‘স্পেশাল ইন্টেনসিভ রিভিশন (এসআইআর) আমাদের উপর জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আমাদের ইতিহাস সম্পর্কে তারা কিছুই জানে না। কমিশনের কোনও বাস্তব জ্ঞান নেই। আমাদের ইতিহাস, ভূগোল কিছু না জেনেই তারা এরকম একটি বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সব নথিপত্র একমাসের মধ্যে দেখাতে এবং জমা দিতে হবে! এটা কি ছেলেখেলা হচ্ছে?’ এই চরম ক্ষোভ বাংলার শাসক দলের কোনও নেতার নয়। এই উক্তি জেডিইউ এমপি গিরিধারী যাদবের। বুধবার সংসদ ভবনে হঠাৎই বিস্ফোরক হয়ে ওঠেন বিহারের বাঁকা লোকসভা কেন্দ্রের এমপি। বলা বাহুল্য, নীতীশ কুমারের দল এনডিএ’র একটি গুরুত্বপূর্ণ শরিক। গিরিধারী সেই দলেরই একজন দাপুটে সাংসদ। অবাস্তব এসআইআরের বিরুদ্ধে দেশের মধ্যে সর্বপ্রথম সরব হয়েছিলেন তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো তথা বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্যে এখনও অনড় তিনি। ‘ডাবল ইঞ্জিন’ রাজ্যগুলিতে সরকারি মদতে পরোক্ষে যে ‘বাঙালি খেদাও’ অনাচার চলছে, বাংলার নেত্রী তার বিরুদ্ধে গোড়া থেকেই খড়্গহস্ত। বাংলাভাষীদের রক্ষার জন্য তিনি ‘ভাষা আন্দোলনের’ ডাক দিয়েছেন। ওইসঙ্গে তীব্র আপত্তি ও জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছেন ত্রুটিপূর্ণ এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে। এই দুই ইস্যুতে তাঁর দলের এমপিরা ইতিমধ্যেই একাধিক দিন সংসদের ভিতরে এবং বাইরে ধিক্কার জানান। সাধারণ মানুষকে অকারণে হেনস্তার এই কারবারে অবিলম্বে দাঁড়ি টানার জন্যও হুঁশিয়ার করেছে তৃণমূল কংগ্রেস।
একাধিক বিরোধী দলও এই প্রশ্নে একে একে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। এতদিন নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল বিজেপি এবং তাদের শরিক দলগুলি। দেরিতে হলেও ক্ষোভ যে এনডিএ’র অন্দরেও ধূমায়িত হচ্ছে, জেডিইউ এমপি গিরিধারী যাদবের মন্তব্য থেকে সেটাই পরিষ্কার। বস্তুত বিহারের মানুষের অস্মিতার অপমান নিয়েই সরব তিনি। গিরিধারী বুঝিয়ে দিয়েছেন, এই অপমান এমন এক শক্তির হাতে হচ্ছে যারা কেন্দ্রে সরকার চালাচ্ছে বিহারের ১৬ জন এমপির (১২ জন লোকসভার এবং ৪ জন রাজ্যসভার) ভরসায়। সোজা কথায়, এসআইআর নিয়ে এবার বিদ্রোহ খোদ মোদি সরকারের অন্দরেই। বিরোধীদের সুরেই সরব এবার বিজেপির জোট শরিকদের একাংশ। গিরিধারী যাদব একাই নন, সতর্ক করেছেন অপর এনডিএ শরিক মহারাষ্ট্রের আরপিআই সভাপতি রামদাস আটাওয়ালেও। তিনি বলেছেন, ‘ভোটার তালিকা রিভিশন ইস্যুতে তৃণমূল স্তরে কী চলছে, সেটাও কমিশনকে দেখতে হবে।’ আটাওয়ালে কার্যত বিজেপিকেই মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, বিরোধীরা যাদের হয়ে কথা বলছে, যাদের নাম বাদ যাবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছে, তারা কি শুধু তাদেরই ভোটার? তারা তো এনডিএ’কেও ভোট দেয়! উল্লেখ্য, আরপিআই মহারাষ্ট্রের অনগ্রসর শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। আর বিরোধীরা জোরদার প্রচার করছে যে, নির্বাচন কমিশনের এই তুঘলকি সিদ্ধান্তে অনগ্রসর শ্রেণিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিজেপি আর কমিশন জোট বেঁধে পিছড়ে বর্গের ভোটাধিকার হরণের চক্রান্তে লিপ্ত। স্বাভাবিকভাবেই এনডিএ শরিক দলগুলিও একে একে উদ্বিগ্ন। তারা ভয় পাচ্ছে যে, এই ইস্যুতে বিজেপি-সঙ্গ, তাদের ভোটব্যাঙ্কেও ধস নামাতে পারে।
সুপ্রিম কোর্ট আগেই প্রস্তাব দিয়েছিল, নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে আধার এবং রেশন কার্ডকে মান্যতা দেওয়া যায় কি না, সেটা কমিশন খতিয়ে দেখুক। কিন্তু কমিশন জানিয়ে দিয়েছে, আধার ও রেশন কার্ড পরিচয়পত্র মাত্র। ভোট দেওয়ার যোগ্যতা অর্জনকারী কোনও নথি নয়, নাগরিকত্বের প্রমাণ তো নয়ই। এই পরিস্থিতিতে গিরিধারী যাদব নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেছেন, ‘আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা খুবই খারাপ। সব নথিপত্র জোগাড় করতে আমারই দশদিন লেগেছে! আমার ছেলে থাকে আমেরিকায়। একমাসের মধ্যে তার পক্ষে স্বাক্ষর করা কীভাবে সম্ভব? অন্ততপক্ষে ছ’মাস সময় দেওয়া উচিত ছিল।’ এটি তাঁর ব্যক্তিগত মতামত জানিয়েও তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের সমস্যার কথা আমাকে বলতেই হবে। সত্যি কথা বলতে না পারলে আমি কীসের এমপি?’ এখন সহজ অনুমান, এসআইআর ইস্যুতে নীতীশের সঙ্গে বিজেপির দূরত্ব তৈরি হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে সেটা তাদের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব মাত্র। সাধারণ মানুষের সমস্যা অন্য এবং অনেক গভীর। সরকার এবং নির্বাচন কমিশনকে বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে সেটা বুঝতে হবে। যাদের ভোটে জিতে সরকার তৈরি করা হল, সেই মানুষগুলিকেই এখন বিপাকে ফেলা হলে সিস্টেমের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। বৃহত্তম গণতন্ত্রের জন্য এ কোনও সুলক্ষণ নয়।