Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

স্মার্ট মিটার: কেন্দ্র এত আগ্রহী কেন?

উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের পালপাকুড়িয়ায় অশোক সাধুখাঁ মশারি বিক্রি করেন। অভাবের সংসার। সেই সংসারে গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে উঠেছে স্মার্ট মিটার।

স্মার্ট মিটার: কেন্দ্র এত আগ্রহী কেন?
  • ১৪ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

তন্ময় মল্লিক: উত্তর ২৪ পরগনার বারাসতের পালপাকুড়িয়ায় অশোক সাধুখাঁ মশারি বিক্রি করেন। অভাবের সংসার। সেই সংসারে গোদের উপর বিষফোঁড়া হয়ে উঠেছে স্মার্ট মিটার। বিনা পয়সায় স্মার্ট মিটার পাচ্ছেন, তাই আপত্তি করেননি। কিন্তু বিদ্যুতের দাম মোবাইলের মতো আগাম রিচার্জ না করলেই বাড়িতে ঝুপ করে নেমে আসবে অন্ধকার, কত টাকা জমা আছে জানার জন্য মোবাইলে নজরদারি চালাতে হবে, এসব শোনার পর রাতের ঘুম ছুটেছে। রাজ্য সরকার স্মার্ট মিটার বাতিল করেছে শোনার পরেও দুঃশ্চিন্তা যাচ্ছে না। তাঁর একটাই কথা, ‘মিটারটা না বদলানো পর্যন্ত আতঙ্ক দূর হচ্ছে না। কখন যে কী হয়!’

Advertisement

এই জেলারই দত্তপুকুর থানার পীড়গাছা সুভাষনগরের রাজীব অধিকারীরও একই অবস্থা। রাজীববাবু ইলেক্ট্রিকের মিস্ত্রি। দিন আনা দিন খাওয়া মানুষ। তাঁর বাড়িতেও স্মার্ট মিটার বসিয়েছে। বাড়ি ফিরে স্মার্ট মিটার লাগানোর কথা শোনামাত্র পাড়ার লোকজনকে নিয়ে বিদ্যুৎ দপ্তরে গিয়েছিলেন। জানিয়ে দিয়েছেন, মিটার না বদলালে একটা পয়সাও দেবেন না। অশোকবাবু বলেন, ‘আমার দু’হাজার টাকা বিল এসেছে। এক পয়সাও দিইনি। লাইন কাটতে এলে ঝামেলা হবে।’ কিন্তু স্মার্ট মিটারের লাইন কাটার জন্য বিদ্যুৎ দপ্তরের লোকজনকে এলাকায় যেতে হবে না। কন্ট্রোল রুমে বসেই বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া যাবে নির্দিষ্ট বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ। একথা শুনে বেশ চিন্তায় রয়েছেন রাজীববাবু।
স্মার্ট মিটার লাগানোর পক্ষে কেন্দ্রের যুক্তি, বিদ্যুৎ চুরি আটকানো যাবে। অল্প লোডের আবেদন করে বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারবে না। তাতে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী কোম্পানিগুলির লোকসান কমবে। যেসব যুক্তি দেওয়া হচ্ছে তাতে এই মিটার ব্যবহার করে সাধারণ গ্রাহকদের উপকার হবে, এমন জায়গা নেই। তাই রাজ্যের যে দু’তিনটি জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে স্মার্ট মিটার লাগানো হয়েছে, সেখানেই ছড়িয়েছে তীব্র ক্ষোভ। স্মার্ট মিটারের জন্য অনেকেই রাজ্য সরকারের দিকে আঙুল তুলছেন। কারণ তাঁদের বোঝানো হয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশেই লাগানো হচ্ছে স্মার্ট মিটার। এব্যাপারে প্রথমে রাস্তায় নামে অ্যাবেকা। বামেরাও ছিল অতি সক্রিয়। ‘হাওয়া’ গরম হচ্ছে দেখে বিজেপিও তলে তলে স্মার্ট মিটারের বিরুদ্ধে উস্কানি দিচ্ছে। কিন্তু ‘ফেলো কড়ি মাখো তেল’ নীতিটা কেন্দ্রীয় সরকারের। তারজন্যই দেশজুড়ে স্মার্ট মিটার বসানো হচ্ছে। দেওয়া হয়েছে প্রি পেইড স্মার্ট মিটার বসালে ৯০০ টাকা ছাড়ের টোপ। 
কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ কার্যকর করতে যাওয়ায় রাজ্যবাসীর মধ্যে ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছিল। আর জি কর, শিক্ষক নিয়োগ প্রভৃতি বিষয় শহুরে ও শিক্ষিত মানুষের মধ্যে আলোড়ন ফেললেও আম জনতার ইস্যু হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু স্মার্ট মিটার বসানো শুরু হতেই খেটে খাওয়া মানুষ থেকে সমাজের প্রতিষ্ঠিত সকলেই অতিরিক্ত খরচের আশঙ্কায় ভুগছেন। বিরোধীরা এই ইস্যুতে বাজার গরম করতেই 
রাজ্যের বিদ্যুৎমন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস জানিয়ে দিয়েছেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে নতুন করে স্মার্ট মিটার লাগানো হবে না। যাঁদের লাগানো হয়েছে তাঁরাও আগের মতোই তিন মাসের বিল একসঙ্গে দিতে পারবেন।’ তাতে সাধারণ মানুষ স্বস্তি পেলেও বিরোধীরা মুষড়ে পড়েছে। কারণ ফের একটা ইস্যু তাদের হাতছাড়া হয়ে গেল।
এখন প্রশ্নটা হচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকার দেশজুড়ে এমন একটা নীতি চালু করতে গেল কেন? অনেকে বলছেন, মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করাটাই কেন্দ্রীয় সরকারের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নরেন্দ্র মোদির সরকার এমন কিছু নিয়ম চালু করেছে যার জন্য সাধারণ মানুষের কোনও উপকার হয় না। কিন্তু সবক্ষেত্রেই ‘মানুষের স্বার্থে’র দোহাই দেওয়া হয়। নয়া কৃষি আইন চালুর সময়েও চাষিদের স্বার্থের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু চাষিরা বুঝেছিলেন, এই আইন কার্যকর হলে প্রান্তিক চাষিদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে কর্পোরেট সংস্থা মুনাফার পাহাড় গড়বে। বছরভর আন্দোলনের জেরে কেন্দ্রীয় সরকার নয়া কৃষি আইন বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিল।
ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আধারকার্ড ও মোবাইল নম্বর যুক্ত করার সিদ্ধান্তটাও ছিল তেমনই। 
উদ্দেশ্য ছিল নেট ব্যাঙ্কিং চালু করা। বাড়িতে বসেই করা যাবে লেনদেন। সেটা নিশ্চয়ই ভালো। যাঁরা এই সিস্টেমের সুযোগ নিতে চান তাঁরা নিতেই পারেন। কিন্তু লেনদেন বন্ধের হুমকি দিয়ে সবাইকে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে মোবাইল নম্বর যুক্ত করতে বাধ্য করা হল কেন? এতে আম জনতার কতটা লাভ হয়েছে বলা কঠিন, কিন্তু সাইবার অপরাধীদের 
হয়েছে ‘পোয়া বারো’। টেকনোলজিকে কাজে 
লাগিয়ে তারা মানুষের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফাঁকা করে দিচ্ছে। তাদের নিশানা থেকে বাদ যাচ্ছে না শিক্ষিত এবং অতি শিক্ষিতরাও। মোদি সরকারের সৌজন্যে ‘সাইবার ক্রাইম’ বর্তমানে সম্ভবত দেশের সবচেয়ে পরিচিত শব্দবন্ধ।
আধার কার্ডের সঙ্গে প্যান কার্ড লিঙ্ক করিয়ে সাধারণ মানুষের কী উপকার হয়েছে? এর উত্তর পাওয়া যাবে না। তবুও তা করা হয়েছে নাকি 
সাধারণ মানুষের স্বার্থেই! আর যাঁরা মোদি সরকারের সেই নির্দেশকে গুরুত্ব দেননি তাঁদের দিতে হয়েছে হাজার টাকা জরিমানা। নোটবন্দির কথা না বলাই ভালো। পুরানো টাকা বাতিল করে এমন নোট আনা হয়েছে যার চেয়ে উন্নতমানের জাল নোট বানিয়ে ফেলছে বাংলাদেশও।
সংশোধিত বিদ্যুৎ আইনের মধ্যে অন্যতম স্মার্ট মিটার চালু। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, দেশজুড়ে স্মার্ট মিটার চালুর জন্য কেন্দ্রীয় সরকার এত আগ্রহী হল কেন? শুধুই কি বিদ্যুৎ চুরি আটকে রাজ্যগুলির আর্থিক ক্ষতি আটকাতে, নাকি পিছনে আছে অন্য কোনও রহস্য?
সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর আগে দু’টি প্রশ্ন নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। প্রশ্ন এক, শিক্ষিত এবং স্মার্ট লোকজনের বসবাস কোথায় বেশি? অবশ্যই দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, কলকাতার মতো মেট্রোপলিটন শহরগুলিতে। তাহলে সেখানেই তো আগে প্রি পেইড স্মার্ট মিটার লাগানো উচিত ছিল। কিন্তু হল না কেন? ওই সব শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্ব কর্পোরেট সংস্থার হাতে আছে বলে?
প্রশ্ন দুই, এখনও দেশের কোটি কোটি মানুষ মোবাইল ব্যবহার করেন না। যাঁরা করেন তাঁদের অনেকের হাতেই রয়েছে বোতাম টেপা মোবাইল। স্মার্ট মিটার চালু করে দিতে পারলে তাঁরা বাধ্য 
হবেন স্মার্ট ফোন কিনতে। তাতে শুধু স্মার্ট ফোনের বিক্রিই বাড়বে না, হু-হু করে বাড়বে বেসরকারি সংস্থার কানেকশনের সংখ্যা। স্মার্ট মিটার চালুর 
পিছনে কর্পোরেট সংস্থাকে পাইয়ে দেওয়ার কোনও অঙ্ক নেই তো?
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আজ না হয় কাল সংশোধিত বিদ্যুৎ আইন বিজেপি সরকার কার্যকর করবেই। আইন স্বেচ্ছায় মানার জন্য রাজ্যগুলির সামনে ঝোলানো হয়েছে ‘গাজর’। দেওয়া হবে বিশেষ ছাড়, নানান সুবিধে। আর না মানলে? সুযোগ তো মিলবেই না, নেমে আসবে শাস্তির খাঁড়া। এটা কোনও আশঙ্কা নয়, বাস্তব। কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎমন্ত্রী মনোহরলাল খট্টররের কথায়, ২০২৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে গোটা দেশে স্মার্ট মিটার লাগানোর টার্গেট নেওয়া হয়েছে। স্মার্ট মিটার লাগানোর জন্য কারও উপর চাপ দেওয়া হবে না। কিন্তু যেসব রাজ্য স্মার্ট মিটার লাগানোর ব্যাপারে গড়িমসি করছে তাদের সতর্ক করা হচ্ছে। অন্য প্রকল্পের সুবিধা আটকে দেওয়া হবে বলে ‘ভয়’ দেখানো হচ্ছে।
বিপদটা লুকিয়ে আছে এখানেই। অভিজ্ঞতা বলছে, বাংলার প্রাপ্য টাকা আটকে দেওয়ার জন্য কেন্দ্রের বিজেপি সরকার সব সময় ছুতো খুঁজে বেড়ায়। কখনও আবাস যোজনার নাম বদল নিয়ে, কখনও সুস্বাস্থ্য কেন্দ্রের রং নিয়েও বাংলার প্রাপ্য টাকা আটকে দিয়েছে মোদি সরকার। তাই বাংলার স্মার্ট মিটার লাগানো বন্ধের সিদ্ধান্তে ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’র স্লোগান তোলা মোদিজি বাংলাকে টাইট দেওয়ার চেষ্টা করবেন, সেটাই স্বাভাবিক। তবুও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কথা ভেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রের নির্দেশ অমান্য করেছেন।
শুধু বাংলা নয়, স্মার্ট মিটার চালুর ব্যাপারে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির মধ্যেও প্রবল অনীহা স্পষ্ট। ন্যাশনাল স্মার্ট গ্রিডের দেওয়া তথ্য বলছে, স্মার্ট মিটার লাগানোর কাজ হরিয়ানায় প্রায় ৮৫ শতাংশ হলেও মধ্যপ্রদেশে হয়েছে সাড়ে ১৭ শতাংশ, উত্তরপ্রদেশে ১১.২ শতাংশ। আর প্রধানমন্ত্রীর নিজের রাজ্য গুজরাতে? মাত্র সাড়ে ৯ শতাংশ। তাতেই উঠছে প্রশ্ন, গুজরাতবাসীও কি তাহলে বুঝতে পারছে, স্মার্ট মিটার স্কিম বিজেপি সরকারের আর এক জুমলা!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ