ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা সকলে নিশ্চয়ই বহুবার ট্রেনে ভ্রমণ করেছ। সেই ট্রেনের জন্য রয়েছে আস্ত মিউজিয়াম। হাওড়া স্টেশনের পাশেই রয়েছে এই সংগ্রহশালা। রেলের ইতিহাস ছুঁয়ে দেখে জানালেন চকিতা চট্টোপাধ্যায়
ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা সকলে নিশ্চয়ই বহুবার ট্রেনে ভ্রমণ করেছ। সেই ট্রেনের জন্য রয়েছে আস্ত মিউজিয়াম। হাওড়া স্টেশনের পাশেই রয়েছে এই সংগ্রহশালা। রেলের ইতিহাস ছুঁয়ে দেখে জানালেন চকিতা চট্টোপাধ্যায়
ছোটবেলা থেকেই, ছড়ার মধ্যে দিয়ে শিশুমনের সঙ্গে রেলের যে সখ্যতা গড়ে ওঠে, তা বোধহয় রয়ে যায় সারাজীবন! শৈশব থেকে কতজন যে লোকো-পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখতে দেখতে বড় হয়, তা বলাই বাহুল্য। আর, কাশবনের ফাঁক দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ছুটে আসা রেলগাড়ি দেখে অপু-দুর্গার সেই আনন্দ তো চিরকালীন অমর দৃশ্য হয়ে রয়ে গিয়েছে!
১৮৫৪ সালের ১৫ আগস্ট। পূর্ব ভারতের প্রথম ট্রেনটি সকাল সাড়ে আটটায় হাওড়া স্টেশন ছেড়ে ৯১ মিনিটে হুগলি পৌঁছেছিল। এরপর সমগ্র ভারতের সঙ্গে পূর্ব ভারতের রেলপথ জুড়ে গিয়েছিল। ভারতের এই ঐতিহ্যবাহী রেল ইতিহাসকে স্মরণীয় করে রাখতে ২০০৬ সালে, হাওড়া স্টেশনের পাশেই ফোরশোর রোডে সাড়ে চার একর জমি নিয়ে তৈরি হয়েছে ‘রেল মিউজিয়াম’। প্রতিদিন সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত খোলা থাকে এই মিউজিয়াম। প্রবেশ মূল্য মাথাপিছু মাত্র তিরিশ টাকা।
শীতের দুপুর কিংবা গ্রীষ্মের বিকেল, সবসময়ই সমান আকর্ষণীয় এই অভিনব রেল মিউজিয়ামের ভেতরে ঢুকেই বাঁদিকে রয়েছে ‘হল অব ফেম’। এখানে দেওয়াল জুড়ে রয়েছে আবিষ্কারের সময় থেকে রেলের বিবর্তনের ছবি। সেইসঙ্গে রাখা আছে অধুনা বিলুপ্ত দুষ্প্রাপ্য কয়েকটি ট্রেন, যা দেখে রীতিমতো গায়ে কাঁটা দেবে! দার্জিলিঙের পাহাড়ি পথে বাষ্পচালিত জনপ্রিয় ‘টয় ট্রেন’-এর কথা কে না জানে! বাষ্পচালিত সেই ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ট্রেনটিকে চোখের সামনে দেখতে পেলে রোমাঞ্চিত না হয়ে কি পারা যায়! চাইলে ফোটোও তুলতে পার এই ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে! ব্রিটিশ আমলে ট্রেনের বগি হতো সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি, যা আর এখন দেখা যায় না। তেমনই একটি ডিলাক্স মিটার গেজের ট্রেনের জানলার কাচে চোখ রেখে ভেতরে উঁকি মারলে তাজ্জব হয়ে যেতেই হবে! কী দারুণ বিলাসবহুল ছিল সে যুগের সাহেবদের ট্রেন জার্নি! ঘর না ট্রেনের কামরা বোঝা মুশকিল! কী নেই সেখানে! ডাইনিং টেবিল, চেয়ার। টেবিলের ওপর রাখা কাপ-প্লেট-ফলসমেত রাখা ফলপাত্র। খাট-বিছানা-বালিশ-রাইটিং টেবিল আরও কত কী! আছে ফার্স্ট ক্লাস চেয়ার-কার বগি। যেটি এখনকার আধুনিক চেয়ার-কারের চেয়েও ঢের বেশি সুন্দর! কয়েকটি ট্রেনের ইঞ্জিন ঘরে রয়েছে সেযুগের ইঞ্জিন-ড্রাইভারদের মডেলও।
ডাবল-ডেকার বাসের কথা নিশ্চয়ই জানো? কিন্তু, ডাবল-ডেকার ট্রেনের কথা শুনেছ কখনও? মিনিয়েচার মডেলে এখানে স্বচক্ষে দেখতে পাবে সেই ট্রেনও! সেযুগের স্টিম ইঞ্জিন তো বয়লার ছাড়া চলত না। সেইসব বয়লারও দেখতে পাবে এখানে। স্টিম ইঞ্জিন বয়লার, ডাবল পাইপ হোরাইজান্টাল বয়লার, ল্যাঙ্কাশায়ার বয়লার, ফায়ার টিউব বয়লার ইত্যাদির মডেল।
হল অব ফেম থেকে বেরিয়ে সামনেই পাবে এখানকার একটা বড় ম্যাপ। যেটা সাহায্য করবে ভেতরটা ভালো করে ঘুরে দেখতে। ঝকঝকে তকতকে বাঁধানো রাস্তা, সুন্দর কেয়ারি করা রংবেরঙের ফুলের বাগানের মধ্যে মধ্যে রয়েছে রেলের বাতিল জিনিস দিয়ে তৈরি জাঙ্ক আর্টের নানারকম মডেল। বাঁদিক ধরে এগলে চোখে পড়বে রেলে বিভিন্ন সময় ব্যবহৃত বিভিন্ন চাকার প্রদর্শনী— প্লেন বিয়ারিং হুইল, স্পোক হুইল, এন জি স্টিম লোকোমোটিভ হুইল, ডিফারেনশিয়াল হুইল। এর ঠিক পাশেই রয়েছে ছোটদের প্লে জোন। যেখানে আছে দু’রকমের নাগোরদোলা। আর আছে ছোট ছোট ব্যাটারি চালিত টয় কার একদম খুদেদের জন্য।আরে! ওটা কী? অবিকল যেন হাওড়া স্টেশন! শুধু আকারে ছোট! ওটা হল ‘হল অব হেরিটেজ’। এটা একটা সংগ্রহশালা। দেখতে একদম হাওড়া স্টেশনের মতো! ভেতরে রয়েছে হাওড়া স্টেশনের একটি মিনিয়েচার মডেল। রেল পথের মডেল, লেভেল ক্রসিং ও ওভার ব্রিজের মডেল। ব্রিটিশ আমলের কাঠের ব্লেডযুক্ত সিলিং ফ্যান, হাওড়া স্টেশনের বিখ্যাত ‘বড় ঘড়ি’ র রেপ্লিকা, অয়েল ল্যাম্প ইত্যাদি। সেই সঙ্গে আছে কাচের আলমারি ভর্তি প্রচুর স্মারক। আছে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় শেষবারের মতো নিয়ে আসার সেই ট্রেনটির ফোটো। আর গান্ধীজি, নেতাজি সহ বহু মনীষীর রেলভ্রমণের ফোটোগ্রাফ।
এই ছোট্ট হাওড়া স্টেশন থেকে বেরলেই সামনে রয়েছে প্ল্যাটফর্ম। সেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা টয় ট্রেন। এক পাশে আছে টিকিট কাউন্টার। মাথাপিছু তিরিশ টাকার টিকিট কেটে টয় ট্রেনে চড়ে বসলেই সেটা পুরো রেল মিউজিয়ামটাই ঘুরিয়ে দেখিয়ে দেবে! টয় ট্রেনে চড়ে যেতে যেতে পথে পড়বে সিগন্যাল, হলদে কালো ডোরাকাটা রেলগেট— সবই এই ট্রেনের মতোই ছোট আকারের। এখানে আছে চারটি কুটির— বিরাসাত, বিদ্যুৎ, দূরসঞ্চার ও স্মৃতিয়া। আসলে এগুলো প্রত্যেকটাই সংগ্রহশালা। এখানে রাখা আছে লিভারম্যান, পোর্টার, রেলগার্ড, স্টেশন-মাস্টার, সিগন্যাল গার্ড, রেল পুলিস ইত্যাদির মতো রেলের বিভিন্ন কর্মচারীদের পোশাকপরা প্রমাণ সাইজের মডেল। আছে বিভিন্ন সময় রেল থেকে প্রকাশিত ডাকটিকিটের সম্ভার। আছে ইলেকট্রিকের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও মডেল। আর আছে জনসংযোগ রক্ষা করার পুরনো মডেলের টেলিফোন, রিসিভার, টেলিগ্রাফ ও জরুরি কাগজপত্র, দলিল দস্তাবেজ। এছাড়াও আছে ঢিপির মতো উঁচু একটি গম্বুজ বা কীর্তিস্তম্ভ। যাতে লেখা আছে রেল যাত্রা শুরুর পূর্ণ বর্ণনা ও ইতিহাস। তার সঙ্গে আছে মেট্রোরেলের জন্মবৃত্তান্তও।
এবার যাওয়া যাক রেল ইয়ার্ডে। দেখবে লাইনের ওপর পরপর ট্রেন দাঁড়িয়ে রয়েছে। কত রকমের নাম সেসব ট্রেনের! আছে দুর্গম স্থানে কাজে লাগবার একটি রেলবাসও। আছে তিরিশ টন ওজন তোলার ক্ষমতাসম্পন্ন বড় বড় ক্রেন, ন্যারো গেজ, মিটার গেজ ট্রেন। এখানে আছে পূর্ব পাকিস্তানের (অধুনা বাংলাদেশ) একটি ট্রেনও! ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ট্রেনটি সীমান্ত পেরিয়ে এদেশে এসেছিল। কিন্তু ভারত-পাক যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ায় ট্রেনটি আর ফেরত যেতে পারেনি। যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়। সেই ট্রেনটিও রাখা আছে এই রেল ইয়ার্ডে।
ঘুরতে ঘুরতে খিদে পেয়ে গেল তো? তার ব্যবস্থা আছে। আস্ত একটা রেলের কামরাকে রেস্টুরেন্টের রূপ দেওয়া হয়েছে। হ্যান্ডেল ধরে যেমন কামরায় ওঠ, ঠিক তেমনই হাতল রয়েছে ঢোকার দরজায়।
বেরনোর সময় পাবে স্যুভিনিয়ার শপ। অবশ্য সেখানে শুধু রেল বিষয়ক কিছু বই পাওয়া যায়। মিউজিয়াম দেখার এই অভিনব অভিজ্ঞতাকেও মনে রাখতে পারবে! এতদিন রেল ভ্রমণ তো অনেক করেছ, এবার একবার রেল মিউজিয়াম ভ্রমণ করে আসবে চল!
ছবি: দীপেশ মুখোপাধ্যায়