ওবিসি জট অবশেষে কাটল শীর্ষ আদালতে। দূর হল রাজ্যে ছাত্র ভর্তি এবং শিক্ষক নিয়োগের বাধা। এই প্রসঙ্গে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের মন্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ, ‘উই আর সারপ্রাইজড! কীভাবে হাইকোর্ট এই মামলায় স্থগিতাদেশ দিতে পারে? সংরক্ষণ তো এগজিকিউটিভ সিদ্ধান্তের অংশ। ইন্দিরা সাহানি মামলায় ন’জন বিচারপতির রায়েই তা স্পষ্ট করা আছে। হাইকোর্টের নির্দেশ ভুলে ভরা।’ সোমবার পশ্চিমবঙ্গের ওবিসি সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে এমনই মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি বি আর গাভাই স্বয়ং। স্বভাবতই ওবিসি মামলায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে রাজ্যের নৈতিক জয়ই হল বলে ধরে নেওয়া যায়। ওবিসি শংসাপত্রের বিজ্ঞপ্তি সংক্রান্ত মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশের উপর স্থগিতাদেশ দিল সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি বি আর গাভাই, বিচারপতি বিনোদ চন্দ্রন এবং বিচারপতি এন ভি আনজারিয়ার বেঞ্চ। ফলে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে নিয়োগ বা ভর্তির জটিলতা আপাতত কাটল। এতে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে বাংলার শিক্ষামহল। কেননা, ওবিসি সংক্রান্ত আইনি জটিলতায় এতদিন রাজ্য ইঞ্জিনিয়ারিং জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষার ফলই প্রকাশ করা যায়নি। এছাড়া উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশ করার পরেও এখানে ভর্তি শুরু করা যায়নি স্নাতক শ্রেণির কোর্সগুলিতে। উচ্চশিক্ষা দপ্তর কেন্দ্রীয় পোর্টালের মাধ্যমে কলেজে আবেদনের সময়সীমা আজ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। ২১ তারিখ শেষ হয়েছে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক নিয়োগের পরীক্ষার আবেদন। কিন্তু ছাত্রভর্তি থেকে শিক্ষক নিয়োগের সামনে বাধা কী? একটাই উত্তর, ওবিসি সংরক্ষণের জটিলতা। এই আইনি জট কাটলেই শুধুমাত্র শিক্ষাক্ষেত্রেই প্রায় ১০ লক্ষ ছাত্রছাত্রী এবং বহু হবু শিক্ষকের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা দূর হবে।
২০১০ সালের পর ওবিসি হিসেবে যাঁদের নাম নথিভুক্ত করা হয়েছে, তাঁদের শংসাপত্র বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিল কলকাতা হাইকোর্ট। রাজ্যের উচ্চ আদালত জানিয়েছিল, ২০১০ সালের আগে পর্যন্ত যেসব জনগোষ্ঠী ওবিসি ছিল নিয়োগ বা ভর্তির ক্ষেত্রে শুধু তাদেরই সার্টিফিকেট গ্রাহ্য হবে কিন্তু পরবর্তীকালে ইস্যু হওয়া সার্টিফিকেটকে মান্যতা দেওয়া যাবে না। আর এতেই ভয়ানক বিপাকে পড়ে গিয়েছেন শিক্ষার্থী এবং চাকরি প্রার্থীদের একটা বড় অংশ। তার উপর ওবিসি সংক্রান্ত নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হতেই হাইকোর্টে দায়ের হয় আদালত অবমাননার মামলা। তার প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ওই বিজ্ঞপ্তিতে তখনই স্থগিতাদেশ দেয়। উচ্চ আদালতে ওই মামলার শুনানির হওয়ার কথা ৫ আগস্ট। তবে হাইকোর্টের ওই রায়ের উপর তার আগেই সুপ্রিম কোর্ট স্থগিতাদেশ দিল। এদিনের শুনানিতে রাজ্য সরকারের তরফে আইনজীবী ছিলেন কপিল সিবাল এবং কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যে শিক্ষাক্ষেত্রে যে অবাঞ্ছিত জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে তা সবিস্তারে ব্যাখ্যা করেন তাঁরা। কপিল ও কল্যাণ দাবি করেন, ‘রাজ্যের উদ্যোগে কোনও ভুল নেই। ওবিসি সার্টিফিকেটের বিজ্ঞপ্তি মামলায় জটিলতার ফলে বাংলায় ৪০ হাজার শিক্ষক নিয়োগ আটকে আছে। থমকে গিয়েছে যাবতীয় পদোন্নতি। ৯ লক্ষ আসনে ছাত্রভর্তিতেও অবাঞ্ছিত জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।’
যদিও রাজ্যের বক্তব্যের বিরোধিতা করেন পূরবী দাস ও অমলচন্দ্র দাসের আইনজীবী রঞ্জিত কুমার। এই বিষয়ে রাজ্যের পদক্ষেপ এবং অবস্থানের ‘ত্রুটি’ আদালতকে জানান তাঁরা। তাঁদের যুক্তি অবশ্য আদালত এখনও গ্রহণ করেনি। বরং প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘এভাবে হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিতে পারে না। তাই আমরা মামলায় বিবাদীদের নোটিস ইস্যু করছি। আর নতুন বেঞ্চ গঠন করে আগামী ছয় থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে মামলাটির নিষ্পত্তি করার জন্য হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বলব।’ সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার শুনানি হবে দু’সপ্তাহ পর। সেদিনের সওয়াল-জবাবের দিকে সকলের নজর অবশ্যই থাকবে। তবে শীর্ষ আদালতের এদিনের বক্তব্যে বাংলায় নিয়োগ এবং ভর্তির জট কাটল বলেই মনে করা হচ্ছে। রাজ্য সরকার এতে কতটা স্বস্তি পেল তা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুর প্রতিক্রিয়ায় পরিষ্কার। আরও লক্ষণীয়, এগজিকিউটিভ সিদ্ধান্তকে সুপ্রিম স্বীকৃতি এই আইনি লড়াইয়ের এক তাৎপর্যপূর্ণ দিক হিসেবে চিহ্নিত হবে। আশা করা যায়, এবার ভর্তি এবং নিয়োগ দুটিই দ্রুত শেষ হবে। দূর হবে অনগ্রসর শ্রেণির একাংশের বঞ্চনা। অনগ্রসর শ্রেণিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ফের একবার সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পেল। এই জয় গণতন্ত্রের এবং মানবতার।