Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

পড়ুয়াদের আত্মহত্যা অপূরণীয় জাতীয় ক্ষতি

গুলির শব্দ শুনেই ঘুমোতে যেত। আর ঘুম ভাঙত পুলিসের ভারী বুটের আওয়াজে। বাম জমানার শেষদিকে এটাই ছিল জঙ্গলমহলের মানুষের রোজনামচা।

পড়ুয়াদের আত্মহত্যা অপূরণীয় জাতীয় ক্ষতি
  • ৭ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হারাধন চৌধুরী: গুলির শব্দ শুনেই ঘুমোতে যেত। আর ঘুম ভাঙত পুলিসের ভারী বুটের আওয়াজে। বাম জমানার শেষদিকে এটাই ছিল জঙ্গলমহলের মানুষের রোজনামচা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে এই অধ্যায় অতীত। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শাসনকালে এমন ত্রাসের পরিবেশ গড়ে উঠেছিল যে, তাতে আক্ষরিক অর্থেই লাটে উঠেছিল সাধারণ মানুষের রুটিরুজি। নিজের গ্রামে এবং ঘরে থাকাই দায় তখন। স্কুল-পাঠশালায় যাতায়াত ভুলতে বসেছিল ছোট ছেলেমেয়েরা। ২০১১ থেকে, মুখ্যমন্ত্রীর ধারাবাহিক আন্তরিক উদ্যোগে সেখানে শান্তি ফিরতেই ছবিটা দ্রুত বদলে গিয়েছে। বেড়েছে চাষ-আবাদ, ব্যবসাপত্তর। আয় বেড়েছে নারী, পুরুষ উভয়েরই। আসছে নতুন বড় শিল্পও। জঙ্গলমহলের ছেলেমেয়েরা শুধু স্কুলেই যাচ্ছে না, তারা বিভিন্ন পরীক্ষায় ভালো ফলও করছে। যেমন এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় খাতড়া মহকুমার পাঁচ পড়ুয়া রীতিমতো নজির গড়েছে। এমনকী পূর্ব বর্ধমানে আউশগ্রামের জঙ্গলমহলের ছাত্র সৌরীন রায় মেধা তালিকায় দখল করেছে সপ্তম স্থান। স্বভাবতই খুশির হাওয়া বইছে গোটা অঞ্চলে। বাঁকুড়ার ইন্দপুরের নূতনডিহি গ্রামের মেয়ে দেবাদ্রিতা চক্রবর্তীর স্থান হয়েছে সপ্তম। খাতড়ায় কংসাবতী শিশু বিদ্যালয়ের সৌপ্তিক মুখোপাধ্যায় ৬৮৮ নম্বর পেয়ে অষ্টম স্থানে। তারই সঙ্গে অষ্টম হয়েছে বাঁকুড়া পুয়াবাগানের বিবেকানন্দ শিক্ষানিকেতনের শুভ্র সিনহা মহাপাত্র। সেও খাতড়ার ছেলে। ওই স্কুল থেকে যুগ্মভাবে দশম প্রিয়ম পাল ও তুহিন হালদার। তাদের বাড়িও জঙ্গলমহলে। প্রিয়ম সিমলাপালের পুখুরিয়া গ্রামের ছেলে। তুহিন সারেঙ্গার বাসিন্দা। এদের কেউ ডাক্তার আবার কেউ ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। জঙ্গলমহলকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন তাদের চোখেমুখে। 

Advertisement

এই উজ্জ্বল ছবিরই পাশে উঠে এসেছে এক মন খারাপ করা ছবিও।
 ‘বর্তমান’-এর রানাঘাট, ঘাটাল, ও আলিপুরদুয়ারের সংবাদদাতারা জানাচ্ছেন, মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের অব্যবহিত পরেই ওই তিন এলাকার তিনজন পরীক্ষার্থী আত্মঘাতী হয়েছে। তাদের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করেছে পুলিস। মৃতরা হল—শান্তিপুরের তিস্তা সরকার, ঘাটালের ঋতম ঘোষ ও আলিপুরদুয়ারের রিতা দাস। অন্য দু’জন ফেল করলেও পশ্চিম মেদিনীপুরে গোপীনাথপুর শ্রীঅরবিন্দ বিদ্যামন্দিরের ঋতম কিন্তু ভালোই রেজাল্ট করেছিল। তার প্রাপ্ত নম্বর ৩৪৭! তবুও সে কেন আত্মঘাতী হল?  ধন্দে পরিবার ও স্কুল। এরপর আমাদের বরানগরের রিপোর্টার জানাচ্ছেন, রহড়ায় সাগর চৌধুরী নামে এক কিশোরের রহস্যমৃত্যু হয়েছে। সেও মাধ্যমিক পাশ করেছে এবার। পুলিসের বয়ান এইরকম: সাগর ২৭৩ নম্বর পেয়েছে। কিন্তু সে নাকি বাড়িতে বলেছিল তিন বিষয়ে লেটারসহ তার প্রাপ্ত নম্বর ৫৯৭। ছেলের মার্কশিট দেখার জন্য উৎসাহী ছিলেন বাবা-মা। কিন্তু সাগর কথার মারপ্যাঁচে তাঁদের ভুলিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এর পিছনে যে কম নম্বরের কাহিনি আছে, তা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি তাঁরা। কোমলমতি ছেলেটি কি হতাশা ঢাকতেই বাড়িতে মিছে বলেছিল এবং পরে লজ্জায় আত্মঘাতী হয়েছে! উত্তর খুঁজছে পুলিস। 
 শুধু মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীরাই-বা কেন, চরম হতাশার শিকার যে তাদের চেয়ে বড়রাও এবং তাঁরা যথেষ্ট মেধাবীও বটে! পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ করা গিয়েছে যে, দুর্লভ কিছু মেডিক্যাল কোর্স থেকে ছিটকে যাওয়া পড়ুয়ার সংখ্যাও বেড়ে চলেছে। গত পাঁচবছরে একাধিক এইমস-সহ দেশের শীর্ষস্থানীয় মেডিক্যাল প্রতিষ্ঠানের ১,১৬৬ জন ডাক্তারি পড়া মাঝপথে ছেড়ে দিয়েছেন! সম্প্রতি তথ্যের অধিকার আইন মারফত এমনই বিস্ময়কর ছবি সামনে এনেছে ইউনাইটেড ডক্টর্স  ফ্রন্ট (ইউডিএফ)। সংগঠনটি আরটিআই‌ করে জেনেছে যে, ২০২০-২৪ সালের ভিতরে দেশে মেডিক্যাল পড়ুয়াদের মধ্যে ১১৯ জন আত্মঘাতীও হয়েছেন! 
ভারতে পড়ুয়াদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে গিয়েছে এবং বৃদ্ধির হার যথেষ্ট উদ্বেগজনক। কেননা, ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যার হারটি দেশে সাধারণভাবে আত্মহত্যার হার এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকে ছাপিয়ে গিয়েছে। গত ২৮ আগস্ট নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বার্ষিক আইসি৩ সম্মেলন এবং এক্সপো ২০২৪-এ একটি প্রাসঙ্গিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। ‘পড়ুয়াদের আত্মহত্যা: ভারত জুড়ে এক মহামারী’ শীর্ষক ওই রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছিল ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) তথ্য বিশ্লেষণ করে। ওই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশে আত্মহত্যা বৃদ্ধির সার্বিক হার যেখানে ২ শতাংশ সেখানে সংখ্যাটি পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে ৪! ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আত্মহত্যার সব খবর সরকারিভাবে রিপোর্ট করা হয় না। সংখ্যাটি তার পরেও জাতীয় গড়ের দ্বিগুণ! সব খবর নথিবদ্ধ হলে ছবিটা যে আরও হৃদয়বিদারকই হতো, রিপোর্টে সেই ইঙ্গিতই স্পষ্ট।
আইসি৩ ইনস্টিটিউটের এই সংকলনে আরও জানানো হয়েছে যে, ২০২১ ও ২০২২ সালের ভিতরে ছাত্রদের মধ্যে আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা কিছুটা (৬ শতাংশ) কমে গেলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে বেড়ে গিয়েছে ছাত্রীদের মধ্যে স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বেছে নেওয়ার যন্ত্রণা। মেয়ে পড়ুয়াদের মধ্যে আত্মহত্যা বৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ! গত এক দশকে ০-২৪ বর্ষীয় তরুণ-তরুণীর সংখ্যা ৫৮ কোটি ২০ লক্ষ থেকে কমে হয়েছে ৫৮ কোটি ১০ লক্ষের মতো। অথচ ওই সময়ে পড়ুয়াদের মধ্যে আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা এতটাই ঊর্ধ্বগামী যে মৃতের সংখ্যাটি ৬,৬৫৪ থেকে বেড়ে ১৩,০৪৪ বা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে! 
বেসরকারি সংস্থাটির হিসেবে, ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আত্মহত্যার ঘটনা সবচেয়ে বেশি মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু এবং মধ্যপ্রদেশে। সারা দেশে মোট এমন হতভাগ্য পড়ুয়াদের তিনভাগের একভাগ উপর্যুক্ত তিন রাজ্যের বাসিন্দা। প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নেওয়ার পরেও মনের মতো রেজাল্ট হয় না সকলের। এই ধাক্কা সইতে না-পেরে কিছু পড়ুয়া আত্মঘাতী হয়ে থাকে। এই ব্যাপারে সবচেয়ে দুর্নাম ছড়িয়ে পড়েছে রাজস্থানের ‘কোচিং হাব’ কোটার। কিন্তু জাতীয় স্তরেও তাদের র‍্যাঙ্ক অনেক নীচে—দশম। অর্থাৎ কোটার বাইরে আরও অনেক কোটা ছড়িয়ে রয়েছে দেশজুড়ে। তাই শুধু একটা কোটার দিকে নজর রেখে বাকি জায়গাগুলি সম্পর্কে উদাসীন বা নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ যে মোটেই নেই, এই আলোচনা সেটাই মনে করিয়ে দেয়।     
মানুষের ভবিষ্যৎ গড়ে দেয় শিক্ষা। সেই শিক্ষা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই কিছু মানুষ চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। এই অপূরণীয় ক্ষতি কেবল কিছু পরিবারের নয়, গোটা সমাজের এবং সারা দেশের। এর পিছনে শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি এবং আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রের অবনমনকে দায়ী করা চলে। শিক্ষা একট‍ি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি অনুসন্ধান করে তাকে সময়োপযোগী করে তোলাই হল শিক্ষা সংস্কার। মোদি সরকার এই উদ্দেশ্যেই জাতীয় শিক্ষা নীতি (এনইপি) ২০২০ গ্রহণ করেছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু এনইপি’র পরামর্শ কতটা মান্যতা পাবে সরকারের কাছে? এই প্রশ্ন গভীর থেকে গভীরতর হবে না তো? এসব সংশয় জাগছে যে সংগত কারণে তা হল, শিক্ষার জন্য বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির সদিচ্ছা কোথায়?
কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের অর্থনৈতিক সমীক্ষা রিপোর্ট (২০২৪-২৫) অনুসারে, দেশে স্কুলের সংখ্যা ১৪ লক্ষ ৭২ হাজার। সেখানে পড়ুয়ার সংখ্যা ২৪ কোটি ৮০ লক্ষ। এছাড়া সর্বশেষ হিসেব বলছে, দেশে নানা ধরনের কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে যথাক্রমে ৫২,৫৩৮টি এবং ১,৩৬২টি। এগুলিতে মোটামুটি ভালো মানের শিক্ষার ব্যবস্থা করতে পর্যাপ্ত টাকা দরকার। তাই মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৬ শতাংশ শিক্ষাখাতে খরচ করার পরামর্শ দিয়েছে এনইপি ২০২০। কিন্তু বাস্তবে তার ধারেকাছেও বাজেট বরাদ্দ হচ্ছে না। যেমন এবারের (২০২৫-২৬) কেন্দ্রীয় বাজেটে শিক্ষামন্ত্রকের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ১,২৮,৬৫০ কোটি টাকা। 
বলা বাহুল্য যে, টাকার অঙ্কট‍ি বড়সড় দেখালেও তা জিডিপির ৬ শতাংশের ধারেকাছেও নয়, এবং শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির হার গত চারবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন! এছাড়া বিশ্ব ব্যাঙ্কের তথ্য বলছে, ভারত যেসব অর্থনীতির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার খোয়াব দেখে (আমেরিকা, চীন, জার্মানি, জাপান প্রভৃতি) এই প্রশ্নে তাদের থেকে অনেক অনেক পিছনে পড়ে রয়েছে। স্কুলছুটের শতাংশ হার (প্রাথমিকে ১.৯, উচ্চতর প্রাথমিকে ৫.২ এবং মাধ্যমিকে ১৪.১) এখনও মারাত্মক কেন, তার উত্তর কি আমাদের রাষ্ট্রের সদিচ্ছার দীনতার মধ্যেই লুকিয়ে নেই? 
একা পশ্চিমবঙ্গ সরকার কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, মিড মিল দিয়ে এই গ্যাপ পুরো পূরণ করতে পারবে না। শিক্ষাখাতে কেন্দ্রীয় বরাদ্দ দ্রুত এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে বাড়াতেই হবে। হাতে গোনা কয়েকটি আইআইটি বা নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রাক্তনীদের তরফে তহবিল গঠনের উদ্যোগ রয়েছে। এমন উদ্যোগ স্কুলশিক্ষা ক্ষেত্রেও সম্প্রসারিত হতে পারে না কি? গোড়ার গলদ দূর না-হলে বিশ্বসেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ভারতের উজ্জ্বল উপস্থিতির স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ