Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সুপার ফ্লপ

২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর রাতে নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত কেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘ঐতিহাসিক’ ঘোষণা ছিল, সরকার থেকে গেরুয়াবাহিনী তার অনেক তত্ত্বকথা শুনিয়েছিল হতবাক দেশবাসীকে।

সুপার ফ্লপ
  • ১ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর রাতে নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত কেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘ঐতিহাসিক’ ঘোষণা ছিল, সরকার থেকে গেরুয়াবাহিনী তার অনেক তত্ত্বকথা শুনিয়েছিল হতবাক দেশবাসীকে। যেমন, সব কালো টাকা উদ্ধার করা হবে, নগদহীন অর্থব্যবস্থা গড়ে উঠবে, জাল নোটের ব্যবসা ধ্বংস হবে, সন্ত্রাসবাদীদের হাতে অর্থ জোগান বন্ধ হবে, ইত্যাদি। প্রায় দশ বছর পর সেই সিদ্ধান্তের পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, নোট বাতিল প্রকল্প চূড়ান্ত ‘ফ্লপ’। মোদির হঠকারী সিদ্ধান্তের খেসারত আজও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে গোটা দেশকে। সেই কালো টাকা, জাল নোট, নগদের ব্যবহার, দুর্নীতির মতো সব রোগ জাঁকিয়ে বসে আছে ভারতের অর্থনীতিতে। তবু অতীত থেকে কোনও শিক্ষা নিতে নারাজ মোদি সরকার। নোট বাতিলের সময় আচমকা ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল করা হয়েছিল। বাজারে আনা হয়েছিল ২০০০ টাকা ও ৫০০ টাকার নতুন নোট। কয়েক বছরে পরিকল্পনা ফ্লপ করতেই বাজার থেকে ২০০০ টাকার গোলাপি নোট তুলে নেয় কেন্দ্র। এখন সর্বত্র মূলত ৫০০ টাকার রমরমা চলছে। তথ্যের খাতিরে জানিয়ে রাখা যাক, এখন মোট নোট সংখ্যার ৪০.৯ শতাংশই ৫০০ টাকা। মূল্যের দিক থেকে ৫০০ টাকার নোটের শেয়ার ৮৬ শতাংশ। শোনা যাচ্ছে, জাল নোটের কারবার আটকাতে এবার নাকি ৫০০ টাকার নোটও বাতিলের খাতায় চলে যেতে পারে।

Advertisement

জাল নোট। নোট বাতিলের ঘোষণার দিন জাল নোট আটকাবেন বলে রীতিমতো হুঙ্কার দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। সেই হুঙ্কারে সোচ্চারে গলা মিলিয়েছিলেন তাঁর পারিষদবর্গ। অথচ বছর দশেক পর তার পরিণতি হল মোদির সাদা পোশাকে কালি ছিটিয়ে দিয়েছে খোদ রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। তারা জানিয়েছে, মাত্র একবছরে (২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে) দেশের ৫০০ টাকার জাল নোট বেড়েছে রেকর্ড, ৩৭.৩ শতাংশ। এটা বাজেয়াপ্ত হওয়া জাল নোটের পরিসংখ্যান থেকে জেনেছে সর্বোচ্চ ব্যাঙ্ক। এর বাইরেও যে বাজারে কয়েক হাজার কোটি টাকার জাল নোট ‘আসল’ হয়ে রাজত্ব করছে, তা সহজেই অনুমেয়। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তথ্য দেখাচ্ছে, শুধু গত অর্থবর্ষে জাল ৫০০ টাকার নোটের আর্থিক অঙ্ক ৫ লক্ষ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। তার আগের আর্থিক বছরে ছিল ৪ লক্ষ ২৮ হাজার কোটি টাকা। ৫০০ টাকার পাশাপাশি ২০০ টাকার জাল নোট বৃদ্ধি পেয়েছে ১৩.৯ শতাংশ। জালিয়াতি কারবারের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না ১০, ২০, ৫০, ১০০ টাকার নোটও। ধরা যাক, নগদহীন অর্থ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ঘোষণার কথা। এ বিষয়েও সেই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে বাজারে লেনদেন হওয়া নোটের সংখ্যা এবং তার মূল্য তার আগের বছরের তুলনায় বেড়েছে যথাক্রমে ৫.৬ শতাংশ এবং ৬ শতাংশ। তাই এই বেশি পরিমাণ নোট ছাপানোর খরচও ২৫ শতাংশ বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। মোদির ঘোষণার সবচেয়ে সাড়া জাগানো দাবি ছিল, কালো টাকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা। কারণ কালো টাকা সন্ত্রাসবাদীদের তহবিলে ঢুকছে, দুর্নীতির উৎসও কালো টাকা। ঘোষণার দশ মাস পর দেখা গেল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক জানাচ্ছে, বাতিল হওয়া ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোটের প্রায় ৯৯ শতাংশই তাদের কাছে ফেরত এসেছে। প্রশ্ন ওঠে, যেখানে ৯৯ শতাংশ নোটই বদলে ফেলা হয়েছে সেখানে নোট বাতিল কি কালো টাকা সাদা করার প্রকল্প ছিল? ঘটনা হল, আজও কালো টাকা উদ্ধার নিয়ে কোনও তথ্যনিষ্ঠ রিপোর্ট মোদি সরকারের তরফে প্রকাশ্যে আনা হয়নি। ফলে দেশবাসীর পক্ষে প্রকৃত সত্যের নাগাল পাওয়া কঠিন। সব মিলিয়ে চূড়ান্ত ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত।
৫০০ টাকার জাল নোটের বাড়বাড়ন্ত নিয়ে শুধু রিপোর্ট প্রকাশ করেই রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ক্ষান্ত হয়নি, সার্কুলার জারি করে দেশের সব ব্যাঙ্ককে নির্দেশ দিয়েছে এবার থেকে এটিএমগুলিতে আরও বেশি করে ১০০ ও ২০০ টাকার নোট রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে প্রত্যেক ব্যাঙ্ককে অন্তত ৭৫ শতাংশ এটিএম-এ ১০০ ও ২০০ টাকার নোট রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ১০০, ২০০ এবং ১০ টাকার নোট আরও বেশি করে ছাপার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আর সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা হল, সিংহভাগ এটিএম-এ ৫০০ টাকার নোট ছাড়া অন্য নোট পাওয়া যায় না। সেইসঙ্গে বাজারে ১০, ২০, ৫০ টাকার নোটের আকালে জেরবার  হচ্ছে মানুষ। ফলে ছোট অঙ্কের নোংরা, ছেঁড়া কাটা নোট নিতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ১০০, ২০০, ১০ টাকার নোট আরও বেশি করে ছাপানোর সিদ্ধান্তের পিছনে যে জাল নোটের রমরমা আটকানোর বিষয়টি কাজ করছে তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। শঙ্কা কিন্তু কাটছে না। যে হারে জাল নোট বাজারে ছেয়ে আছে তা চিন্তার বিষয়।  ’১৬ সালে ঘটা করে প্রধানমন্ত্রীর নোট বাতিলের ঘোষণায় কাজের কাজ যে কিছুই হয়নি তা স্পষ্ট। পরিকল্পনাটাই হয়েছে সুপার ফ্লপ।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ