হারাধন চৌধুরী: রয়টার্স ইকনমিক পোলস। অর্থনীতি, বাজার এবং শিল্প-বাণিজ্য ক্ষেত্রে বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণের একটি সমীক্ষা। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার তরফে এই সমীক্ষা শতবর্ষ প্রাচীন। এই সমীক্ষার ভিত্তিতে কোনও দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিচার, বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি আগামী দিনের জন্য কিছু পূর্বাভাসও দেওয়া হয়। রয়টার্স ইকনমিক পোলস-এ অতিসম্প্রতি অংশগ্রহণকারী অর্থনীতিবিদদের মতে, চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবর্ষে ভারতীয় অর্থনীতি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্থিতিশীল গতিতে বৃদ্ধি পাবে। বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই তাঁদের তরফে আগে দেওয়া পূর্বাভাস অপরিবর্তিত রেখেছেন অথবা সামান্য ‘আপগ্রেড’ করেছেন। তাঁদের মতে, চলতি অর্থবর্ষে মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) বৃদ্ধির হার হবে ৬.৪ শতাংশ। তাঁরা মে মাসে ৬.৩ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা জানিয়েছিলেন। এবার তাঁরা একইসঙ্গে মনে করিয়ে দিয়েছেন, যে অর্থবর্ষটি (২০২৪-২৫) আমরা তিনমাস আগে পেরিয়ে এলাম সেখানে বৃদ্ধির হার কিন্তু বিগত চারবছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল। গতবছর বৃদ্ধির হার ছিল ৬.৫ শতাংশ। এবারের বৃদ্ধির হার তারও নীচে, অর্থাৎ ৬.৪ শতাংশে নেমে যেতে পারে!
এই প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার যে, বৃদ্ধির হার এটুকুও বজায় আছে অধিক পরিমাণ সরকারি মূলধনী ব্যয়ের সৌজন্যে। সরকার কোনও কারণে অপারগ হয়ে পড়লে ছবিটা মলিন হতে দেরি হবে না। কারণ বেসরকারি লগ্নি এখনও আশানুরূপ নয়। তার জন্য সরাসরি ভুগছে শ্রমের বাজার। কর্মপ্রার্থীর তুলনায় কর্মসংস্থান বা চাকরির সুযোগ অনেক পিছনে পড়ে রয়েছে। বাড়ছে বেকার বাহিনী এবং থমকে রয়েছে মাথাপিছু আয়বৃদ্ধির প্রত্যাশা। আমরা আরও জানি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থামার লক্ষণ নেই। লাগাতার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর থমথমে অবস্থা পশ্চিম এশিয়ার। খনিজ তেল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ এবং ভারতের বিশেষ বন্ধুরাষ্ট্র ইরান সবদিক থেকে বিপর্যস্ত। ভারত-পাক বিবাদে যবনিকা পতন আজও যেন সোনার পাথরবাটি! তার মধ্যে অন্য নিকট প্রতিবেশী বাংলাদেশ, পাকিস্তানের হাতে তামাকু সেবনে আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ক্ষয়রোগলক্ষণাক্রান্ত দুই গুরুত্বপূর্ণ পড়শির সৌজন্যে আমাদের ‘পুবে তাকাও’ নীতির পঞ্চত্বপ্রাপ্তির দশা!
অন্যদিকে, ট্রাম্প সাহেবের মতিগতির কখন কী হয়, তা তিনি নিজেও জানেন না। আমদানি-রপ্তানি থেকে ভারতের লাভালাভ (বাণিজ্য উদ্বৃত্ত বা ঘাটতি) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির উপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। অর্থাৎ রয়টার্স ইকনমিক পোলস-এ যে ক্ষীণ ইতিবাচক লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে তার পাশে মন খারাপের এত এত ছবিকেও রাখতে হবে। একাধিক নেতিবাচক দিক একসঙ্গে ভিড় জমালে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (আরবিআই) ঠিকঠাক রক্ষাকবচ দিতে পারবে কি? বারবার রেপো রেট কমিয়েও কি বৃদ্ধির হার বজায় রাখা সম্ভব হবে? এই প্রশ্ন বিশেষজ্ঞদের ভাবাচ্ছে বইকি! শুধু আরবিআই কেন, বিশ্ব ব্যাঙ্ক এবং আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডারের (আইএমএফ) মতো সংস্থাও তো ভারতের আর্থিক বিকাশ সম্পর্কে তাদের পূর্বাভাস বার বার বদলেছে—প্রথমে অনেক আশামুকুল দেখিয়েছে কিন্তু সময় নিকটবর্তী হতেই বুঝেছে যে কুসুমিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ কিংবা শূন্য!
কিন্তু কেন বার বার আশাহত হতে হয়েছে ভারতবাসীকে? অনেকাংশেই দায়ী দেশের সরকার। মোদি জমানায় যে নীতিতে দেশ পরিচালিত হচ্ছে, তা কাম্য নয়। প্রধানমন্ত্রী মুখে বলছেন ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’। বড়াই করছেন বৃহত্তম গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা তিনি। দাবি করছেন, তাঁর নেতৃত্বে ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে ওঠার প্রহর গুনছে। নরেন্দ্র মোদির আরও দাবি, বিকাশের এই পথ ধরেই স্বাধীনতালাভের শতবর্ষপূর্তির আগেই ভারত ‘উন্নত দেশ’-এর পংক্তিভুক্ত হবে।
নিজের দেশ সম্পর্কে এসব কথা শুনলে কার না গর্ব হয়! কিন্তু বাস্তব কি এমন ভরসা জোগাতে পারছে? কোথায় মান্যতা পাচ্ছে সংবিধান? বহু ভাষা, ধর্মবর্ণ এবং সংস্কৃতি নিয়েই ভারত। এত বিভিন্নতা কোনোভাবেই বিচ্ছিন্নতার দ্যোতক নয়, বরং প্রতিটি ভারতবাসীর সম্পদ। এই সম্পদের ধারণাকে মূর্ত এবং সত্যে প্রতিষ্ঠিত করেছে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সৌন্দর্য। এজন্যই আমরা গাইতে পেরেছি বিবিধের মাঝে মহান মিলনের জয়গান। এমন বিরলপ্রায় সম্পদের রক্ষাকবচ আমাদের মহান সংবিধান এবং বহুদলীয় সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। অনেকগুলি প্রদেশ ও অঞ্চলকে সংহত করার মাধ্যমেই সার্বভৌম ও শক্তিশালী ভারত গঠিত হয়েছে। এই আদর্শ যুক্তরাষ্ট্র নির্মাণের নির্দেশ রয়েছে আমাদের সংবিধানে। সংবিধানের চোখে ভারত রাষ্ট্রের প্রতিটি অঞ্চল, প্রদেশ, ধর্ম, ভাষা এবং সংস্কৃতির মর্যাদা ও মূল্য সমান। রাষ্ট্রের কাছে কোনও এক বা একাধিক রাজ্য ও ভাষার গুরুত্ব বেশি কিংবা কম নয়। এমনকী কেন্দ্র প্রভু এবং রাজ্যগুলি তার আজ্ঞাবহ মনসবদার তাও নয়। কেন্দ্র এবং রাজ্যগুলির সমন্বয়ের ভিত্তিতেই সুন্দর ভারত গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছে সংবিধান। এজন্য কেন্দ্র এবং রাজ্যগুলির দায়িত্ব কর্তব্যও নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে ওই মহান গ্রন্থে। তার ফলে রাজ্যে রাজ্যে এবং কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে বিবাদ করার যুক্তিগ্রাহ্য কারণ কিছু নেই। বিভিন্ন ভাষী মানুষের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি বাধার অবকাশও দূর করেছে আমাদের এই অনন্য রাষ্ট্রব্যবস্থা। তা সত্ত্বেও দেশে একাধিক ইস্যুতে নানা সময়ে অশান্তি হয়েছে। ইস্যুগুলির মধ্যে রয়েছে প্রাদেশিক সীমান্ত সমস্যা, নদীর জলবণ্টন এবং ভাষাগত আধিপত্য বিস্তারের বাসনা। ভাষা সংক্রান্ত বিবাদের শিকার হয়েছে দক্ষিণ ভারতের একাধিক ভাষা এবং বাংলা। মাতৃভাষা বাংলার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পূর্ববঙ্গ এবং অসমে বাঙালি প্রাণ পর্যন্ত দিয়েছে। কিন্তু বাংলাভাষীদের বঞ্চনায় ইতি পড়েনি এখনও। সংখ্যার বিচারে ভারতে বাংলাভাষীদের স্থান দ্বিতীয়, হিন্দির পরেই। পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরার বেশিরভাগ মানুষের মুখের ভাষা বাংলা। এছাড়া অসমসহ সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চল, আন্দামান, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা প্রভৃতি বহু অঞ্চলে লক্ষ লক্ষ বঙ্গসন্তান বসবাস করেন। তারপরেও বহির্বঙ্গে বাংলাভাষীদের সঙ্গে অন্যায় ব্যবহারের কিছু অবাঞ্ছিত দৃষ্টান্ত প্রায়ই সামনে আসছে। মাতৃভাষা বাংলায় কথা বলার ‘অপরাধে’ কিছু গরিব মানুষকে সোজা ‘বাংলাদেশি’ বলে দেগে দেওয়া হচ্ছে! এমনকী অনুপ্রবেশ প্রতরোধ আইনে তাদের ‘পুশ ব্যাক’ পর্যন্ত করা হয়েছে!
বিদ্বেষ-রাজনীতির শিকার ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাও। সবচেয়ে বিপন্ন বোধ করেন মুসলিমরা, দেশি-বিদেশি একাধিক সমীক্ষায় তার নির্মম ছবি প্রকাশিত। তার মধ্যে সামনে এসেছে ভোটার তালিকা সংশোধনের নয়া ফরমান। আধার, কেওয়াইসি প্রভৃতি নিয়ে কী বাড়াবাড়িই না চলেছে, তারই মধ্যে ভোটার তালিকা সংশোধনের তুঘলকি ধুয়ো। এই হুজুগে এমনকিছু নথি চাওয়া হয়েছে, সেসব বেশিরভাগ নাগরিকই জোগাড় করতে পারবেন না। বিহার ভোটের মুখে এমনই জল্পনা আগুনের মতোই ছড়িয়ে পড়েছে দেশময়। নির্বাচন কমিশনের এক নির্দেশিকায় প্রকাশ, ভোটার তালিকায় নাম থাকাটাই যথেষ্ট নয়, ভোটারকে দিতে হবে নাগরিকত্বের সমর্থনে উপযুক্ত নথি এবং ‘ঘোষণাপত্র’ (থুড়ি, মুচলেকা)! ফলে এখন থেকেই এনআরসির আতঙ্ক পেয়ে বসেছে। অসমের লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষের হাল তো সবার জানা। তাই অপারেশন সিন্দুরের মোহ কেটে যেতেই সিঁদুরে মেঘ দেখছে অনেকে। দেশের আশু প্রয়োজন সেন্সাস। তার বদলে আরম্ভ হয়েছে নাগরিকত্ব নির্ধারণের নামে নতুন হুজ্জুতি।
বহু মানুষের প্রশ্ন, মোদি সরকার কি সুস্থভাবে, শান্তিতে কাজটাজ করতে দেবে না? নাগরিকরা কি সর্বক্ষণ নিত্যনতুন নথি জোগাড়ে ব্যতিব্যস্ত থাকবেন? প্রথমেই সকলকে সন্দেহের তালিকায় রেখে দেওয়া কেন? কী শিক্ষা, কী প্রশিক্ষণ, কী চাকরিবাকরি-বাণিজ্য অথবা উত্তরাধিকার—সবেতেই এক অবস্থা? ভালো কিছু ভাবতে দেবে না কি এই সরকার? এভাবে ভারত কোনোদিনই উন্নত দেশের পংক্তিতে পৌঁছতে পারবে না। কেননা, মানুষকে ভালো কিছু ভাবার অবকাশ না দিলে, তাদের আনন্দে কাজকর্ম করার সুযোগ না থাকলে তারা সম্পদ সৃষ্টি করবে কোন জাদুতে? মাথাপিছু আয় এবং জিডিপির নিরন্তর বৃদ্ধি ছাড়া দেশের সমৃদ্ধি আসবে কীভাবে? সমৃদ্ধিশালী ভারত নির্মাণের উদ্যোগ এসব নয়, রাষ্ট্রক্ষমতা অন্যায়ভাবে দখল করার ও টিকিয়ে রাখার নিন্দনীয় প্রচেষ্টামাত্র। নাগরিকদের লাগাতার হেনস্তার নীতি সংবিধান কি সমর্থন করে? সরকারের কাছে এই জবাবটা বিরোধীরা সমস্বরে দাবি করুক। সরকার জবাব দিতে বাধ্য। গণতন্ত্রে সংবিধানই যে শেষ কথা, এই সত্য ফের একবার মনে করিয়ে দিয়েছেন দেশের প্রধান বিচারপতি বি আর গাভাই স্বয়ং।