Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শ্রীরামকৃষ্ণ

আমরা যদি পুরাণ কথা ছেড়ে ইতিহাসের পাতায় চোখের পাতা ফেলি তাহলে দেখতে পাবো যেখানে যেখানে গুরু-শিষ্যের, ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে সম্পর্কের বুনোন জমাট, সেখানে সেখানে সোনালী ফসল ফলেছে। রাশি রাশি। ভারা ভারা।

শ্রীরামকৃষ্ণ
  • ১৪ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

আমরা যদি পুরাণ কথা ছেড়ে ইতিহাসের পাতায় চোখের পাতা ফেলি তাহলে দেখতে পাবো যেখানে যেখানে গুরু-শিষ্যের, ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে সম্পর্কের বুনোন জমাট, সেখানে সেখানে সোনালী ফসল ফলেছে। রাশি রাশি। ভারা ভারা। থরে-বিথরে। চোখ রাখুন—সক্রেটিস-প্লেটো-অ্যারিস্টটলে। চোখ রাখুন গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ-শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দে। চোখ রাখুন গুরু রবীন্দ্রনাথ ও শিষ্য মুজতবা আলীর জীবন অলিন্দে। বিবেকানন্দ মাঝে মাঝে ডুবে যাচ্ছেন ধ্যানের গভীরে। তুরীয় মার্গে। চিদানন্দে। সেই তুরীয়ানন্দের কিছুটা আভাস তিনি দিচ্ছেন—

Advertisement

“নাহি সূর্য, নাহি জ্যোতি নাহি শশাঙ্ক সুন্দর
ভাসে ব্যোমে ছায়াসম ছবি বিশ্ব চরাচর”।
এই আনন্দ নিলয় থেকে তিনি বের হতে চাইছেন না। গুরু শ্রীরামকৃষ্ণকে কাতর মিনতি করে নিবেদন করলেন—
“দেহ আজ্ঞা গুরুদেব, যোগযুক্ত থাকি
চিদানন্দে যুক্ত আত্মা চিন্তা শূন্য মনে”।।
গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ শিষ্যের মুখের দিকে তাকিয়ে পড়ে নিলেন শিষ্যের মনের মুকুরে ভেসে ওঠা ভাষা! দ্বিধাহীন ধিক্কারে, ধমকে থামিয়ে দিলেন নরেনের মনোগত বাসনাকে। যার মর্মকথা—ছিঃ ছিঃ নরেন, আমি ভেবেছিলুম তুই বটগাছ হবি, তোকে আশ্রয় করে সংসারের দুঃখী-তাপী মানুষ ছায়া পাবে, আশ্রয় পাবে, আর সেই তুই কিনা শুধু নিজের মুক্তি, নিজের আনন্দ নিয়ে ভাবছিস। এতো পাটোয়ারী বুদ্ধি তোর! নরেন থমকে গেল। গুরুর ইঙ্গিত বুঝে বদলে গেল তার ভাবনার অভিমুখ। এরপর আমরা শুনলাম বিবেকানন্দের অন্য রূপ। অনু মূর্তি। বজ্রনির্ঘোষ—
“জয় রামকৃষ্ণ বীজমন্ত্র অনুধ্যান করি
বাহিরিল জনপদে সন্ন্যাসীর বেশে
ধূলি ধূসরিত পথ ছিন্ন বেশ-বাস
মাথার ওপরে জ্বলে দীপ্ত অগ্নিপিণ্ড
ক্ষুধায় কাতর দেহ অবসন্ন প্রাণ...”
পরিণতিতে কী দেখলাম আমরা? ভারতের কোণায় কোণায় দেশে-বিশ্বদেশে, শয়ে শয়ে রামকৃষ্ণ মিশন আশ্রম। শিক্ষাস্থল। অনাথ আশ্রম। হাজারে হাজারে—লাখে লাখে—শিক্ষিত মার্জিত—আদর্শে বলিপ্রদত্ত সন্তান-সন্ততি। এক গৈরিক বিপ্লব। এক মানবতাবাদের জয়ধ্বজা। দিব্যজীবনধারী কিছু শিষ্য মানুষকে দিব্যপথের সন্ধান দিচ্ছেন। গুরু রবীন্দ্রনাথ শিষ্য মুজতবা আলীর কথা। ছাত্র মুজতবা আলী এসেছেন শান্তিনিকেতনে শিক্ষার উদ্দেশ্যে। গুরু রবীন্দ্রনাথ তাঁকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন, কি শিখতে চাস? মুজতবা আলীর সপ্রতিভ উত্তর—একটা কিছু খুব মন দিয়ে শিখতে চাই। গুরুর প্রশ্ন কেন অনেক কিছু শিখতে চাস না কেন? ছাত্র উত্তর দিল—না, শুনেছি তাতে মন বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। গুরু সহাস্যে বললেন—তোর শোনার থেকে আমার দেখা অনেক বেশি। তুই সবকিছু শিখবি। মন দিয়ে শিখবি। শিষ্য গুরুর হাতে নিজেকে সঁপে দিলেন। পরবর্তীকালে দেশ দেখল এক কৃতী মুজতবা আলীকে। এক মননশীল মুজতবা আলীকে। এক বিদগ্ধ-ভাস্বর মুজতবা আলীকে। একবার বরোদার রাজপ্রাসাদে কর্মরত অবস্থায় মুজতবা আলী শান্তিনিকেতনে এসেছেন গুরু রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। গুরুদেবকে প্রণাম করছেন। গুরুদেব তাঁর মাথায় দু-হাত রেখে গর্বভরে বলছেন—ওরে দেশ-বিদেশের রাজা-বাদশারা যখন তোদের আদর আপ্যায়ন করে ডেকে নিয়ে যায় তখন আনন্দে আমার বুকটা ভরে ওঠে। 
পার্থসারথি গায়েন-এর ‘শ্রীমদ্‌ভগবদ্‌গীতা ও দিব্যজীবন’ থেকে    

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ