Bartaman Logo
২৯ মে, ২০২৬
বর্তমান / হেলথ

কোন কোন ক্যান্সারে ব্যথা ও উপসর্গ কিছুই থাকে না

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার যেরকম উন্নতি হয়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উন্নত হয়নি সচেতনতা। কিছু ক্ষেত্রে রোগ নির্ধারণ পদ্ধতিও বেশ জটিল।

কোন কোন ক্যান্সারে ব্যথা ও উপসর্গ  কিছুই থাকে না
  • ৭ মে, ২০২৬ ০৪:০০

পরামর্শে অ্যাপোলো মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের সিনিয়র মেডিকেল অঙ্কোলজিস্ট ডাঃ জয়দীপ ঘোষ।

Advertisement

আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার যেরকম উন্নতি হয়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উন্নত হয়নি সচেতনতা। কিছু ক্ষেত্রে রোগ নির্ধারণ পদ্ধতিও বেশ জটিল। তাই আজও বহু প্রকার ক্যান্সার শরীরের অভ্যন্তরে লুকিয়ে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়। রোগী বুঝতেই পারেন না ভয়াল এই অসুখ দানা বেঁধেছে শরীরে। তাই সাধারণ কিছু ক্যান্সারও ধরা পড়ে অনেক দেরিতে। সাধারণত দেখা যায়, শরীরের বাইরের কোনো স্থানে ক্যান্সার হলে, রোগী সচেতন হলে উপসর্গ বা লক্ষণ প্রথমেই টের পাওয়া যায়। তবু সাধারণ একটি উপসর্গকে ‘ক্যান্সারের উপস্থিতি’ বলে বুঝতে পারেন না অনেকেই। আবার সমস্যা দেখা দেয় শরীরের অভ্যন্তরের অংশে চুপিসারে ক্যান্সার বাসা বাঁধলেও। বহু ক্যান্সার প্রকৃতিগতভাবে প্রাথমিক অবস্থায় উপসর্গহীন থাকে। তাই রোগী বা তাঁর পরিজনদের মধ্যে বাড়তি সচেতনতা না থাকলে যে কোনো ক্যান্সারকেই প্রাথমিক অবস্থায় নির্ণয় করা কঠিন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ক্যান্সার আক্রান্তের শরীরে প্রাথমিক কিছু পরিবর্তন দেখা দিলেও বিষয়টি বড়োসড়ো আকার না নেওয়ায় বা ব্যথাবেদনা না থাকায় খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। যখন গুরুত্ব পেল, তখন হয়তো সেটি মেটাস্টেসিস আকার ধারণ করেছে। ফলে রোগী বা চিকিৎসক সকলের আয়ত্তের বাইরে বেরিয়ে যায়। তাই ক্যান্সারকে প্রাথমিক অবস্থায় চেনা খুব জরুরি। 
নিঃশব্দে বে঩ড়ে ওঠা ক্যান্সার
সিংহভাগ ক্যান্সারেই প্রাথমিক স্তরে কোনো ব্যথাবেদনা থাকে না। ক্যান্সারের লাম্পে ব্যথা তখনই হয়, যখন সেই লাম্প পার্শ্ববর্তী অঙ্গে বা স্নায়ুতে চাপ প্রদান করে। সেটি তখনই হয়, যখন লাম্পটি প্রথিমিক স্তর পেরিয়ে আকারে একটু বড়ো হয়। ফুসফুসে বা পেটে কোনো লাম্প দেখা দিলে প্রাথমিক অবস্থায় সেটি আকারে ছোট থাকে। পেটের মধ্যে থাকে লিভার, প্যাংক্রিয়াস ও স্টমাক। স্টমাক ক্যান্সারের লাম্প পরীক্ষা ছাড়া প্রায় ধরাই পড়ে না। প্রাথমিক অবস্থায় প্রায়ই অ্যাসিডিটির সমস্যা বা বদহজম দেখা দেয়। তবে লিভার ক্যান্সারের ক্ষেত্রে অনেক সময় প্রাথমিক স্টেজে জন্ডিস দেখা দেয়। প্যাংক্রিয়াসের ক্ষেত্রে আবার নিম্নভাগে লাম্প দেখা দিলে সেটি যতক্ষণ না বড়ো হয়, কোনোরকম ব্যথাবেদনা টের পাওয়া যায় না। উপরিভাগে লাম্প হলে ব্যথা শুরুর দিকে হলেও হতে পারে। নিঃশব্দে ঘাতক রূপ নেয় ফুসফুসের ক্যান্সারও। এমনিতেই ফুসফুস গঠনগত দিক থেকে স্পঞ্জের মতো। তাই তার ভিতর কোথাও লাম্প হলে সেটি প্রাথমিক অবস্থায় রোগীর পক্ষে বোঝা প্রায় অসম্ভব। ফুসফুস ক্যান্সারে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘন ঘন সর্দি-কাশি, বুকে কফ জমে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা থাকে। ওভারিয়ান ক্যন্সারের ক্ষেত্রেও আলাদা করে কোনো উপসর্গ থাকে না। কারো কারো ক্ষেত্রে পেটে সামান্য অস্বস্তি থাকতে পারে। পেট ফুলে থাকতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে প্রাথমিক অবস্থায় লাম্প ফেটে রক্ত বেরতে পারে। কোলন ক্যান্সারের বেলায় অবশ্য কিছুটা উপসর্গ বোঝা যায়। ব্যথা হওয়ার আগে স্টুলের রং পরিবর্তন, নিয়মিত রক্তক্ষরণ দেখা দেয়। তুলনামূলকভাবে ছোটো কোনো অঙ্গে ক্যান্সার হলে সেটি সহজে ধরা পড়ে। যেমন: গলা, মুখগহ্বর, ট্রাকিয়া, থাইরয়েড গ্ল্যান্ড বা মস্তিষ্কে লাম্প দেখা দিলে উপসর্গ দ্রুত দেখা যায় তাই ক্যান্সার নির্ণয় সহজ হয়।  উপসর্গ না থাকার তালিকায় ব্রেস্ট ক্যান্সারও রয়েছে। ব্রেস্টের গঠন ফোলা ও ফাইব্রয়েড সমন্বিত হলেও এই ধরনের ক্যান্সার খালি হাতে নিয়মিত পরীক্ষা করা যায়। তাই এক বা একাধিক লাম্প কোথাও বাসা বাঁধলেও তা সহজেই ধরা পড়ার কথা। প্রাথমিক স্তরে লাম্পগুলিতে কোনো ব্যথা থাকে না। তবে ব্রেস্ট অনেক বড়ো হয়ে যায়, ভারী লাগে ও অস্বস্তি তৈরি হয়। লিম্ফোমা বা লিম্ফ ক্যান্সারও সম্পূর্ণ ব্যথাহীন অবস্থায় শরীরে বাসা বাঁধে। ঘাড়, বগল বা কুঁচকিতে লিম্ফ নোড ফুলে গেলে তাই সচেতন হতে হবে। মোটকথা, শরীরের কোথাও কোনো অস্বাভাবিক ফোলাভাব বা লাম্প তৈরি হলেই সতর্ক হতে হবে। 
ক্যান্সার বোঝার উপায়
উপসর্গ ও ব্যথাবিহীন হওয়ায় বেশিরভাগ ক্যান্সার বুঝতে গেলে নিয়মিত পরীক্ষানিরীক্ষা ছাড়া গতি নেই। স্তন ক্যান্সার রুখতে বয়স ৪০ পেরলে বছরে একবার ম্যামোগ্রাফি পরীক্ষা করান। পেটের অভ্যন্তরে থাকা কোনো অঙ্গে ক্যান্সার দানা বাঁধছে কি না বুঝতে বছরে একবার সম্পূর্ণ পেটের আলট্রাসাউন্ড করানো উচিত। ফুসফুসের ক্যান্সার রুখতে ধূমপান ছেড়ে দেওয়া আবশ্যিক। তার সঙ্গে ফুসফুসের নিয়মিত পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে সর্দি-কাশি না কমলে বা বুখে ঘন ঘন কফ জমলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় কিছু রক্ত পরীক্ষা করা দরকার। কোলন ক্যান্সার বুঝতে বছরে একবার অকাল্ট ব্লাড টেস্ট ইন স্টুল করালে ভালো। বেশিরভাগ ক্যান্সার আদতে উপসর্গহীন হওয়ায় আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় ডিএনএ অ্যানালিসিস করা যাবে এমন কিছু ব্লাড টেস্ট আসতে চলেছে। আপাতত গবেষণার পর্যায়ে থাকা এসব রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে ক্যান্সার বহনকারী জিন রয়েছে কি না সেটি বোঝা যাবে ও সেই জিনের গতিপ্রকৃতি জানা সম্ভব হবে।  
কোন কোন সাধারণ উপসর্গে অবহেলা নয়
• কোনো ডায়েট বা ব্যায়াম ছাড়াই হঠাৎ অনেক বেশি ওজন কমে গেলে সচেতন হন।
• সুগার, থাইরয়েড নিয়ন্ত্রণে থাকার পরেও যদি শরীরে প্রায়ই ক্লান্তি থাকে তাহলে একবার চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কিছু রক্ত পরীক্ষা করিয়ে নিন। 
• একটানা কোষ্ঠকাঠিন্য, সেরে গেলে ফের একটানা ডায়ারিয়া— এমন সার্কল প্রায়ই হতে থাকল সচেতন হন। স্টুলের রঙের পরিবর্তন বা রক্ত বেরনোও অবহেলা করবেন না।
• নতুন তিল বা আঁচিলের রং ও আকার পাল্টালে বা সেখান থেকে রক্ত বেরলে সতর্ক থাকুন।
• ঠান্ডা না লাগলেও একটানা দুই-তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে সর্দি-কাশি বা গলায় অস্বস্তি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। 
• শারীরিক কোনো সমস্যা ছাড়াই নিয়মিত অ্যাসিডিটি, পেটে দীর্ঘদিন ধরে অস্বস্তিভাব থাকাও স্বাভাবিক নয়।
• বয়স ৫০ পেরলে মেনস্ট্রুয়েশন চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও হঠাৎএকছিটে রক্ত বেরলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। 
লিখেছেন মনীষা মুখোপাধ্যায়

সম্পর্কিত সংবাদ