Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

গেরুয়াকরণের বীজ বপন!

এতদিন জাতীয় শিক্ষানীতির নামে ‘বিকৃত’ ইতিহাস ও বিজ্ঞান বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে জায়গা করে নিচ্ছিল। এবার স্কুলের সিলেবাসের অংশ হতে চলেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস।

গেরুয়াকরণের বীজ বপন!
  • ৫ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

এতদিন জাতীয় শিক্ষানীতির নামে ‘বিকৃত’ ইতিহাস ও বিজ্ঞান বিভিন্ন শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে জায়গা করে নিচ্ছিল। এবার স্কুলের সিলেবাসের অংশ হতে চলেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস। বিজেপির ‘মেন্টর’ এই সংগঠনের ইতিহাস, সংস্কৃতি, দেশ গঠন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা— সবই থাকছে সিলেবাসে। আপাতত সংঘ বন্দনার এই সিলেবাস দিল্লির সরকারি স্কুলগুলিতে চালু হলেও ভবিষ্যতে তা গোটা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে বলে মনে করা হচ্ছে। দিল্লির স্কুলগুলিতে চিরাচরিত পাঠ্যসূচির বাইরে ‘রাষ্ট্রনীতি’র পাঠ হিসাবে স্থান পাবে আরএসএস স্তুতি। দিল্লির বিজেপি সরকারের এই পদক্ষেপে অবশ্য অবাক হচ্ছেন না ইতিহাসবিদদের একাংশ থেকে বিরোধী দলগুলি। তাঁদের বক্তব্য, নরেন্দ্র মোদির নতুন জমানায় আরএসএস-বিজেপির হিন্দুত্ববাদী ভাবাদর্শ মেনে দেশের এক হাজার বছরের ইতিহাসকে বদলে দেওয়া হচ্ছে। বিজ্ঞানের নিত্য-নতুন আবিষ্কারকে সনাতনী ব্যাখ্যায় পাল্টে দেওয়া হচ্ছে। এবার আরএসএস-এর মতো আদ্যন্ত হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের আদর্শকে স্কুল সিলেবাসের মাধ্যমে পড়ুয়াদের মনে গেঁথে দেওয়ার ব্যবস্থা করে গেরুয়াকরণের ভিতকে মজবুত করতে চাইছে মোদিবাহিনী। সন্দেহ নেই, এর মাধ্যমে এক অসত্য বা অর্ধসত্য ইতিহাস-সংস্কৃতির পাঠ নেবে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা। 

Advertisement

১৯২৫ সালে নাগপুরে জন্ম নেওয়া সংঘের একশো বছর পূর্তি হল এ বছর। স্বভাবতই আরএসএসকে তুষ্ট করতে প্রধানমন্ত্রী থেকে দিল্লির বিজেপি সরকারের নেতৃত্ব কোনও ত্রুটি রাখেননি। দিল্লির সরকার স্কুল-সিলেবাসে আরএসএসকে ঢুকিয়ে দিয়েছে। আর প্রধানমন্ত্রী একটি ডাকটিকিট ও ১০০ টাকার স্মারকমুদ্রা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সরকারি মুদ্রায় আরএসএস-এর ‘ভারতমাতা’ ছবি রয়েছে। সংঘের ভারতমাতা ছবিতে রয়েছে সিংহবাহিনী এক নারী, যাঁর হাতে ধরা গেরুয়া পতাকা! এই পতাকা হল মহারাষ্ট্রের ব্রাহ্মণ্যবাদী গেরুয়া ধ্বজ, যা পতাকায় ব্যবহার করে আরএসএস। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি মুদ্রায় ভারতমাতার হাতে ত্রিবর্ণ জাতীয় পতাকার বদলে গেরুয়া পতাকা থাকে কি করে? একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে এই কাজ বৈধ কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলের অভিযোগ, এই মুদ্রা প্রকাশ করে সংবিধানের অবমাননা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। বিতর্ক হয়েছে, মোদির প্রকাশিত ডাকটিকিট নিয়েও। ডাকটিকিটে ১৯৬৩ সালের সাধারণতন্ত্র দিবসের প্যারেডে ইউনিফর্ম পরা স্বয়ংসেবকদের ছবি দেখা যাচ্ছে। প্রচার হচ্ছে, দেশপ্রেমের স্বীকৃতি হিসেবে সে বছর প্যারেডে আরএসএস-কে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন জওহরলাল নেহরু। ইতিহাসবিদদের একাংশের বক্তব্য, এটাও ইতিহাসের বিকৃতি। প্রকৃত ঘটনা হল, সে বছর দেশের সব সংগঠনকেই দিল্লির প্যারেডে অংশ নিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী। তাতেই অংশ নিয়েছিল আরএসএস। আলাদা করে তাদের কোনও আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। 
আরএসএস-কে গৌরবান্বিত করতে স্বাধীনতা সংগ্রামে সংঘ বিরাট ভূমিকা নিয়েছিল বলে দাবি করেছেন প্রধানমন্ত্রী। অথচ ইতিহাস বলছে, স্বাধীনতা আন্দোলনে সেভাবে অংশই নেয়নি আরএসএস। বরং সংঘের প্রতিষ্ঠার পর স্বয়ংসেবকদের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদানে বাধা দিয়েছিলেন আরএসএস নেতৃত্ব। ব্রিটিশ বিরোধী আইন অমান্য আন্দোলন হোক অথবা ভারতছাড়ো আন্দোলন— আরএসএস তাতে অংশ নেয়নি। নিজেরাও কোনও আন্দোলন করেনি। এমনকী নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজের সঙ্গেও যোগ দেয়নি তারা। ঐতিহাসিক তথ্য বলছে, সাভারকর ব্রিটিশদের কাছে পরোক্ষভাবে সমর্থনের মুচলেকা দিয়ে জেলমুক্ত হয়েছিলেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯৪২-এর ভারতছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন। গোলওয়ালকার বলেছিলেন, ভারতের হিন্দুরা কখনও ত্রিবর্ণ পতাকা মানবে না। আবার স্বাধীনতার পর গান্ধীজিকে হত্যা করেছিলেন যে ব্যক্তি, সেই নাথুরাম গডসে সেইসময় ছিলেন আরএসএস-এর সদস্য। স্বাধীন ভারতে তিনবার নিষেধাজ্ঞা জারি হয় আরএসএস-এর উপর। প্রথমবার গান্ধীজি হত্যার পর, দ্বিতীয়বার জরুরি অবস্থার সময় এবং তৃতীয়বার বাবরি মসজিদ ভাঙার ঘটনার পর। যে বরেণ্য দেশনায়কদের কথা উঠতে বসতে স্মরণ করে মোদিবাহিনী, সেই গান্ধীজি, নেতাজি, বল্লভভাই প্যাটেল কিংবা আম্বেদকর, তাঁরা সংঘ সম্পর্কে যেসব নিন্দাসূচক বক্তব্য রেখেছেন— আরএসএস তা মনে না রাখলেও ইতিহাস মিথ্যা হয়ে যাবে না। আসলে মেরুকরণ, বিভাজন ও বিদ্বেষের রাজনীতিকে লালনপালন করে হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা ছাড়া আরএসএস-এর অবদান নিয়ে বলার মতো বিশেষ কিছু নেই। অতএব আরএসএস বন্দনায় ইতিহাসের বিকৃতিই একমাত্র ভরসা গেরুয়াবাহিনীর। মোদিবাহিনী সেই কাজটাই সচেতনভাবে করে চলেছে। আর সেই কারণে শিশু মনে গেরুয়াকরণের বীজ বপন করতে বেছে নেওয়া হচ্ছে পাঠ্যসূচিকে। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ