বৃহস্পতিবার প্রভাতে শ্রীকৃষ্ণ-সম্বন্ধে কথাবার্তা হইল। জন্মগত হিন্দুশিক্ষাদীক্ষার জন্য স্বামীজীর মনের এক বিশেষত্ব এই ছিল যে, তিনি হয়তো কদিন কোন একটি ভাবে ভাবিত হইয়া সেই ভাবের গুণব্যাখ্যা করিলেন, আবার পর দিনই হয়তো তাহাকে কঠোরভাবে বিশ্লেষণ করিয়া একেবারে নির্জীব করিয়া ছাড়িয়া দিতে পারিতেন। তিনি তাঁহার স্বজাতিসুলভ এই বিশ্বাসের এত পূর্ণমাত্রায় অধিকারী ছিলেন যে, যদি কোন ভাব আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে সত্য এবং যুক্তিসহ হয়, তাহা হইলে উহার বাস্তব সত্তা থাকুক বা না থাকুক, তাহাতে কিছুই আসে যায় না। এইরূপ চিন্তাপ্রণালীর প্রথম আভাস তিনি বাল্যকালে তাঁহার আচার্যদেবের নিকট প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। কোন এক ধর্মভাবের ঐতিহাসিক প্রামাণিকতা বিষয়ে সন্দিহান হওয়ায় শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁহাকে বলিয়াছিলেন, “কি! তাহা হইলে তুমি কি মনে কর না যে, যাহারা এরূপ সব ভাবের ধারণা করিতে পারিত, তাহারা নিশ্চিত সেই সব ভাবেরই মূর্তিমান্ বিগ্রহ ছিল?” যেমন খ্রীষ্টের অস্তিত্ব-বিষয়ে তেমনই শ্রীকৃষ্ণের অস্তিত্ব সম্বন্ধেও তিনি কখন কখনও তাঁহার স্বভাবসুলভ সাধারণ সন্দেহের ভাবেও কথাবার্তা বলিতেন। “ধর্মাচার্যগণের মধ্যে কেবল বুদ্ধ ও মহম্মদের ভাগ্যেই ‘শত্রুমিত্র উভয়’-লাভই ঘটিয়াছিল, সুতরাং তাঁহাদের জীবনের ঐতিহাসিক অংশে সন্দেহের লেশমাত্র নাই। আর শ্রীকৃষ্ণ, তিনি তো সকলের চেয়ে বেশি অস্পষ্ট। কবি, রাখাল, শক্তিশালী শাসক, যোদ্ধা এবং ঋষি—হয়তো এই সব ভাবগুলি একত্র হইয়া গীতাহস্তে এক সুন্দর মূর্তিরূপে পরিণত হইয়াছিল।” কিন্তু আজ শ্রীকৃষ্ণ সকল অবতারগণের মধ্যে আদর্শ স্থানীয় বলিয়া বর্ণিত হইলেন, এবং পরবর্তী অপূর্ব চিত্রে ভগবান সারথি বেশে অশ্বগুলিকে সংযত করিয়া রণক্ষেত্রের চতুর্দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিলেন এবং নিমেষে ব্যূহসংস্থান লক্ষ্য করিয়া লইয়া শিষ্যস্থানীয় রাজপুত্রকে গীতার গভীর আধ্যাত্মিক সত্যগুলি শুনাইতে আরম্ভ করিলেন।


