‘অপরাধ’ বাংলায় কথা বলা। আর এমন অপরাধ অবশ্যই ‘শাস্তিযোগ্য’। বিজেপি-শাসিত (থুড়ি, ‘ডবল ইঞ্জিন’) রাজ্যে এটাই দস্তুর। এটা খুব নতুন নয়, কয়েকবছর ধরেই জারি রয়েছে। বাংলার মানুষকে সামান্য নিগ্রহে এই ‘সাজা’ শেষ হয় না, তা ‘মৃত্যুদণ্ড’ পর্যন্তও গড়ায়! যেমনটা ঘটেছে গত বুধবার (২৪ ডিসেম্বর)। ওড়িশায় এক বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিককে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে আটকে বেধড়ক পেটানো হয়। তাতে মর্মান্তিক মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে তাঁর। মৃত যুবকের নাম জুয়েল। দিনকয়েক আগেই মুর্শিদাবাদে সুতি-১ নম্বর ব্লকের জুয়েল-সহ কয়েকজন যুবক রাজমিস্ত্রির কাজে সম্বলপুর গিয়েছিলেন। বুধবার রাতে একটি চায়ের দোকানে বসে নিজেদের মধ্যে বাংলা ভাষায় কথা বলছিলেন তাঁরা। অভিযোগ, সেইসময় পাঁচজনের একটি দল তাদের উপর চড়াও হয়। অতঃপর ‘বাংলাদেশি’ বলে গালিগালাজ শুরু করে দুর্বৃত্তরা। শ্রমিকেরা নিজেদের বৈধ পরিচয়পত্র দেখালেও দুর্বৃত্ত দল তাতে কর্ণপাত করেনি। প্রাণের ভয়ে সঙ্গী আরিক ও পলাশ পালিয়ে যেতে পেরেছিলেন। কিন্তু ব্যর্থ হন হতভাগ্য জুয়েল। তাঁকে ধরে ফেলে দুর্বৃত্তরা। রাস্তায় ফেলে ওই নির্দোষ নিরপরাধ শ্রমিককে বেধড়ক পেটানো হয়। ঘটনাটি চরম মর্মান্তিক আকার নেয়। মৃত্যু হয় জুয়েলের!
এই জুলুমবাজি ও হত্যাকাণ্ডে পুলিশ মামলা রুজুসহ তদন্ত শুরু করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু এই লেখা পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করার খবর মেলেনি। ঘটনাস্থল, সেই ওড়িশার সম্বলপুর। জুয়েলের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঠিক পরই, বৃহস্পতিবার আক্রান্ত হলেন মুর্শিদাবাদের আর এক পরিযায়ী শ্রমিক। মহম্মদ আসিফ। তাঁরও এক ও একমাত্র ‘অপরাধ’—তিনি ‘বাঙালি’—বাংলায় কথা বলেন, বাংলায় মুক্তচিন্তা করতে অভ্যস্ত। অতএব তাঁকেও ‘বাংলাদেশি’ দেগে দিয়ে মারধর করা হয়েছে প্রথমে। অতঃপর বাধ্য করা হয়েছে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিতে! পড়শি রাজ্যে কাজ করতে যাওয়া ওই শ্রমিক কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁকে রড-শাবল দিয়ে আঘাত করা হয়। তাতে তাঁর মাথা ফেটেছে, ভেঙে গিয়েছে পা। কোনওরকমে প্রাণ বাঁচিয়ে তিনি ফিরে এসেছেন বাংলার বাড়িতে। স্বভাবতই এই গেরুয়া তাণ্ডব নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলির একের পর অমানবিক কাণ্ডের তীব্র নিন্দা করেছেন তিনি। একইসঙ্গে বাংলার বিপন্ন মানুষের পাশে থাকারও বার্তা দিয়েছেন মমতা। বাংলার জননেত্রী ফের জোরের সঙ্গে বলেছেন, ‘বাংলা বলা কোনও অপরাধ হতে পারে না।’ এই ঘটনার মূল চক্রীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তি বিধানের উপর জোর দিয়েছেন তিনি। ইতিমধ্যে জুয়েল-হত্যায় সুতি থানায় ‘জিরো’ এফআইআর দায়ের করে তদন্তে নেমেছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। শনিবার মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, তাঁর রাজ্যের পুলিশ এই ঘটনার তদন্তে ওড়িশা গিয়েছে।
জুয়েলকে খুন কিংবা আসিফকে পিটুনির ঘটনাতেই বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দিন শেষ হচ্ছে না। ডবল ইঞ্জিন রাজ্যগুলিতে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্তা চলছে ধারাবাহিকভাবেই। ওড়িশার শান্তিনগর এলাকায় শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলার জন্য দুর্বৃত্তদের আক্রমণের শিকার হয়েছেন বাংলার আরও একাধিক শ্রমিক। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য বেলডাঙার বাসিন্দা শাহিদুল ও মহিবুল। বিভীষিকাময় পরিবেশের বর্ণনা দিয়েছেন আসিফ, ‘জুয়েলকে খুনের রাতেই আমাকে খুঁজতে এসেছিল ছয় দুর্বৃত্ত। কেউ রটিয়ে দিয়েছে আমি ‘বাংলাদেশি’। কেউ আধার কার্ড দেখতে চায়। আমাদের ন’জন সঙ্গী পালিয়ে যেতে পেরেছিল। আমাকে একা পেয়ে ওরা মারতে শুরু করে। আধার কার্ড দেখিয়েও লাভ হয়নি। লোহার রড ও শাবল দিয়ে পিটিয়ে প্রায় আধমরা করে ফেলে আমাকে।’ মিডিয়ায় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, এমন ‘কালো’ তালিকায় শুধু ওড়িশা নেই, আছে আরও একাধিক ডবল ইঞ্জিন রাজ্য। ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে মূলত বাঙালি মুসলিমদেরকেই টার্গেট করা হচ্ছে। বিজেপি যে বাংলা-বিরোধী, এই ঘটনা সেটাই প্রমাণ করে না কি? ঘটনাগুলি সংশ্লিষ্ট রাজ্য প্রশাসনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতারই সাক্ষ্য দেয়। একইসঙ্গে উন্মোচন করে বিজেপি নামক শাসক দলের চরিত্র। আরএসএসের রাজনৈতিক শাখার এই বিভেদ-বিদ্বেষ-নীতি সংবিধান-বিরোধী। এতে শুধু দেশাভ্যন্তর অস্থির হচ্ছে না, বহির্ভারতেও মুখ পুড়ছে আমাদের। নস্যাৎ হচ্ছে আমাদের বহুকালের বহুত্বের সাধনা। মনে রাখতে হবে, ভারত এই মুহূর্তে শত্রুপরিবেষ্টিত। শত্রুরা এর সুযোগ নিতে সবসময় মরিয়া। তাই প্রতিটি ঘটনার দায়িত্ব স্বীকারসহ অমিত শাহের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ না করা পর্যন্ত এই অপরাধ থামবে না।