একদিন পুষ্করিণীর স্থির জলে স্বীয় অস্থিচর্মসার শরীরের প্রতিবিম্ব দেখিয়া শ্রীশ্রীমায়ের মনে দেহত্যাগ বাসনা উদিত হয়। কিন্তু তাহার পূর্বে গ্রামের দেবতা ‘সিংবাহিনী’ দুর্গার মাড়োয় (মণ্ডপে) হত্যা দিবার সংকল্প গ্রহণ করিয়া শ্রীশ্রীমা তাহারই জন্য প্রস্তুত হইলেন; ভাবিলেন, ‘ব্যাধির ঔষধ না মিলিলে ঐখানেই অনশনে প্রাণত্যাগ করিব।’ এই সংকল্প করিয়া মাড়োয় শুইবার কিছুক্ষণ পরেই দেবীর নির্দেশ পাইলেন, ‘মন্দিরের ছাঁচতলার মাটি খাও, রোগ সেরে যাবে।’ এইভাবে অসাধ্য ব্যাধি দৈবসহায়ে সারিয়া গেল, আর চারিদিকে রব উঠিল, সিংবাহিনী জাগ্রতা হইয়াছেন। দেবীর মাহাত্ম্য দিকে দিকে প্রচারিত হইল এবং সিংহবাহিনীর মাটি বহুলোকে দৈব-ঔষধরূপে ব্যবহার করিয়া সুস্থ হইতে লাগিল।
মাতা শ্যামাসুন্দরীর সংসারে অবস্থা তখনও খুব খারাপ। ছেলেগুলি এখনও চাষবাসের কাজ দেখিতে শিখে নাই, যজন-যাজন করিবার বয়সও তাহাদের হয় নাই; প্রৌঢ়া শ্যামাসুন্দরীই কায়িক পরিশ্রম করিয়া তাহাদের মানুষ করিতেছিলেন। শ্রীশ্রীমা সুস্থ হইয়া গাছ হইতে তুলা তুলিয়া, পৈতার সুতা কাটিয়া ও অন্য নানাভাবে তাঁহাকে সাহায্য করিতে লাগিলেন।
জয়রামবাটী গ্রামে প্রতি বৎসর সকলে মিলিয়া কালীপূজা করিত। সে-বার পূজার সময় জনৈক গ্রামবাসী আড়াআড়ি করিয়া শ্যামাসুন্দরীর প্রেরিত চাল না লইয়া ফিরাইয়া দেয়। শ্যামাসুন্দরী সারারাত কাঁদিলেন ও ভাবিতে লাগিলেন, ‘কালীর জন্য চাল করেছি, এ চাল কে খাবে? এ তো আর কেউ খেতে পারবে না।’ রাত্রে স্বপ্নযোগে তিনি দেখিলেন, এক রক্তবর্ণা দেবী সুমধুর স্বরে তাঁহাকে বলিতেছেন, ‘ও চাল আমি খাব, তোমার ভাবনা কি!’ শ্যামা জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তুমি কে?’ দেবী ইঙ্গিতে বলিতেন, ‘এর পরেই যাঁর পূজো।’
পরদিন সকালে উঠিয়াই মা মেয়েকে জিজ্ঞাসা করিতেছেন, ‘ওরে সারদা, লাল রঙ—পায়ের ওপর পা দিয়ে, ও কি ঠাকুর—এর পরে যাঁর পূজো?’ শ্রীশ্রীমা জগদ্ধাত্রীর কথা বলিলে শ্যামাসুন্দরী দেহের শক্তি ও মনের ভক্তি দিয়া ঐ অল্প সময়ের মধ্যেই পূজার সমস্ত আয়োজন করিয়া ফেলিলেন।
প্রতিমায় দেবীর পূজা করিয়া এবং গ্রামসুদ্ধ লোককে পেট ভরিয়া খাওয়াইয়া এতদিনে শ্যামাসুন্দরীর মন আনন্দে ভরিয়া উঠিল। বিসর্জনের সময় প্রতিমার কানে কানে বলিয়া দিলেন, মা জগাই, আবার এসো।’ পর বৎসর পূজার পূর্বেই কন্যাকে বলিলেন, ‘পূজার জন্য তুমি কিছু দিও।’ কন্যা সারদা বলিলেন, ‘অত ল্যাঠা পারব না। হ’ল একবার, বেশ হ’ল; আবার বছর বছর কেন?’ রাত্রে শ্রীশ্রীমা স্বপ্নে দেখিলেন, দুই সখীসহ এক দেবী বলিতেছেন, ‘আমরা তবে যাব?’ শ্রীশ্রীমা বলিতেছেন, ‘কে তোমরা?’ দেবী বলিলেন, ‘আমি জগদ্ধাত্রী।’ শ্রীশ্রীমা ব্যস্ত হইয়া বলিলেন, ‘না মা, তোমরা কোথায় যাবে? তোমরা থাক, পূজো ক’রব। তোমাদের যেতে বলি নাই।’ তদবধি প্রতি বৎসর পূজা হইতে লাগিল এবং শ্রীশ্রীমা আসিয়া সাধ্যমত ব্যবস্থা করিতেন। জগদ্ধাত্রী পূজা করার পর হইতে শ্যামাসুন্দরীর সংসারের অভাব অনেকটা কাটিয়া যায়। গঙ্গার জল লোনা হইয়া গেলে শ্রীরামকৃষ্ণ বায়ু পরিবর্তনের এবং জন্মভূমি দর্শনের জন্য সুদীর্ঘ সাধন-জীবনের শেষে যতদিন পারিতেন, প্রতি বৎসর কামারপুকুরে আসিয়া তিন-চার মাস থাকিয়া যাইতেন। তখন তাঁহাকে কেন্দ্র করিয়া গ্রামে কীর্তন-উৎসবের ঢেউ খেলিয়া যাইত; সে সময় জয়রামবাটীতেও কয়েকদিন আনন্দে কাটাইয়া তিনি দক্ষিণেশ্বরে ফিরিতেন।
স্বামী নিরাময়ানন্দের ‘শ্রীশ্রীমা সারদা’ থেকে