Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

স্মার্টে বুঁদ ভারতবাসী

ভিড় ট্রেন। বসার জায়গা নেই। কোনওরকমে দাঁড়িয়ে আশপাশের দিকে তাকালেন। সিটে যাঁরা বসে রয়েছেন, তাঁদের কেউ আপনার দিকে ফিরেই তাকাচ্ছে না।

স্মার্টে বুঁদ ভারতবাসী
  • ২৫ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

প্রীতম দাশগুপ্ত: ভিড় ট্রেন। বসার জায়গা নেই। কোনওরকমে দাঁড়িয়ে আশপাশের দিকে তাকালেন। সিটে যাঁরা বসে রয়েছেন, তাঁদের কেউ আপনার দিকে ফিরেই তাকাচ্ছে না। সকলেরই মাথা নিচু। না, আপনাকে অযথা সম্মান দিতে সবাই মাথা নত করে রয়েছেন, এমনটা ভাবার কোনও কারণ নেই। অধিকাংশেরই নজর মোবাইলে। হয় গেম খেলছেন, নাহলে কোনও রিল দেখছেন। কেউ শুনছেন গান। আপনার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে বছর তেইশের এক যুবক। ভালোভাবে দাঁড়ানোর জায়গা নেই। তাতে ভ্রুক্ষেপ নেই। কানে হেডফোন। নজর ফোনে। একটা বাচ্চা ছেলে। কতই বা বয়স। বড়জোর তেরো-চোদ্দ। লজেন্স বিক্রি করছে। হতাশ মুখে বলেই বসল, কে কিনবে? কেউ তো শুনছেই না। সবাই মোবাইল দেখতেই ব্যস্ত। ট্রেন-বাসের এই চিত্র নিত্যদিনের। আমরা প্রত্যেকেই কমবেশি এর সঙ্গে পরিচিত। এটাই এখন আধুনিক ভারত। স্মার্টফোনের ভারত।

Advertisement

আজকাল একটি নতুন শব্দ শোনা যায়। সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার। একটা সময় ছিল, যখন মানুষ বিবেকানন্দ পড়ত। উদ্বুদ্ধ হতো। নেতাজির জীবন কাহিনিতে অনুপ্রেরণা পেত। রবীন্দ্রনাথকে নিজেদের জীবন দর্শনের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলত। আজকের দিনে এই মনীষীরা এখন আর ইনফ্লুয়েন্সার নন। তাঁদের জায়গায় চলে এসেছেন এক ঝাঁক নব্য স্মার্ট তরুণ-তরুণী। এরা ইংরেজিতে দক্ষ। হিন্দিতেও পারদর্শী। কেউ পডকাস্টার, কেউ স্ট্যান্ড-আপ কমেডিয়ান। রণবীর এলাহাবাদিয়া, সময় রায়না, অপূর্বা মাখিজা, স্বাতী সচদেব—এই ইনফ্লুয়েন্সারদের কেউ কেউ আবার শোয়ের জন্য নিজেদের পিতৃদত্ত নামটাও পরিবর্তন করে ফেলেন। আর এদের শো দেখতে হামলে পড়ে আজকের প্রজন্ম। স্মার্ট ভারতের এখন এটাই বৈশিষ্ট্য।
এঁরা প্রভাব বিস্তারক। কিন্তু নিজেরাই হয়তো জানেন না কোথায় কতটুকু বলতে হয়। কোথায় থামতে হয়। তাঁরা কী প্রভাব তৈরি করবেন সমাজের। মোবাইলে যাঁরা প্রতিদিন এঁদের অনুষ্ঠান দেখার জন্য হাঁ করে বসে থাকেন, তাঁদের রুচি, শিক্ষা কী হবে? গুরুজন, আত্মীয়স্বজন তো ছেড়েই দিন, নিজেদের বাবা-মাকে নিয়েও প্রকাশ্যে খাস্তা করতে এঁরা হয়তো বা পিছপা হচ্ছেন না। এতেই নাকি ইনফ্লুয়েন্স করা যাবে। আপনি-আমি কী বন্ধুমহলে ইয়ার্কি দিই না? দিই তো। কখনও সেটা শালীনতাও ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু তা বলে সেটা গুরুজনদের নিয়ে বা তাঁদের সামনে? কমেডি, পডকাস্টের নামে এখন কিছু ক্ষেত্রে চলছে এইসব অসভ্যতা। আর হা করে গিলছে জেন ওয়াই। বুঁদ হয়ে থাকছে মোবাইলে। বাধ্য হয়ে সুপ্রিম কোর্টকে বলতে হচ্ছে, বাক স্বাধীনতা আর নৈতিকতার মধ্যে একটা ভারসাম্য বজায় রেখে চলতে হয়। এই তরুণরা নিজেদের ওভারস্মার্ট ভাবেন।
ভারতের মোবাইল ফোনের বাজার এখন বেশ চাঙ্গা। ভারতের অর্থনীতি নিয়ে যতই বিপদের কথা শোনা যাক, এই সেক্টরের বৃদ্ধি নিয়ে কোনও প্রশ্ন নেই। বিশেষ করে স্মার্টফোনের বাজার। মোদি সরকার বারবার জানান দিয়েছে, তাদের আমলেই ডেটা কত সস্তা হয়েছে। কত সহজে মানুষ এখন মোবাইলে মজে থাকতে পারছে। তথ্য বলছে, ভারতে এখন ৬৫ কোটি মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করছে। অর্থাৎ, স্মার্টফোনের বাজারের ৪৬ শতাংশ উন্মুক্ত হয়ে গিয়েছে। এত বড় বাজার এখন চীন ছাড়া বিশ্বের কোথাও নেই। এই বাজার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিকাশের হার কমবেশি আট শতাংশ। পোটেনশিয়াল বিচার করলে এখন ভারতই এক নম্বর। আমার এক সহকর্মী একটা গল্প বলছিলেন। তাঁর বাড়ির পরিচারক ভালো ক্যামেরাযুক্ত মোবাইল কিনতে চেয়েছিল। স্বভাবতই সহকর্মী ১০-১২ হাজার টাকায় মোবাইল কেনার কথা বলেন। কিন্তু পরিচারক বলে, না ওতে হবে না। আর একটু দামি চাই। কত আর হবে, সহকর্মী আর একটু বেশি দামের কথা বললেও সে রাজি হয় না। শেষে সে যা বলল, তাতে চক্ষু চড়ক গাছ আমার সহকর্মীরই। রিল বানানোর জন্য ফোন কিনবে। মার্কিন কোম্পানির ফোন। সেই ফোন নেই সহকর্মীরই। কী আর পরামর্শ দেবে তখন আমার কলিগ। দিন কয়েক বাদে তাকে সেই ফোন দেখিয়েও গেল ওই পরিচারক। এটাই পোটেনশিয়াল ক্রেতা। রোজগার কত আছে, সেটা বড় কথা নয়। নিজের সাধ্যের বাইরে গিয়ে পণ্য কেনার মানসিকতা। এটাই স্মার্ট ভারত।
ঋণ শোধ করতে না পেরে দেশে কৃষক আত্মঘাতী 
হচ্ছে। এসব খবরে মন দেওয়ার প্রয়োজন নেই রিল নির্মাতা অনেকের। মধ্যবিত্ত সমাজ ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে দেনার 
দায়ে। সেদিকে হুঁশ নেই সেই সমাজেরই ইয়ং জেনারেশনের। বাবা দেনার দায়ে মাথা খুঁড়ে মরছেন, আর ছেলে-মেয়ে নেচে-গেয়ে রিল বানাচ্ছে। একবারও ভেবে দেখার দরকার নেই, কীভাবে অর্থ আসছে। বাবা-মা দামি মোবাইল 
কিনে দিতে না পারলে আত্মঘাতী হওয়ারও খবর পাওয়া যাচ্ছে। নামটা ‘সমাজ মাধ্যম’। কিন্তু সেখানে সময় ব্যয় করতে গিয়ে মানুষ কি অসামাজিক হয়ে যাচ্ছে? স্বামী-স্ত্রী, সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের,  আত্মীয়-স্বজন সবাই পর হয়ে যাচ্ছে। এমনকী বন্ধুদের মধ্যেও যোগাযোগ কমছে। স্মার্ট ভারতের এটাই বিশেষত্ব।
ভারতীয়দের মোবাইল ফোনের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। মোবাইলের ব্যবহার সংক্রান্ত আর্নস্ট ইয়ং (ইওয়াই)-এর সাম্প্রতিকতম রিপোর্টে এই বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতে কম দামে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার পরিসর বৃদ্ধিই এর নেপথ্যে রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে ওই রিপোর্টে। বিশেষ করে ভারতের ফোনের জগতে দেশের সবচেয়ে ধনী মানুষটির আবির্ভাবে ডেটা অনেক সস্তা হয়ে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক ওই  ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্সি সংস্থার সাম্প্রতিক সমীক্ষা রিপোর্টে বলা হয়েছে, বর্তমানে ভারতীয়রা প্রতিদিন গড়ে ৫ ঘণ্টা ধরে স্মার্টফোন দেখছেন। কী দেখছেন? ৭০ ভাগ সময়ই তাঁরা ব্যয় করছেন সোশ্যাল মিডিয়া, ভিডিও স্ট্রিমিং এবং গেমিং প্ল্যাটফর্মে। সোজা কথায়, এখন ইউটিউব, ফেসবুক বা ইনস্টায় নানারকম রিল দেখছেন, নাহলে গেম খেলছেন। রিল করলেই নাকি অর্থ রোজগার হবে। তাও ডলারে। তাই সকলেই ছুটছেন। কে কতভাবে জনতার মন জয় করবেন। কেউ বলছেন, এভাবে আলুসেদ্ধ মাখতে হবে। তো অন্য একজন কীভাবে মাছ রাঁধবেন শেখাচ্ছেন। কেউ বলছেন রেস্তরাঁ টাইপ খাবার বানাবার কৌশল এটাই। অনেকে আবার বিভিন্ন জায়গার হদিশ দিচ্ছেন। সবটাই নাকি অফবিট। এই ব্লগারদের চক্করে দেখবেন, আপনার পাড়াটাই অফবিট। কিছু নতুন দেখানোর নেশায় বিভিন্ন পাবলিক প্লেসে নাচন-কোঁদনও বাদ যাচ্ছে না। আর পোশাক? সে তো যত কম বলা যায় সেটাই ভালো। আর আমরা নেশায় বুঁদ হয়ে সেটাই দেখছি। স্মার্ট হওয়ার লক্ষণ।
করোনা ভাইরাসের হানা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। আমাদের আরও বেশি করে স্মার্ট করেছে। স্কুল-কলেজে পড়াশোনা শুরু হয়েছে অনলাইনে। ওই জমানার পর থেকেই দেশে মূলত স্মার্ট ফোনের যুগ শুরু হয়েছে। বিনোদন হোক বা অফিসের কাজ, অনলাইন শপিং হোক বা গেমিং, এখন অপরিহার্য মোবাইল। মোবাইল ছাড়া দিন গুজরান ভাবাই যায় না। এর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক প্ল্যাটফর্ম, বিভিন্ন ই-কমার্স ওয়েবসাইট, ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের অ্যাপের বাড়বাড়ন্ত মানুষের মোবাইল-নির্ভরতা অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যার প্রভাব পড়ছে ভারতেও। সদ্যসমাপ্ত অর্থবর্ষের শেষ মাস মার্চে ১ হাজার ৮৩০ কোটি পেমেন্ট হয়েছে ইউপিআই মাধ্যমে। আগের অর্থবর্ষের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে লেনদেন ৪২ শতাংশ বেড়েছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার ফ্রড। ঘুম থেকে ওঠা থেকে আবার ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত নজর শুধু মোবাইলে। ২০২৪ সালের রেকর্ড বলছে, মোট ১.১ লক্ষ কোটি ঘণ্টা মোবাইলে নজর দিয়েছে ভারতবাসী। ভারতের আগে ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়ার মতো দু’টি দেশই আছে। 
খারাপের মধ্যে ভালো দিক অবশ্য কিছু আছে। সেটা অর্থনৈতিকও। ভারতের মেক ইন ইন্ডিয়া কর্মসূচির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে বহু বিদেশি সংস্থা এখন দেশেই মোবাইল উৎপাদন কারখানা খুলেছে। এখানকার উৎপাদিত মোবাইল রপ্তানিও হচ্ছে। আজ থেকে ১০ বছর আগে আমাদের মোবাইল চাহিদার ২৫ শতাংশ দেশে উৎপাদিত হতো। এখন সেটা বাড়তে বাড়তে ৯৭ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু স্মার্ট ভারত সত্যিই কি এগচ্ছে?

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ