Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

রাজ্যের মত নিক কেন্দ্র

বছর দেড়েক আগের কথা। এক নির্বাচনী প্রচার সভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বড় মুখ করে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি

রাজ্যের মত নিক কেন্দ্র
  • ১৪ মার্চ, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বছর দেড়েক আগের কথা। এক নির্বাচনী প্রচার সভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বড় মুখ করে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আরও পাঁচবছর বিনামূল্যে রেশন দেব।’ প্রচুর এবং মুহুর্মুহু হাততালি পড়েছিল। হাততালির ঢেউ এদেশে ভোটযন্ত্রেও আছড়ে পড়ে। জনপ্রিয় কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেলকে ভোটযুদ্ধে ঘায়েল করতে ‘বিজেপির মুখের’ জন্য এটা জরুরিও ছিল। ভোটমুখী ছত্তিশগড়ে পৌঁছে মোদিজি সেটা করেছিলেন নিপুণ হাতেই। ওই রাজ্যের দুর্গ এলাকার একটি জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী ওই মোক্ষম ঘোষণাটি করেন। ভোটগ্রহণের একসপ্তাহ আগে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, ‘৮০ কোটিরও বেশি মানুষ আগামী পাঁচবছর রেশনে বিনামূল্যে খাদ্যশস্য পাবেন।’ তিনি বলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিজেপি সরকার দেশের ৮০ কোটির বেশি মানুষকে বিনামূল্যে রেশন দেওয়ার প্রকল্প আরও পাঁচবছর বাড়িয়ে দেবে। মানুষের ভালবাসা এবং আশীর্বাদ সবসময় আমাকে পবিত্র সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি দেয়।’ প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার আগের দিন রায়পুরের এক জনসভায় ছত্তিশগড় বিধানসভা নির্বাচনের জন্য বিজেপির ইস্তাহার ‘মোদি কি গ্যারান্টি ২০২৩’ প্রকাশ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ভোটপণ্ডিতদের একাংশের দাবি ছিল, বিধানসভার পাশাপাশি, নিকটবর্তী লোকসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই মোদির ওই ঘোষণা। বলা বাহুল্য, ওই এক ঢিলে দুই পাখিই মেরেছিলেন তিনি। ছত্তিশগড় বিধানসভা এবং লোকসভা মিলিয়ে জোড়া নির্বাচনী জয়ে বিরাট ভূমিকা ছিল ওই ‘রেউড়ি’ বণ্টনের।

Advertisement

প্রধানমন্ত্রীর সেদিনের ঘোষণার মধ্যে শর্তাদি স্পষ্ট ছিল না। তিনি ঘুণাক্ষরেও উচ্চারণ করেননি, বিনামূল্যের রেশন পাওয়ার জন্য ঠিক কারা যোগ্য এবং অযোগ্য। তাঁর ঘোষণার মধ্যে তেমন বিভাজন না-থাকায় হাততালি এবং ভোট ঢালাও তাঁর দলের পক্ষে পড়েছিল বলেই অনুমান করা যায়। অথচ বিভাজন গোড়াতেই স্পষ্ট করে দেওয়া উচিত ছিল। কেননা, বিনামূল্যে অথবা ভর্তুকি মূল্যে খাদ্যশস্য প্রকৃত গরিব এবং দারিদ্র্য সীমার নীচের পরিবারগুলিকেই দেওয়া উচিত। খাদ্যের অধিকারকে রাষ্ট্র আইনি স্বীকৃতি দিয়েছে। তাই ক্ষুধানিবৃত্তির দায়িত্ব রাষ্ট‍্রের। রাষ্ট্রীয় কোষাগার পুষ্ট হয় নাগরিকের কাছ থেকে সংগৃহীত করের টাকায়। সম্পন্ন, সচ্ছল নাগরিকরাই প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ—দু’ভাবেই বেশি টাকা কর দেন। কিন্তু এমন একটি টাকারও অপব্যবহার কাম্য নয়। সুন্দর সুস্থ দেশ গঠনের জন্য কিছু স্থানে ভর্তুকি, এমনকী খয়রাতি দিতে হলেও তা উন্নয়নের অংশ। আর এখানেই প্রশ্ন, সরকারি তহবিলের ভর্তুকি বা খয়রাতি কারা পাওয়ার যোগ্য? মেকি উদারতা দেখাতে গিয়ে কিছু দান অপাত্রে হয়ে যাচ্ছে না তো? বস্তুত, রাজনৈতিক ফায়দা কুড়োবার লোভে দলীয় শীর্ষ নেতারা এসব বিচার বাহুল্য জ্ঞানে বেশিরভাগ সময়ই এড়িয়ে যান। মনোহারী ঘোষণার সময় ভাবখানা সুপ্ত থাকে যে, লাভ তো আগে ঘরে উঠুক, ঝাড়াই বাছাই করার অবসর পরে ঢের মিলবে! যেকোনও অস্বচ্ছতাই গ্রাহ্য দুর্নীতি। মোদিজির রেশন ঘোষণার ঐতিহাসিকতাকে কী চোখে দেখবেন, পাঠকই ভাবুন।
যাই হোক, মোদিবাবুদের কার্যোদ্ধার সম্পন্ন ইতিমধ্যেই। এবার সংবিৎ ফিরেছে! না, জ্ঞানের নাড়ি তাঁদের বরাবরই টনটনে। একটু সময় কিনেছেন তাঁরা, ‘সামান্য’ ভোটের জন্যে, নাগরিকের টাকায়। এত বড় দেশ, রাজকোষাগার এই ‘সামান্য ক্ষতি’ আরামেই সইতে পারে। কতই তো সয় নিত্য, এ তো নতুন কিছু নয়। এবার সরকার বাহাদুর প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন, যাঁরা বিনামূল্যের খাদ্যশস্য রেশন দোকান থেকে নিয়মিত তুলছেন, তাঁদের সকলে কি এসব পাওয়ার যোগ্য? প্রশাসন বিলক্ষণ জানে, রেশন গ্রাহকের একটি বড় অংশই গরিব নয়, বিপিএল শ্রেণিভুক্ত তো নয়ই। আর সেটাই স্বাভাবিক। কেননা, রেশন কার্ড বণ্টনের সময় গ্রাহক পরিবারের মাসিক বা বার্ষিক আয় যথাবিহিত উপায়ে যাচাই করা হয়নি। সেটা করতে গেলে ভোটের বাজারে সমস্যা হতেই পারত। তাই জেনেবুঝেই যে এই সংগত দিকটি সাময়িকভাবে চেপে যাওয়া হয়েছিল, তা এক সহজ অনুমান। কেন্দ্র সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এবার গ্রাহকের আয়ের স্তর যাচাই করবে খোদ আয়কর দপ্তর। তার জন্য উপযুক্ত পরিকাঠামোও গড়া হচ্ছে। সোজা কথায়, খয়রাতি প্রাপকদের একটি বড় অংশকে ছেঁটে ফেলা হবে। আগামী দিনে রেশন-ভর্তুকির টাকাও সরাসরি গ্রাহকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাঠানো হতে পারে। এই পদক্ষেপ কেন্দ্রের ব্যয়সংকোচন নীতির অংশ। তবে বিষয়টিতে রাজ্যগুলি কী অবস্থান নেয়, সেটি যথেষ্ট গুরুত্ব। সরকারের উচিত, পশ্চিমবঙ্গসহ সমস্ত রাজ্যের সঙ্গে এখনই আলোচনায় বসা। কারণ দেখতে হবে, পাইকারি হারে ব্যয়সংকোচনে নেমে প্রকৃত গরিবের সঙ্গে যেন কোনোরকম বঞ্চনা না-হয়। তাঁরা যেন উপরতলার রাজনীতির শিকার না হন। তেমনটা হলে কিন্তু অনাহার, অপুষ্টির সমস্যা ফের মাথাচাড়া দেবে।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ