Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

রক্তবীজ বধের পর নৃত্যরতা মাতৃমূর্তি দেখা যায় লালগোলার রাজাদের কালীবাড়িতে

রক্তবীজ বধের পর নৃত্যরতা মাতৃমূর্তি দেখা যায় লালগোলার রাজাদের কালীবাড়িতে
  • ১৮ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সংবাদদাতা, লালবাগ: লালগোলার রাজাদের কালীবাড়িতে ২০০বছরের বেশি সময় ধরে ভক্তি ও নিষ্ঠার সঙ্গে পুজো হয়ে আসছে। এই কালীমন্দিরে এসেছেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বিশিষ্ট সাহিত্যিক রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী সহ নানা ক্ষেত্রের স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বরা। লালগোলাবাসীর দাবি, মন্দিরে শিকল বাঁধা কালীমূর্তি দর্শন করে উদ্বুদ্ধ হয়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘বন্দেমাতরম’ রচনা করেছিলেন। মায়ের মন্দিরের সামনে বসে কবি নজরুল অসংখ্য শ্যামাসঙ্গীত গেয়েছেন। জাতীয় দলের ফুটবলার ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায় ফুটবল মরশুম শুরুর আগে এই মন্দিরে এসে পুজো দিয়ে যেতেন। লালগোলার সন্তান ওয়ার্ল্ড রেকর্ড হোল্ডার ওয়াকার তীর্থকুমার ফনী মাতৃমূর্তি দর্শন করে প্রতিযোগিতায় নামতেন।

Advertisement

মুর্শিদাবাদ অনুসন্ধান(দ্বিতীয় খণ্ড) থেকে জানা যায়, লালগোলার মতো দেবীপ্রতিমা নাকি আগে বর্ধমান জেলার কাটোয়া মহকুমার মণ্ডলগ্রামের বর্ধিষ্ণু ভট্টাচার্য পরিবারের কুলদেবী হিসেবে পুজো হতো। কোনও কারণে সেই পুজো বন্ধ হয়ে যায়। ২৫০বছর আগে সেই পরিবারের এক পুরুষ সন্ন্যাস ধর্ম নিয়ে গৃহত্যাগী হন। তিনি পরে লালগোলার দেবীনগর(অধুনা বাংলাদেশে) গ্রামে এসে পারিবারিক কালীমূর্তি নতুন করে প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর মৃত্যুর পর গ্রামের চাঁই মণ্ডল সম্প্রদায়ের মানুষ এই পুজো চালিয়ে যান। পরে লালগোলার রাজা রাও রামশঙ্কর রায় দেবীনগরে এসে সেই মূর্তি দর্শন করেন ও সমস্ত ইতিহাস শোনেন। সেসময় মূর্তিটি একটি গাছের তলায় প্রতিষ্ঠিত ছিল। গ্রামবাসীরা রাজার কাছে সেই মূর্তি মন্দিরে প্রতিষ্ঠার আবেদন জানান। কিছুকাল পর পদ্মার করাল গ্রাসে দেবীনগর গ্রামটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। প্রতিমার কাঠামো পদ্মার শাখানদী কলকলিতে বয়ে লালগোলার রাজবাড়ির ঘাটে আসে। কথিত আছে, রাজা রামশঙ্কর রায় স্বপ্নাদেশ পান যে, মা কালী স্বয়ং তাঁর গৃহে প্রতিষ্ঠিত হতে ইচ্ছা প্রকাশ করছেন। পরদিন ভোরে কলকলির ঘাটে একটি কাঠামো মেলার কথা শুনে রাজা সেই কাঠামো তুলে রাজবাড়িতে নিয়ে আসেন। এরপর কাটোয়ার মণ্ডলগ্রামে ভট্টাচার্য পরিবারের খোঁজে রাজা লোক পাঠান। সেই পরিবার থেকে আসেন মহারাজা যোগীন্দ্রনারায়ণ রায়ের সভাপণ্ডিত তৈলখ্য ভট্টাচার্যের পিতামহ। তিনি একজন সিদ্ধসাধক ছিলেন। রাজা তাঁর কাছে দেবীনগরের কালীমূর্তির কথা সবিস্তারে বলেন। কলকলিতে পাওয়া কাঠামোয় সেই কালীমূর্তির মতো মূর্তি ও মন্দির প্রতিষ্ঠার ইচ্ছে প্রকাশ করেন।
লালগোলার মাতৃমূর্তি সত্যিই অপূর্ব। ভূভারতে এরূপ মাতৃমূর্তি আর নেই। রক্তবীজ বধ করার পর নৃত্যরতা মাতৃমূর্তিকে এখানে দেখা যায়। তিনি শিবের উপর দণ্ডায়মান হয়ে করতালি দিচ্ছেন। তাঁর একপাশে মহালক্ষ্মী ও অপর পাশে মহা সরস্বতী। দেবীর দক্ষিণে কামদেব বা পুরুষ ও বামদিকে দেবী রতি বা প্রকৃতি। এছাড়া, দক্ষিণে অপরাজিতা(জয়া) ও বামে অজিতা(বিজয়া) রয়েছেন। কথিত আছে, প্রতিষ্ঠার রাতে দেবী কোনও কারণে অসন্তুষ্ট হয়ে রাজাকে স্বপ্নে জানান, তিনি মন্দির ত্যাগ করবেন। তখন রাজা ক্রোধবশত দেবীপ্রতিমা পিছন থেকে লোহার শিকলে বেঁধে দেন। তবে প্রকৃতপক্ষে মাটির প্রতিমা যাতে সামনে ঝুঁকে পড়ে ভেঙে না যায়, সেজন্যই এই ব্যবস্থা বলে অনেকে মনে করেন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ