ভগবানদাস বাবাজীর কাছে এসেই শ্রীশ্রীঠাকুর প্রথমে শুনেছিলেন যে, তিনি দোষী বৈষ্ণব সাধুর মালা কেড়ে নিয়ে তাকে সমাজ থেকে তাড়িয়ে দেবেন এবং কিছুক্ষণ পরে শুনলেন, তিনি লোকশিক্ষা দেবার জন্যই এখনও মালা তিলকাদি ব্যবহার ত্যাগ করেননি। বাবাজীর ঐরূপ বারংবার “আমি তাড়িয়ে দেব, আমি লোক শিক্ষা দেব, আমি মালা-তিলকাদি ত্যাগ করিনি” ইত্যাদি বলায় শ্রীশ্রীঠাকুর আর স্থির থাকতে পারলেন না। গায়ে ঢাকা চাদরখানি ছুঁড়ে ফেলে একেবারে দাঁড়িয়ে পড়ে বাবাজীকে লক্ষ্য করে বলতে লাগলেন— “কি, তুমি এখনও এত অহংকার রাখ? তুমি লোকশিক্ষা দেবে? তুমি তাড়িয়ে দেবে? তুমি ত্যাগ ও গ্রহণ করবে? তুমি লোকশিক্ষা দেবার কে হে? যাঁর জগৎ তিনি না শেখালে তুমি শেখাবে?” শ্রীশ্রীঠাকুরের তখন অন্যরকম অবস্থা—গায়ে ডাকা চাদর ছুঁড়ে ফেলেছেন, অঙ্গ থেকে পরনের বস্ত্র খসে পড়েছে, একেবারে উলঙ্গ, মুখ অপূর্ব জ্যোতিতে ভরে গেছে। তিনি তখন একেবারে আত্মহারা হয়ে পড়েছেন। কাকে কি বলছেন তার কিছুমাত্র যেন বোধ নেই। ঐ কয়েকটি কথা বলে তিনি একবারে নিস্পন্দ ও নিশ্চেষ্ট হয়ে গভীর সমাধিস্থ হলেন।
সিদ্ধ ভগবানদাস বাবাজীকে এ পর্যন্ত সকলেই মান্য, শ্রদ্ধা, ভক্তিই করে আসছিলেন। তাঁর কার্যের বা বাক্যের প্রতিবাদ করতে কিংবা তাঁর দোষ দেখাতে কেউ এ পর্যন্ত সাহস করতেন না। শ্রীশ্রীঠাকুরের সেরূপ কঠোর প্রতিবাদ বাক্য শুনে সিদ্ধ বাবাজী প্রথমে বিস্মিত হলেন। কিন্তু সাধারণের মতো ক্রোধপরবশ হয়ে ঠাকুরের প্রতি প্রতিহিংসা নেবার ভাব বাবাজীর মনে উদয় হয়নি। ঠাকুরের সামনে তিনি যেন বাঘের সামনে ছাগলের মতো হয়ে রইলেন। তপস্যায় সিদ্ধ ছিলেন বলে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের কথায় তাঁর মনে নিজের যথার্থ বিবেক ফিরে এল। তিনি বুঝলেন, এ জগতে বাস্তবিকই ঈশ্বর ভিন্ন আর দ্বিতীয় কর্তা নেই। অহংকারে মত্ত হয়ে সাধারণ মানব যতই নিজেকে কর্তা ভাবুক, সাধক, ভক্ত কিন্তু ঈশ্বরই একমাত্র কর্তা এ কথা ভুলে গেলে তার পথভ্রষ্ট হয়ে পতনের সম্ভাবনা থাকে। এ ভাবে শ্রীশ্রীঠাকুরের ধমকপূর্ণ কথাগুলো বাবাজীর অন্তর্দৃষ্টি খুলে দিয়ে তাঁকে অধিকতর বিনীত ও নম্র করল। শ্রীশ্রীঠাকুরের শরীরের জ্যোতির্ময় ভাব, ভাবসমাধি দেখে বাবাজীর দৃঢ় ধারণা হলো—ইনি সাধারণ মানুষ নন। কোন এক বিশিষ্ট মহাপুরুষ। পরে যখন শুনলেন ইনিই সেই দক্ষিণেশ্বরের রামকৃষ্ণ পরমহংস, যিনি কলুটোলার হরিসভায় ভাবাবেশে আত্মহারা হয়ে শ্রীচৈতন্যাসনে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন এবং ‘এনাকেই আমি অযথা কটুবাক্য বলেছিলাম’ ভেবে বাবাজীর মনে ক্ষোভ ও পরিতাপের অবধি রইল না। আরো অনুভব করলেন, শ্রীশ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুই তাঁর সামনে শ্রীরামকৃষ্ণ রূপ ধারণ করে এসেছেন।
স্বামী সৎপ্রভানন্দের ‘শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ও রঙের গামলা’ থেকে