Bartaman Logo
২৭ মে, ২০২৬
বর্তমান / চতুষ্পর্ণী

স্ট্রেস থেকে ভুল সিদ্ধান্ত নয়

মানসিক চাপকে কব্জা করে ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া মুখের কথা নয়। ভুলে যাওয়াও ঠেকিয়ে রাখা অসম্ভবপ্রায়। তবে কিছু কৌশল জানলে তা বাঁ হাতের খেল! রইল বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ।

স্ট্রেস থেকে ভুল  সিদ্ধান্ত নয়
  • ২৯ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০

মানসিক চাপকে কব্জা করে ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া মুখের কথা নয়। ভুলে যাওয়াও ঠেকিয়ে রাখা অসম্ভবপ্রায়। তবে কিছু কৌশল জানলে তা বাঁ হাতের খেল! রইল বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ।

Advertisement

অফিসে বসের সঙ্গে একচোট হল সুবীরের। রাগের মাথায় রেজিগনেশন দিয়ে দেবেই ভেবেছিল। বসকে বুঝিয়ে ছেড়েছে যে দোষ ওর টিমের নয়, বরং অন্যের। সুবীর একটু আবেগপ্রবণ, সঙ্গে কাজের চাপও বেশি। তবে ওই সময় ফোনে স্ত্রী মালবিকা না বোঝালে, আজই হয়তো চাকরিটা দুম করে ছেড়ে একটা বড় ভুল করে বসত সুবীর!
শহরের নামী সরকারি স্কুলের ক্লাস এইটের পড়ুয়া সৌহার্দ্য। লেখাপড়ায় অত্যন্ত ভালো। মাধ্যমিকে র‌্যাঙ্কে থাকা নিয়ে তার স্কুলের শিক্ষক, বাবা-মা, আত্মীয় সকলেই আশাবাদী। তবে ইদানীং অঙ্কে কিছু সিলি মিসটেক করছে সে! বারবার অনুশীলন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়াশোনা করলেও এই ভুল সে আটকাতে পারছে না। শুধু তা-ই নয়, মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও সে মাঝেমধ্যেই অনিদ্রা, মুড স্যুইং-এর সমস্যায় ভুগছে।
উপরের দু’টি ঘটনা দুই অসমবয়সির। তবে এমন সত্য ঘটনা প্রায় সকলের বাড়িতেই কমবেশি ঘটে। স্থির করে রাখা কাজেও ভুল হয়। এমনকী, মানসিক চাপে পড়ে অনেক ভুল সিদ্ধান্তও আমরা প্রায়ই নিয়ে ফেলি। পরে আপশোস হয় যে কেন এভাবে কাজটা না করে ওভাবে করলাম না! অনেক সময় মানসিক চাপ মেজাজ হারাতে বাধ্য করে। যে পরিস্থিতি ঠান্ডা মাথায় সামলানো যেত, তা মেজাজ সহ সামলাতে গিয়েও ভুল হয় অহরহ। 
এই সব ভুলকে যদি এক ছাতার তলায় আনি, তাহলে ভিলেন হিসেবে উঠে আসবে মানসিক চাপ বা স্ট্রেস। তবে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অমিতাভ মুখোপাধ্যায়ের মতে, ‘স্ট্রেস কিন্তু খারাপ জিনিস নয়। একটি কাজকে নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করা, পরীক্ষার আগে সিলেবাস শেষ করতে গেলেও সামান্য স্ট্রেস-এর দরকার। অল্প সময়ের জন্য স্ট্রেস এলে কর্টিসল ও অ্যাড্রিনালিন হরমোন ক্ষরিত হয়। এই হরমোনই একজন ব্যক্তিকে যে কোনও পরিস্থিতিতে লড়ে যাওয়ার ক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা প্রদান করে। প্রতিকূলতাকে সামলাতে সাহায্য করে। তাই স্ট্রেস মাত্রই যে খারাপ তা নয়। তবে স্ট্রেসকে প্রয়োজনের তুলনায় বাড়তে দিলে মুশকিল। ঠিক তেমনই প্রয়োজনীয় স্ট্রেসকে ম্যানেজ করতে না জানলেও সমস্যা শুরু হয়।’

 

কীভাবে সামলাবেন?

হঠাৎ কেউ অপমান করলে বা হঠাৎ কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতি এলে অনেকেই সেই আক্রমণকে প্রতিহত করতে পারেন না। বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন প্রায়ই দেখা যায় যে, অফিস মিটিংয়ে অকারণে বসের বকুনি খেলেন কেউ। অথচ দোষ তাঁর নয়। নিজের বক্তব্য ওই সময় গুছিয়ে বলতে পারলেন না তিনি আকস্মিক স্ট্রেসের কারণে। বরং চাপের মুখে পড়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিলেন। আবার দেখা যায়, বাড়িতেও হঠাৎ কোনও মনোমালিন্য বা সমস্যা এলে ঠান্ডা মাথায় তা মোকাবিলা না করে কেউ কেউ এমন কিছু হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যা আখেরে তাঁরই ক্ষতি করে। বহু অল্পবয়সি ছেলেমেয়ের মধ্যেও প্রেম ও সম্পর্ক সংক্রান্ত নানা স্ট্রেস তৈরি হয়। সঙ্গে পড়াশোনা, কেরিয়ার নিয়ে চাপও থাকে। তাই সম্পর্ক একটু টালমাটাল হলেই তারা সেই চাপ সামলাতে না পেরে ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। 
তবে কিছু কৌশল প্রথম থেকে আয়ত্তে রাখলে এই মানসিক চাপকে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায় ও ভুলের পরিমাণও কমানো সম্ভব হয়। কী সেসব?

ভুল সিদ্ধান্ত ঠেকানোর কৌশল

মানসিক চাপ প্রতিহত করতে প্রতিদিনই কিছু না কিছু শ্বাসের ব্যায়াম অনুশীলন করুন। বিশেষজ্ঞ কারও পরামর্শ নিয়ে এই ব্যায়াম অভ্যাস করুন। বড় করে শ্বাস নেওয়া ও ধীরগতিতে শ্বাস ছাড়ার কিছু অঙ্ক রয়েছে। আপনার কাজ, চাপের ধরন সবকিছু বিচার করে এই পদ্ধতি শেখাবেন বিশেষজ্ঞ।

যে কোনও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে, অপমানিত হয়ে বা মাথা গরম থাকলে কোনও সিদ্ধান্ত নেবেন না। নিজেকে নিরপেক্ষ হওয়ার মতো সময়টুকু দিন। যাবতীয় সিদ্ধান্ত তারপর নিন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় অবশ্যই পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরবর্তী অবস্থা মাথায় রাখুন।

বিশ্বাস ও আস্থা আছে, সর্বোপরি আপনার আবেগের দাম দিতে জানেন, এমন কারও সঙ্গে প্রতিকূল পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলুন। এতেও রাগ বা ক্ষোভ প্রশমিত হয়। তেমন কাউকে তখন হাতের কাছে না পেলে নোটপ্যাডে বা কোনও খাতায় নিজের রাগ, ক্ষোভ ও বিরক্তি উগড়ে ঘটনাটা লিখে ফেলুন। এতেও সাময়িক স্ট্রেস কমে। 

নিয়মিত সময়মতো সুষম খাবার খান ও অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমান।

মোবাইল নয়, সশরীরে সামাজিক যোগাযোগ বাড়ান। দিনের কোনও একটা সময় আড্ডা, বাড়ির লোকজনকে সময় দেওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে চা খাওয়া এসব টুকটাক সামাজিকতাও অনেকটা কাজে আসে। 

অফিসের অল্পচেনা সহকর্মী, অল্পদিনের পরিচিত বা আপনাকে বুঝবেন না, এমন আত্মীয় কারও সামনে নিজের সমস্যার কথা বলবেন না। এতে মন বিপথে চালিত হয়, উল্টে তাঁরা নেতিবাচক সমালোচনা করলে স্ট্রেস আরও বাড়বে।

 

ভুলে যাওয়া আর নয়

প্রাণায়ম ও মেডিটেশন মানসিক চাপের বড় ওষুধ। নিত্য এগুলি অভ্যাস করলে মন শান্ত হয়। এন্ডোরফিনের ক্ষরণ বাড়ে। ফলে মনোযোগ বৃদ্ধি পায় ও মানসিক চাপ সহজে কাবু করতে পারে না। তবে এই প্রাণায়ম ও মেডিটেশনও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে করা উচিত। 

যেসব ক্ষেত্রে ভুল বেশি হয়, সেগুলি একটি নোটপ্যাডে বা হাতের কাছে থাকবে, এমন জায়গায় লিখে রাখুন। প্রথম প্রথম এই অভ্যাস রাখলে এক সময়ের পর তা আর প্রয়োজন হবে না। তবে অফিসের কাজ, নথি, প্রয়োজনীয় তথ্য সবসময় লিখে রাখুন। দিনের শুরুতেই প্রয়োজনীয় কাজের অ্যাজেন্ডা তৈরি করে ফেলুন।

প্রকৃতির সাহচর্যে থাকা ও নিজের সঙ্গে মানসিক চিন্তাহীন কিছুটা সময় কাটানো এক্ষেত্রে জরুরি।

মোবাইলের সাহায্য না নিয়ে কোনও পাজল, নানা রিজনিং গেম ও সৃজনশীল কোনও কাজে ছোটদের ব্যস্ত রাখুন। মনোযোগ বাড়ানোর এটি অন্যতম সেরা উপায়। কোনও বিষয় নিয়েই কখনও প্রত্যাশার চাপ তাদের উপর তৈরি করবেন না। এমন অনেক অভিভাবক আছেন, যাঁরা মুখে বলেন প্রত্যাশার চাপ দিই না, কিন্তু অল্প নম্বর কম পেলেও কেন কম, কোথায় ভুল এসব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এটাও কিন্তু শিশুদের মনে চাপ ফেলে।

শিশুদের পড়ার মাঝে বিরতি দিন। তাতে ভালোভাবে মন বসবে। প্রতি ৪৫ মিনিট অন্তর ৫-৭ মিনিটের ব্রেক পড়া বেশি করে মনে রাখতে সাহায্য করে। তাদের অবশ্যই বাইরের বই পড়া ও খেলার সময় দিতে হবে। খেলাধুলো ও শরীরচর্চা না করলে বুদ্ধির বিকাশ হয় না ও মনোযোগও বৃদ্ধি পায় না। পড়া রিভাইস করার সময় লিখে লিখে তা করতে দিন। এতে বিষয়টি মনে গেঁথে যাবে ও ভুল হবে না।

মনীষা মুখোপাধ্যায়

সম্পর্কিত সংবাদ