মার ইচ্ছা ও আশীর্বাদেই নরেনের দিগদিগন্ত বিজয়। তারপর শ্রীরামকৃষ্ণ আন্দোলনে দেখা দিল, নরেন্দ্রোত্তর যুগ। এইবার শ্রীদেব যা মাকে বলেছিলেন, তা-ই ফলল। অনেক দেশ, অনেক জায়গা যা আমি দেখিনি, যাইনি—দেখবে, তুমি যাবে। কন্যাকুমারীর প্রান্ত পর্যন্ত, বিবাইতা হয়েও, সন্ন্যাসবিধিবদ্ধ না হয়েও, আজীবন চিরকুমারী সারদাদেবী, পোষা খুকি রাধুকে কোলে নিয়ে পাড়ি দিলেন। ভারত মহাদেশের বহু পিপাসুমধ্যে আরও আঠারো বছর একটানা মা প্রধানত রামকৃষ্ণ ভাবধারার হাল ধরে রইলেন। প্রাণান্ত পর্যন্ত অক্লান্ত কর্মে নিরতা মা-কর্মে উৎসাহ দেবার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অধ্যাত্ম কৃপাবিতরণের সাত্ত্বিক ধারাটি অক্ষত অব্যাহত রাখলেন ‘‘ঠাকুরকে ভুলো না। ঠাকুরকে ভুলো না।’’ ব্রহ্মানন্দাদি অপরের প্রচেষ্টা-ভারতে ও বাইরে-ঐ মূল গাওনারই পরিপুষ্টি মাত্র। ২০ জুলাই ১৯২০, রাত ১টায় ভুবনেশ্বরে হঠাৎ শয্যামধ্যে জেগে উঠে রাখাল মহারাজ বলেছিলেন, তুমিও চললে? (তখনই দেহান্তমুখী মা-উদ্বোধনে)-আর কাকে নিয়ে থাকা। মাত্র দু-বছর রইলেন তারপর-মানসপুত্র শ্রীরাখাল।
খোদের কথা। গোড়া বা আগার কথা মাঝে মাঝে ঝালাতে হয়, পুনরাবৃত্তি। পুনঃপুন অভ্যাসনীয়। নইলে খেই হারায়। ব্যুত্থানে শ্রীরামকৃষ্ণের বেটুয়া গামছা পাপোশের প্রতি তীক্ষ্ণ তল্লাস। এখানে—একটা বাতি দে। আলো না দিলে অলক্ষ্মী। ওরে, রাখাল, জুতো ঘটি, সব সামলা। একটু জপ করেই বে-বভুল! কে পেসাদ না নিয়ে, বাড়ি ফিরে যাচ্ছে, তা-ও নজর। বসিরহাট পরগনার গ্রামে জলাভাব। তন্নিবারণার্থ মণি মল্লিককে আপিল, আবেদন। ম্যাস্টেরের ভায়ের—কিশোরীর কর্ম নেই। তার জন্যে মুরুব্বি পাকড়াও ও সুপারিশ। কলেরাক্রান্ত দাসীর চিকিৎসায় মনের যোগ। নিরঞ্জনের লোকসেবা, তারিফ। অভাবী দেখলে, দিতে-থুতে ইচ্ছে। এধারে নিজের ‘ভাঁড়ে মা ভবানী’। তার জন্যে অগত্যা, বাবুকে ধরা। শাণিত বুদ্ধি। সব দিকে লক্ষ্য—ঘরে খাবার আছে? না, ধম্মের নাম করে রাসমণির সদাব্রতে, হেথা নিত্য দিব্য ফলারের লোভে এসেছ, বাপু?—ওরে ছোঁড়া, তোকে বাড়িতে মারধর করে এখানে আসিস বলে। এক কাজ কর। একটা না হয় রবারের জামা কর। ভেতরে পরলে ওপরে লাগবে না।—লণ্ঠন দেব, গ্রামপথে অন্ধকারে যাবি কেমন করে? বড় হিম, গলাটা এঁটে যেয়ো। —মা যশোমতীর বাৎসল্যরসে রোসে বলছেন, খা নারে, রাখাল! এরা না হয় সরে দাঁড়াক (তোর সরম হচ্ছে?) —রাখালের জন্যে বরফ (তাঁরও বড় প্রিয়) রাখো। …বড় ধুপ। বনহুগলি, তুই আবার যাবি? ছায়া পড়লে যাবি। রোস্ খানিক বোস্। …বেলটি, বেশ। গরমে আছ কেমন—এসব কথাই ছবির মতো পর পর স্মরণীয় এবং তল্লব্ধ আলোকে নিজ নিজ জীবনে আদর্শের খুঁটো ধরে কর্ম করা।
স্বামী নির্লেপানন্দের ‘দেবী সারদামণি’ থেকে