত পড়শি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে। কয়েকটা কানেকশন আছে সেখানে। ‘শেল্টারে’র ব্যবস্থা অন্তত হয়ে যাবে। তারপর ‘লুক’ বদলে ফেললেই হবে। মানে চুল-দাড়ি কেটে একটু সাফসুতরো হয়ে নেওয়া। তাহলে আর কে চিনছে? গা-ঢাকা দেওয়ার জন্য চেহারায় বদল আনার থেকে ভালো কিছু হয় না। কিন্তু এই নতুন ‘লুক’ই যে তাকে ধরিয়ে দেবে, বুঝতে পারেনি তৌসিফ। আতিপাতি সেলুনে যাওয়ার ঝুঁকি সে নেয়নি। বরং ভেবেছিল, অ্যাপের মাধ্যমে গেস্ট হাউসেই ডেকে নেবে লোক। সে এসে চেহারা ‘সাফ’ করে দিয়ে যাবে। কাল হল সেটাই। তৌসিফের সবকটি সিমের তথ্য সাজিয়ে বসেছিল বিহার পুলিস। তার মধ্যে একটি থেকে যখন অ্যাপে ‘সার্ভিস’ বুক হল, তখনই তা স্ক্যানারে এসে গেল তাদের। ট্র্যাক করে পুলিস নিশ্চিত হল ফোনের ‘আইএমইআই’ নম্বর সম্পর্কে। এটাই তো তৌসিফের হ্যান্ডসেট! দ্রুত পশ্চিমবঙ্গ পুলিসের সঙ্গে যোগাযোগ। আর তারপর যৌথ রেইড। আর জালে তৌসিফ। পাটনার হাসপাতালে চন্দন খুনের মাস্টারমাইন্ড। বিহার পুলিস আগে তৌসিফ বলে যাকে আটক দেখিয়েছিল, সে নয়। তাহলে কি মূল চক্রীকে বিভ্রান্ত করার জন্যই ওই টোপ ছিল? সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়নি বিহার পুলিস।
পুরুলিয়ার জেল, শেরু, ১০ লাখের সুপারি, তৌসিফ—পুরো বৃত্তটাই বুঝে গিয়েছিল পুলিস। বাকি ছিল সূত্রগুলো জোড়া লাগা। কলকাতা পুলিসের তদন্তে সেটাও হয়ে চলেছে। বিহার পুলিসের এসটিএফের হাতে ছিল একটি তথ্য—আর একটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ। সেখানে দেখা গিয়েছে, একটি বাইকে উঠছে তৌসিফ। পাওয়া গেল সেটির নম্বর। ব্রেক থ্রু এখানেই। জানা গেল, তৌসিফ গিয়েছে তার মাসতুতো ভাই নিশু খান ওরফে সাদ্দামের কাছে। তদন্তকারীরা হানা দেন সেখানে। পাখি ততক্ষণে পগার পার। পড়শিদের কাছে জানা যায়, নিশুর গাড়িতে চেপেই গয়া রওনা দিয়েছে তারা। জোগাড় হল নিশুর গাড়ির নম্বর। আর তা চলে গেল ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশে। তদন্তকারীরা জানতেন, সীমানার টোল প্লাজাগুলিই তাদের অস্ত্র। অন্য রাজ্যে ঢুকতে গেলে টোলের ক্যামেরায় ধরা পড়বেই। সেটাই হল। বর্ধমানের পালসিটের ক্যামেরায় ধরা পড়ল নিশুর গাড়ি। সঙ্গে মোবাইলের জিপিএস দেখিয়ে দিল, গন্তব্য বাংলা। এবার আসরে নামল কলকাতা ও রাজ্য পুলিস। ট্র্যাকারে গাড়ি দ্বিতীয় হুগলি সেতু, মা ফ্লাইওভার, নিউটাউন, তারপর সাপুরজি। প্রথম অবস্থান পেল পুলিস। ঘণ্টাখানেক পর অবস্থান রিপন স্ট্রিটের একটি হোটেল। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে পৌঁছে গেল লালবাজারের টিম। অপরাধীরা সেখানে নেই। তদন্তকারী অফিসাররা খোঁজ নিয়ে জানলেন, গাদাগাদি করে এখানে থাকতে পারছিল না তৌসিফ। তাই ফোন করে পরিচিত এক ‘কল গার্ল’কে। সেই বিকল্প ব্যবস্থা করে দেয়। কোথায় সেই ব্যবস্থা? আনন্দপুরের গেস্ট হাউস। সেখানে পৌঁছে অ্যাপের মাধ্যমে নাপিত ডাকতেই লোকেশন স্পষ্ট। এরপর অতর্কিতে হানা। আর জালে পাটনা শ্যুটআউটের চার দুষ্কৃতী।
জেরায় তৌসিফ দাবি করেছে, শেরুর থেকে সুপারি পাওয়ার পর নিশুর বাড়িতে বসেই অপারেশনের ব্লু-প্রিন্ট তৈরি করেছে সে। ভাই গোটাটাই জানত। খুনের পর অস্ত্র অন্য টিমের কাছে পাচার করে দেয় সে। সেটিং করাই ছিল। যার বাইকে চেপে সে নিশুর বাড়ি যায়, সে-ই তৌসিফকে জোগান দেয় নগদের। কিন্তু নিশুকে নিয়ে আসার কারণ কী? কারণ সে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। এর আগে একটা অপারেশনে গুলি খাওয়ার পর থেকে। সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল নিশুর জাল মেডিক্যাল সার্টিফিকেট। যাতে পথে পুলিস ধরলে দেখাতে পারে, চিকিৎসার জন্য ভাইকে কলকাতা নিয়ে যাচ্ছে। নিশুর দাবি, ধৃত বাকি দুই ব্যক্তি শচীন ও হরিশ তার অ্যাটেনডেন্ট। যদিও বিহার পুলিস জেনেছে, এই দু’জন আসলে ব্যবসায়ী। এরাই তৌসিফকে ১০ লক্ষ টাকা পৌঁছে দেয়। এমনকী পাটনা হাসপাতালের রেকিও করে এরা। রবিবার ধৃত চারজনকে আদালতে তোলা হয়। অভিযুক্তদের তরফে লিগালেডের আইনজীবী সৈকত রক্ষিত বলেন, "তাদের এখানে রেখেই জেরা করা হোক।" এরপরেই ট্রানজিট রিমান্ডে পাটনা নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন বিচারক।