সমৃদ্ধ দত্ত: একটি উৎকৃষ্ট মানের সাহিত্য পত্রিকার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন বাঙালি পাঠককুল। ‘বঙ্গদর্শন’ বাড়িতে এলেই শিক্ষিত একান্নবর্তী পরিবারের মধ্যে কার্যত যেন যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত, কে আগে সেটি হস্তগত করে পড়ে ফেলবে। যে গৃহিণীদের অক্ষরজ্ঞান ছিল না, তাঁরাও ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতেন। কলকাতার চিৎপুর রোডের বৃহৎ পরিবারের সেই বালকটির কাজ ছিল, অন্দরমহলের মহিলাদের ‘বিষবৃক্ষ’ পড়ে শোনানো। রামায়ণকথা হোক বা বঙ্কিমবাবুর উপন্যাস...রিনরিনে কণ্ঠে বেশ আবেগ ও তরঙ্গ মিশিয়ে নাটকীয়ভাবে পাঠ করতে পারত বলে তার কদরও ছিল পরিবারে। সেই বালকের নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
কিন্তু এহেন এক প্রবল জনপ্রিয় পত্রিকা কে প্রকাশ করতেন? নিশ্চয়ই এমন কোনও ব্যক্তি, যিনি সাহিত্য ছাড়া আর কিছু করেন না! ভুল। এটি প্রকাশ করতেন এক রাশভারী, গম্ভীর সরকারি আধিকারিক। ১৮৬৯ থেকে ১৮৭৪ সাল পর্যন্ত মুর্শিদাবাদে কর্মরত ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, কালেক্টর পদে কর্মরত বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ১৮৭২ সালে নিজেই সম্পাদক হয়ে প্রথম প্রকাশ করেছিলেন ‘বঙ্গদর্শন’।
আর প্রকাশের পরই সেটি অভাবনীয় জনপ্রিয়তা পায়। কারণ, স্বয়ং সম্পাদক মহাশয়ের লেখা। তিনি যা লিখছেন, সেটাই পাঠকের মনে সাড়া ফেলছে। বঙ্কিমবাবু একটি মুদ্রণযন্ত্র পর্যন্ত ক্রয় করে কাঁঠালপাড়ার বাড়ি থেকেই মুদ্রণের ব্যবস্থা করলেন।
যে কোনও পত্রিকার প্রকাশের সময় মাঝেমধ্যেই নিয়ম হল, হঠাৎ করে কিছু লেখা কম পড়ে যাওয়া। এরকমই একদিন ছাপাখানার পণ্ডিত মহাশয় সম্পাদকের বাড়িতে এসে বললেন, কিছু লেখা তো কম পড়েছে, তাহলে কী করা যায়! তিনি ভালোই জানতেন, এমন সময় উদ্ধারকর্তা সম্পাদক স্বয়ং! কারণ, তিনি কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি উৎকৃষ্ট রচনা লিখে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। বহুবার দিয়েছেনও। তবে এখন তিনি ব্যস্ত। পণ্ডিত দেখলেন এক টুকরো কাগজ রাখা সম্পাদকের টেবিলে। সেখানে কিছু পঙ্ক্তি... পদ্যের মতো দেখতে। গানও হতে পারে। সম্পাদকেরই হাতের লেখা।
পুরোটা পড়লেন। এবং বিস্মিত হয়ে সম্পাদক বঙ্কিমবাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, এটা তো মন্দ নয়! ব্যবহার করাই যেতে পারে!
বঙ্কিমবাবু পণ্ডিত মহাশয়ের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে টেবিলের দেরাজের মধ্যে রেখে দিলেন কাগজটি। তারপর বললেন, এটা ভালো কি মন্দ, এখন তুমি বুঝতে পারবে না। কিছুকাল পরে বুঝবে। আমি তখন জীবিত না থাকতে পারি। তুমি থাকতে পারো।
পণ্ডিত মহাশয় কতদিন বেঁচে ছিলেন জানা নেই। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র সত্যদ্রষ্টা ছিলেন। ওই কাগজে লেখা গানটি পরাধীন ও স্বাধীন—উভয় ভারতেই দেশমাতৃকার এক বন্দনামন্ত্রে পরিণত হয়েছে... ‘বন্দেমাতরম’। ১৮৭৫ সালের এই কাহিনি থেকেই অনুমান, ‘বন্দেমাতরম’ ওই বছরই রচিত।
যদিও বঙ্কিমচন্দ্র রচিত ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে এই গানটি সংযুক্ত হয়েছে অনেক পরে। ১৮৮২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল উপন্যাসটি। প্রথমে ধারাবাহিক, পরে বই যথারীতি প্রবল জনপ্রিয়তা লাভ করে। বিশেষ করে ‘বন্দেমাতরম’ সংগীত। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, এর আগে পর্যন্ত গানটি অশ্রুত ও অপরিচিত ছিল।
বঙ্কিমচন্দ্র এই গান রচনার পরই সুরারোপের দায়িত্ব দিয়েছিলেন যদুনাথ ভট্টাচার্যকে। সাবিত্রী লাইব্রেরিতে সেই গান গাওয়া হয়। তবে জনপ্রিয়তার বাঁধ ভেঙে দেয় ‘আনন্দমঠ’। ৭ বছর আগে লেখা একটি গান হঠাৎ কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হল ওই উপন্যাসে?
‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে মহেন্দ্রকে ভবানন্দ বলেছিলেন, ‘আমার সঙ্গে এসো। তোমার স্ত্রী কন্যার দেখা করিয়ে দেব।’ উন্মুখ ও বিস্মিত মহেন্দ্র ভবানন্দকে অনুসরণ করলেন। সেই যাত্রাপথে ভবানন্দ হঠাৎ একটি গান গেয়ে উঠলেন—
‘বন্দেমাতরম
সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম
শস্যশ্যামলাং মাতরম...’
বঙ্কিম লিখছেন, ‘মহেন্দ্র গীত শুনিয়া কিছু বিস্মিত হইল। কিছু বুঝিতে পারিল না। সুজলা সুফলা মলয়জশীতলা শস্যশ্যামলা মাতা কে, জিজ্ঞাসা করিল, ‘মাতা কে?’
উত্তর না করিয়া ভবানন্দ গাহিতে লাগিলেন,
‘শুভ্র-জ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম
ফুল্লকুসুমিত-দ্রুমদলশোভিনীম
সুহাসিনীং সুমধুর ভাষিণীম
সুখদাং বরদাং মাতরম’
মহেন্দ্র বলিল, ‘এ ত দেশ, এ ত মা নয়...’
ভবানন্দ বলিলেন, ‘আমরা অন্য মা মানি না, জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী। আমরা বলি, জন্মভূমিই জননী, আমাদের মা নাই, বাপ নাই, ভাই নাই, বন্ধু নাই, স্ত্রী নাই, পুত্র নাই, ঘর নাই, বাড়ি নাই, আমাদের আছে কেবল সেই সুজলা সুফলা মলয়জশীতলা শস্যশ্যামলা...’
স্বদেশপ্রেম চিরকালই বঙ্কিমচন্দ্রের আত্মাকে উদ্বেলিত করেছে। খেলার মাঠ পালকি চেপে অতিক্রম করায় বঙ্কিমচন্দ্রকে ধাক্কা দিয়েছিলেন কর্নেল ডফিন নামক এক সেনা আধিকারিক। বঙ্কিমচন্দ্র নিছক ক্ষোভ প্রকাশ করেননি। ওই কর্নেলকে আদালতে গিয়ে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল।
কতটা আত্মাভিমানী ছিলেন ‘বন্দেমাতরম’ সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্র? নবীনচন্দ্র সেন হালকা চালেই বলেছিলেন, ‘বন্দেমাতরমে’র মাঝে মাঝে বাংলা লাইনগুলি বসিয়ে বঙ্কিম নাকি গানটি মাটি করেছেন। এই লাইনগুলি গীতটির প্রাণ ও গাম্ভীর্য নষ্ট করেছে। এটা মোটেই ভালো লাগে না। কেমন খাপছাড়া বোধ হয়। আগোগোড়া সরল সংস্কৃত হলে ভালো হত বলে তিনি মনে করেন। বঙ্কিমচন্দ্র উত্তর দিয়েছিলেন, ‘বাংলা লাইনগুলি তোমার ভালো না লাগে, সেগুলি বাদ দিয়েই তুমি পড়তে পারো।’ নবীনচন্দ্র এই শাণিত উত্তর শুনে বলেছিলেন, ‘আপনার এই দেমাকেই আমরা মারা গেলাম।’
‘বন্দেমাতরম’ যে একটি মন্ত্র হতে চলেছে, এই আভাস বঙ্কিমচন্দ্র জীবৎকালে পেয়েছিলেন কি না জানা নেই, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর ঠিক পরেই এই গান ক্রমেই স্বদেশবন্দনার প্রধান শ্লোকে রূপান্তরিত হল।
শব্দ চয়ন, শব্দ উদ্ভাবন, শব্দ ব্যবহারে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ উৎকর্ষসন্ধানী। ১৮৭৫ সালে ১৪ বছর বয়সেই তিনি এই ‘বন্দেমাতরম’ শব্দবন্ধ জেনে নিয়ে কার্যত আত্মস্থ করে নেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পুরু বিক্রম’ নাটকে ‘বন্দেমাতরম’ গান প্রথম মুদ্রিত হয়। ১৮৭৭ সালে গান বানিয়ে হিন্দুমেলায় পরিবেশন করেন রবীন্দ্রনাথ, ‘একই সূত্রে গাঁথিয়াছি সহস্র জীবন...বন্দে মাতরম...বন্দে মাতরম...’
১৮৯৬ সালে কংগ্রেস অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ‘বন্দেমাতরম’ গাইলেন সুর সংযোজন করে। সেই শুরু হল বিতর্ক। জানা যাচ্ছে, কবিগুরু প্রথম দু’টি স্তবকে সুর দিয়েছিলেন। ‘ভারতী’ পত্রিকায় সরলাদেবী চৌধুরাণীর যে স্বরলিপি প্রকাশিত হয়, সেটিও ‘সুখদাং বরদাং’ পর্যন্ত। পরবর্তী স্তবকে কি প্রথম থেকেই সুর দেননি রবীন্দ্রনাথ? ১৯১২ সালে লন্ডনে একটি অনুষ্ঠানে গান গইতে অনুরোধ করা হলে, তিনি ‘বন্দেমাতরম’ গেয়েছিলেন। কিন্তু সম্পূর্ণ গান নয়। সুতরাং ‘বন্দেমাতরম’ একদিকে যেমন প্রবল ঢেউ তুলল স্বদেশচেতনার উদ্দীপক মন্ত্র হিসেবে, ঠিক তেমনই হয়ে উঠল রাজনীতি ও ধর্মীয় বিভাজনের এক প্রধান হাতিয়ার।
তার আগে অবশ্য ‘বন্দেমাতরম’ আছড়ে পড়েছিল বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে। সেটাই ভারতের প্রথম সর্বাপেক্ষা তীব্র ব্রিটিশ বিরোধী প্রতিবাদ। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে রাখিবন্ধন উৎসবে যে মিছিল বেরিয়েছিল, তার পুরোভাগে ছিল ‘বন্দেমাতরম’ সম্প্রদায়। তাদের গাওয়া ‘বন্দেমাতরম’ গানে সুর দিয়েছিলেন ওই সম্প্রদায়েরই দক্ষিণাচরণ সেন। অরবিন্দ ঘোষের জ্বালাময়ী বিপ্লবগাথার পত্রিকার নামও আর কিছু হওয়া সম্ভব ছিল না—‘বন্দেমাতরম’, যে মন্ত্র উচ্চারণ করলেই শাসক ব্রিটিশ ক্রোধে ফেটে পড়ছে। তার অর্থই তো, এই মন্ত্রের আগুন জ্বালানোর ক্ষমতা আছে! অতএব বাংলা ছাপিয়ে মহারাষ্ট্র। মহারাষ্ট্র ছাপিয়ে দক্ষিণ ভারত।
১৯০৫ সালে বেনারস কংগ্রেস অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথের সুর দেওয়া ‘বন্দেমাতরম’ গাইলেন সরলা দেবী চৌধুরাণী। গোটা দেশে সেই সুর প্রবল জনপ্রিয় হল। পুলিশ লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে এলেই স্লোগান উঠল, ‘বন্দেমাতরম’! ব্রিটিশ বিরোধী বিক্ষোভ মিছিলের একমাত্র মন্ত্র।
১৯৩৭ সালে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস যখন ‘বন্দেমাতরম’কে জাতীয় সংগীত হিসেবে বিবেচনা করছে, তখন আপত্তি তুলল মুসলিম লিগ। মহাত্মা গান্ধীকে প্রবল ক্ষোভের সঙ্গে চিঠি লিখে মহম্মদ আলি জিন্না বললেন, ‘কংগ্রেস শাসিত সমস্ত রাজ্যগুলিতে স্কুলে স্কুলে বন্দেমাতরম গাওয়া হচ্ছে। কংগ্রেসের প্রতিটি অনুষ্ঠানেই এই গান গাওয়া হয়। এর মানে কী? এই গান তো মুসলমান বিরোধী!’ গান্ধী উত্তরে লিখলেন, ‘আমি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে যে প্রগতিশীল উদার জিন্নাকে দেখেছিলাম, আপনি কি সেই একই জিন্না? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না!’
কিন্তু এই ইশ্যুতে প্ররোচনা দিয়ে কংগ্রেসের তাবৎ মুসলিম সমর্থনকে জিন্না ছিনিয়ে নিলে, কী হবে? একটি মধ্যপন্থার খোঁজ করল কংগ্রেস। জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসুরা মতামত চাইলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। একটি অভিমত ছিল, প্রথম দুই স্তবক গাওয়া হোক। কারণ, পরবর্তী পঙ্ক্তিগুলিতে দুর্গাস্তবেরই আভাস, মূর্তিপুজোর কথাই ব্যক্ত হয়েছে, তাই মুসলিমদের আপত্তি। রবীন্দ্রনাথও প্রথম দুই স্তবককেই জাতীয় গান হিসেবে গ্রহণ করার পক্ষপাতী ছিলেন। সুভাষচন্দ্র এবং নেহরুকে পৃথকভাবে দু’টি চিঠি লিখলেন তিনি। কমবেশি একই অভিমত ও যুক্তি জানিয়ে। সেই অভিমতই গ্রহণ করা হল। কিন্তু বাংলাজুড়ে রবীন্দ্রনাথ প্রবলভাবে সমালোচিত হলেন একাংশের কাছে। এমনকি কংগ্রেসের বাংলা প্রাদেশিক কমিটির সিংহভাগ নেতাও এভাবে বঙ্কিমচন্দ্রের গানকে ব্যবচ্ছেদ করার তীব্র বিরোধিতা করলেন। প্রশ্ন উঠল, কবিগুরু নিজের লেখার এমন ব্যবচ্ছেদ কী করতে পারতেন? রবীন্দ্রনাথ কি তাহলে ‘বন্দেমাতরম’ সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন না? এই ধারণা চরম অসত্য।
১৯১৬ সালে ২৮ অক্টোবর পুত্র রথীন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রনাথ চিঠি লিখেছেন, ‘আমাদের বন্দে মাতরং মন্ত্র বাংলাদেশের বন্দনামন্ত্র নয়। এ হচ্ছে বিশ্বমাতার বন্দনা। সেই বন্দনার গান যদি আমরা প্রথম উচ্চারণ করি, তবে আগামী ভাবীযুগে একে একে সমস্ত দেশে এই মন্ত্র ধ্বনিত হয়ে উঠবে।’
কোনও গান জনপ্রিয় হয়। কোনও গান বিতর্কিত হয়। কোনও গান জাতির ভূষণ হয়। কিন্তু এরকম বহু সংগীত একসময় নিভে যায় কালের গর্ভে! ‘বন্দেমাতরম’ কিন্তু নিভল না। যে মন্ত্রধ্বনি হৃদয়ে আগুন জ্বালায়, তা নিছক পদ্য নয়। গান নয়। মন্ত্র নয়। সে আসলে একটি চিরন্তন অগ্নিশিখা।
বন্দেমাতরম!
• গ্রাফিক্স : সোমনাথ পাল
• সহযোগিতায় : সত্যেন্দ্র পাত্র