দেশ হইতে প্রত্যাবর্তন করিয়া শ্রীরামকৃষ্ণকে আবার সাধনভজনে মগ্ন হইয়া গেলেন। তিনি মায়ের জন্য পুষ্পচয়ন করেন বটে, কিন্তু পূজা আর করেন না। এই সময়ে একদিন ভাবাবেশে কালীমন্দিরে বসিয়া বলিলেন,—“মা তুই শেখাস্তো আমি শিখি, আমি কি করব কিছুই জানিনে।” শ্রীরামকৃষ্ণ ইহার কিছুদিন পরে একদিন পুষ্পচয়ন করিতে গিয়া দেখিলেন, একজন অপূর্ব রূপসী, গৈরিকবসনা, আলুলায়িতকুন্তলা ভৈরবী নৌকা হইতে বকুলতলার ঘাটে অবতরণ করিলেন। তিনি হৃদয়কে আহ্বান করিয়া বলিলেন,—‘দেখ্ হৃদু, ওঘাটে একজন স্ত্রীলোক এসেছে, গেরুয়া পরা, তাকে ডেকে আন্তো।’ হৃদয় ঘাটে গমন করিয়া সন্ন্যাসিনীকে ডাকিয়া আনিলেন। সন্ন্যাসিনী শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখিয়া আনন্দে অশ্রুবারি মোচন করিতে করিতে বলিলেন,— ‘বাবা তুমি এখানে রয়েছ? আমি দুজনকে পূর্বদেশে পেয়েছি আর একজন গঙ্গার ধারে আছেন জেনে, এতদিন খুঁজে খুঁজে আস্ছি।’
সন্ন্যাসিনী পরিচয় দিলেন তিনি ব্রাহ্মণী, নিবাস যশোহর জেলায়, যোগবলে জানিতে পারেন, বঙ্গদেশে তিনজন মহাপুরুষ আছেন। তাঁহাদের মধ্যে দুইজনের নাম চন্দ্র আর গিরিজা, বরিশাল অঞ্চলে উঁহাদের নিবাস; আর একজন জাহ্নবীতীরে আছেন। ব্রাহ্মণী ইতিপূর্বে চন্দ্র ও গিরিজার সাক্ষাৎ পাইয়াছেন। এখন তৃতীয় ব্যক্তির জন্য তিনি নানাস্থান অন্বেষণ করিতেছিলেন। এতদিন পরে তাঁহারও সাক্ষাৎ মিলিল।
শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহার বৃত্তান্ত শ্রবণ করিয়া তাঁহাকে নিজ অনুভবের কথা বলিতে আরম্ভ করিলেন,—“হ্যাগা, আমার একি হ’ল বল্তে পার? সবাই আমাকে পাগল বলে, সত্যি কি পাগল হলুম? মাকে ডাক্তে ডাক্তে সত্যি কি উন্মাদ হলুম।” তারপর তাঁহার কি প্রকার অনুভব উপস্থিত হয় একটির পর একটি সমস্ত বলিয়া যাইতে লাগিলেন। ব্রাহ্মণী তাহা শুনিয়া রোমাঞ্চিত কলেবরা হইলেন এবং তাঁহাকে আশ্বাস দিয়া বলিলেন,—“না বাবা তুমি পাগল হও নাই। এ তোমার পাগলামি নয়। এ যে মহাভাবের লক্ষণ। চৈতন্যদেবেরও ঐরকম হয়েছিল, ব্রজের রাধারাণীর ঐরূপ হয়েছিল। এ সব যে শাস্ত্রে আছে।” পরে চৈতন্যচরিতামৃত হইতে বচন উদ্ধৃত করিয়া তিনি নিজ মত সমর্থন করিতে লাগিলেন। বলিলেনঃ “বাবা তোমার কি এ পাগলামি? তোমায় কেউ চিন্তে পারেনি:
‘অদ্বৈতের গলা ধরি কহেন বার বার।/ পুনঃ যে করিব লীলা মোর চমৎকার,/ কীর্তনে আনন্দরূপ হইবে আমার।’
বাবা সেই চৈতন্যদেব তুমি উদয় হয়েছ—এবার নিত্যানন্দের খোলে চৈতন্যের আবির্ভাব!”
স্বামী শঙ্করানন্দের ‘শ্রীরামকৃষ্ণ-চরিত’ থেকে