প্রখর তাপে ত্বক বাঁচাতে কেন মাখবেন সানস্ক্রিন? জানালেন ত্বকবিশেষজ্ঞ।
প্রখর তাপে ত্বক বাঁচাতে কেন মাখবেন সানস্ক্রিন? জানালেন ত্বকবিশেষজ্ঞ।
সূর্যের আলোয় আবার ত্বকের ক্ষতি! সেই লোকসান আবার সামলে দেবে কয়েক গ্রাম ক্রিম? এমন অদ্ভুতুড়ে ভাবনা শিশুকে তেল মাখিয়ে ঘণ্টার ঘণ্টা রোদে শুইয়ে রাখা ভারতীয়রা সহজে বিশ্বাস করেনি। তাই সানস্ক্রিনের ধারণা এ দেশে প্রতিষ্ঠা পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রাথমিক হানা পর্যন্ত। শিশুপাঠ্য বইয়ে ভোর হলে দোর খুলে দেওয়ার কথা আমরা সকলেই পড়েছি। ভোর হলে সেখানে খুকুমণিকেও উঠে পড়তে বলা হয়। ভোরের সঙ্গে জনজীবনের এমন সূচনা বোধহয় ভোরের নতুন আলোর জন্যই সম্ভব হয়েছে। তবে ভোরের সূর্য যখন আরও একটু আলোর তেজ বাড়িয়ে সকাল ও বারবেলার দিকে এগয়, তখন তার গনগনে তাপ সামাল দেওয়ার জন্য গৃহস্থ বের করে ফেলে কুলুঙ্গির ছাতা, হালফ্যাশনের সানগ্লাস, কেতাদুরস্ত টুপি।
ত্বকবিশেষজ্ঞ ডাঃ কৌশিক লাহিড়ীর মতে, একটা সময় পর্যন্ত গরম ও সূর্যের তাপ থেকে বাঁচতে এই-ই ছিল সকলের সহায়সম্বল। বিশ্ব উষ্ণায়ন এরপর যত বাড়তে থাকল, ততই ত্বক পুড়তে লাগল, কোনও কোনও ক্ষেত্রে সানলাইট অ্যালার্জি এমনকী, ত্বকের ক্যান্সারও পাল্লা দিয়ে বাড়তে শুরু করল। ভারতীয়রাও মেনে নিল বিজ্ঞানীদের দাবি, বুঝল, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি আমাদের ত্বকের মোটে বন্ধু নয়! বরং ত্বকের অকালবার্ধক্য, ভাঁজ, অ্যাকনে সর্বোপরি ত্বকের বয়স বেড়ে যাওয়ার নেপথ্যে ভিলেন সে-ই! তখন থেকেই সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিকে শায়েস্তা করতে ভারতীয় বাজার দখল করল সানস্ক্রিন প্রস্তুতকারী নানা সংস্থা। এখনও অনেক অর্থব্যয়ে বহু এসপিএফ-যুক্ত সানস্ক্রিন খোঁজেন অনেকেই। কেউ কেউ ভাবেন, সানস্ক্রিনে বড্ড ঘাম হয় বাপু! ছাতা মাথায় দেওয়া বরং ভালো। কেউ আবার সানস্ক্রিন মাখেন বটে, তবে জানেন না সেটা আদৌ কোনও কাজে আসছে কি না।
এদিকে ক্যালেন্ডার মেনে এপ্রিল প্রায় শেষের পথে। তীব্র গরমকাল অপেক্ষা করছে শিয়রে। তবু রাস্তাঘাটেও বেরতে হবে, কর্মক্ষেত্রে যেতে হবে নিত্য। তাই প্রখর সূর্যের তাপ থেকে নিজের ত্বককে বাঁচাতে সানস্ক্রিনের সঙ্গে ভাব করে ফেলার মরশুম এটিই। কেনই বা সানস্ক্রিনের প্রয়োজন? কোন ত্বকের জন্য কেমন সানস্ক্রিন প্রয়োজন, কীভাবে তা ব্যবহার করবেন এসব উত্তরই দিলেন ত্বকবিশেষজ্ঞ।
ত্বকের বন্ধু?
সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মির মূলত তিনটি ভাগ। এ, বি ও সি। ভারতীয় ত্বকে অতি বেগুনি রশ্মির (আল্ট্রা ভায়োলেট রে বা ইউভি) এ-এর ক্ষতিকর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ত্বকে ট্যান পড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ এই ইউভি এ। ইউভি বি-এর প্রভাবে সানবার্ন ঘটে। তবে ভারতীয়দের ত্বকে বিদেশিদের তুলনায় মেলানিন বেশি থাকায় ইউভি বি-র প্রভাব এখানে খাটে না। ইউভি সি খুব একটা পৃথিবীপৃষ্ঠে এসে পৌঁছয় না। সুতরাং সানস্ক্রিনের যাবতীয় প্রয়োজনীয়তা ইউভি এ-র ক্ষতিকর প্রভাব আটকে দেওয়ার জন্যই। সানস্ক্রিনের সুরক্ষা না থাকলে দিনের পর দিন উন্মুক্ত ত্বকে সূর্যের ইউভি এ এসে পড়লে তা ত্বককে অকালবার্ধক্যের দিকে ঠেলে দেয়, চামড়া পুড়ে ট্যান হয়ে যাওয়ার সঙ্গে দ্রুত বুড়িয়েও যাবে। কোনও কোনও ব্যক্তির ত্বক অতি স্পর্শকাতর, তাঁদের ক্ষেত্রে সূর্যের আলোর এই ইউভি এ থেকে অ্যালার্জি হতে পারে। স্পর্শকাতর ত্বক নিয়ে খররোদে কোনওরকম প্রতিরোধ ছাড়া বছরের পর বছর কাজ করলে ও ত্বকের নানা জটিল অসুখও দেখা দেয়। তাই সানস্ক্রিন সকলের জন্য প্রয়োজন। এমনকী, শিশুদের জন্যও।
এসপিএফ-এর দ্বন্দ্ব
সান প্রিভেন্টিং ফ্যাক্টর (এসপিএফ) বিষয়টিই দাঁড়িয়ে আছে ইউভি বি-র উপর। কাজেই ভরতীয় ত্বকে আলাদা করে এসপিএফ-এর খুব ভূমিকা আছে এমন নয়। অনেকেই সানস্ক্রিন কেনার সময় মনে করেন, বেশি মূল্য দিয়ে অধিক এসপিএফ কিনলে তবেই বোধহয় অতিবেগুনি রশ্মিকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। আদপে বিষয়টি তেমন নয়। সাধারণত, ভারতীয়দের ত্বকের জন্য ১৫-৩০ এসপিএফ যথেষ্ট। ইউভি এ-র জন্য বরং পিএ ফ্যাক্টরে কতগুলি তারাচিহ্ন বা স্টার মার্ক আছে, সেটা দেখে নেওয়া উচিত। পিএ ফ্যাক্টরের স্টার মার্কিং বেশি হলে তা ভারতীয় ত্বকের জন্য বেশি ভালো।
কখন ব্যবহার?
সাধারণত, বাইরে বেরনোর ১০-১৫ মিনিট আগে সকলে সানস্ক্রিন ব্যবহার করেন। কিন্তু শুধু বেরনোর আগে মাখা ঠিক নয়। বরং বাইরে না বেরলেও, দিনের আলোয় বা মেঘলা দিনে বাড়ির ভিতর থাকলেও সানস্ক্রিন মাখতে হবে। দরজা-জানালা বন্ধ করে এসি চালিয়ে কাজ করলেও প্রতি তিন ঘণ্টা অন্তর ব্যবহার করতে হবে এই উপাদান। শুধু সূর্যের আলো নয়, ল্যাপটপ ও কম্পিউটারের ব্লু রে-তেও ইউভিএ থাকে। সেখান থেকেও ত্বকে অকালবার্ধক্য দেখা দিতে পারে, ট্যান হতে পারে। তাই অফিসে কাজ করলেও এই ক্রিম ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক। দিনের বেলা কোথাও মেকআপ করে বেরনোর থাকলেও মেকআপের বেস হিসেবে এই ক্রিম লাগিয়ে নিন। সাধারণত একবার সানস্ক্রিন ব্যবহার করলে তার প্রভাব দু’-আড়াই ঘণ্টা পর্যন্ত থাকে। তাই প্রতি তিন ঘণ্টা অন্তর এই ক্রিম ব্যবহার না করলে কোনও উপকার নেই। অনেকে ঘামের ভয়ে সানস্ক্রিন পাউডার ব্যবহার করেন, সেটিও নিরাপদ। কিন্তু সানস্ক্রিন ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল বলে আদৌ কিছু হয় না। এটি কেবল বিজ্ঞাপনী চমক ছাড়া আর কিছুই নয়!
ঘাম এড়াব কী করে?
সানস্ক্রিনে ঘাম হয়, এ তথ্য মেনে নিলেন চিকিৎসকও। তবে তাঁর মতে, ‘তেলতেলে ত্বক হলে ম্যাট সানস্ক্রিন জেল ব্যবহার করুন, শুষ্ক ত্বক হলে জেল বা ক্রিম বেসড সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে হবে। বেরনোর মিনিট ১৫ আগে হাতের তালুতে বেশ ভালো পরিমাণে সানস্ক্রিন নিয়ে শরীরের অনাবৃত অংশে ভালো করে মাসাজ করে মাখতে হবে। এতে ত্বকের ভিতর প্রবেশ করবে ক্রিম। খুব বেশি ঘাম হলে ত্বক বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে মেডিকেটেড সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে হবে।’
মনীষা মুখোপাধ্যায়