Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

এসআইআর বিজেপির ব্যুমেরাং হবে না তো!

ভোটার তালিকা বিনে বঙ্গ বিজেপির মুখে আর কোনও গীত নেই! ভাবটা এমন এসআইআর সম্পন্ন হলে সংগঠন লাগবে না, যোগ্য প্রার্থীর প্রয়োজন হবে না, অনুগামী-সমর্থকেরও দরকার নেই, বাংলা দখল হয়ে যাবে অনায়াসে।

এসআইআর বিজেপির ব্যুমেরাং হবে না তো!
  • ২৬ অক্টোবর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

হিমাংশু সিংহ: ভোটার তালিকা বিনে বঙ্গ বিজেপির মুখে আর কোনও গীত নেই! ভাবটা এমন এসআইআর সম্পন্ন হলে সংগঠন লাগবে না, যোগ্য প্রার্থীর প্রয়োজন হবে না, অনুগামী-সমর্থকেরও দরকার নেই, বাংলা দখল হয়ে যাবে অনায়াসে। ফি বছর বসন্তের মতো ভোট পরব এলেই মোদি-অমিত শাহের ঝাঁ চকচকে ধুলো ওড়ানো কপ্টার নামার হেলিপ্যাড খুঁজতে হন্যে হতে হবে না জেলায় জেলায়। এসআইআর ম্যাজিকই আপাতত গদি দখলের মেড ইজি বঙ্গ দলের! দলের কেউ হুঙ্কার ছাড়ছেন, সাড়ে ৭ কোটির তালিকা থেকে ৯০ লাখ নাম বাদ যাবে। কেউ বলছেন কোটি ছাড়িয়ে যাবে সংখ্যাটা। একটি বিশেষ সম্প্রদায়কে টার্গেট করে প্ররোচনারও অন্ত নেই। যেন নির্বাচন কমিশন নয়, এসআইআর করার দায়িত্বে বঙ্গ বিজেপির কেষ্টবিষ্টুরাই। বিজ্ঞপ্তি জারির আগেই বাছাই করা সীমান্ত জেলায় একটা ত্রাসের পরিবেশ তৈরির চেষ্টা চলছে সংখ্যালঘুদের জন্য। এর সঙ্গেই যুক্ত হচ্ছে সিএএ শিবির। রাজ্য সভাপতি বদল করতে লেগেছে ৮ মাস, শেষে একজনকে কোনওরকমে খাড়া করা হয়েছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হস্তক্ষেপে। রাজ্য কমিটি এখনও বিশবাঁও জলে। ওসবে মন না দিয়ে জেলায় জেলায় ৭০ হাজার নাগরিকত্ব প্রদান থুড়ি সিএএ ক্যাম্প বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে গেরুয়া সংগঠন। উদ্দেশ্য একটাই, প্রথমে নাম বাদ দেওয়ার ভয় দেখাও এবং তারপর নাগরিকত্বের টোপ দিয়ে উদ্বেগ কাটাও। বাজারি বাংলায় যাকে বলে ‘রাবড়ি প্রসেস’। শেষে ঠান্ডা আঁচে নামিয়ে ক্ষমতা দখলের নিটোল কিস্‌সা পোড়খাওয়া অমিতজির! এরপর এসআইআরকে শুধু একটি নিছকই প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বলবেন, না চক্রান্ত! কত নাম বাদ যাবে তা বিজেপি নেতারা আগাম হাঁকছেন কোন আক্কেলে! বিজেপি আর নির্বাচন কমিশন মোদি জমানায় সমার্থক না একে অন্যের পরিপূরক? অপদার্থ বঙ্গ বিজেপির এসআইআর আহ্লাদে কিন্তু ক্রমেই তীব্র হচ্ছে সন্দেহটা।

Advertisement

ইতিমধ্যেই বিহারে ৬৮ লাখ বাদ দিয়ে ২১ লাখ নতুন নাম সংযুক্ত হয়েছে তালিকায়। ৭ কোটি ৮৯ লাখ থেকে কমে ৭ কোটি ৪২ লক্ষ দাঁড়িয়েছে মোট ভোটার সংখ্যা। এতকিছু করেও বিহারে কি খুব স্বস্তিতে আছে বিজেপি? না, সকাল সন্ধে ক্ষমতা হারানোর ভয় পাচ্ছে এনডিএ। একটা বিষয় প্রায় নিশ্চিত, এবারও ফল হবে ত্রিশঙ্কু। নীতীশের জেডিইউয়ের আসন অনেকটা কমবে, পাল্লা ভারী লালু-পুত্র তেজস্বীরই। এই অবস্থায় ক্ষমতা ধরে রাখা বেশ কঠিন বুঝেই আগাম মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করা থেকে বিরত থাকছেন মোদি-অমিত শাহরা। টানা দু’দশকের মুখ্যমন্ত্রীর নাম নিতেও এত অস্বস্তি কীসের? কোনও বিপদ সংকেত। বিজেপি তাঁকে আবার মুখ্যমন্ত্রী করতে না পারলে সুযোগসন্ধানী নীতীশ পাল তুলে আবার যে ইন্ডিয়া জোটেই নাম লেখাবেন তাতে বিশেষ সন্দেহ নেই। আর বাংলায়? দু’হাত ভরা সরকার বিরোধী ইশ্যু কিন্তু বিরোধীরা তবু আত্মবিশ্বাসী নন। একুশের ভোটের মতো নতুন করে বড়ো একটা কেউ আর ‘দলবদলু’ হতে আগ্রহী নন। উল্টে উত্তরবঙ্গেও পদ্মশিবির ভাঙছে, এতকিছুর পরও রাজ্যজুড়ে তৃণমূলে ঘর ওয়াপসির পালে হাওয়া। পাঁচ বছর আগের মতো এজেন্সি দিয়ে ভয় দেখানো এবং পদ্ম শিবিরে লোক টানার দিন শেষ। একই অস্ত্র বারবার প্রয়োগ করলে কাঙ্ক্ষিত ফল মেলে না। ঘটা করে সদস্য সংগ্রহ অভিযানও ডাহা ফ্লপ। অতঃপর ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া এবং নাগরিকত্বের খুড়োর কল ঝুলিয়ে ভোট বৈতরণী পার করার কৌশলকে সামনে রেখেই এগোতে চাইছে বাইরে থেকে আসা সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত পদাধিকারী বিএল সন্তোষ, সুনীল বনসল এবং অমিত মালব্যরা। এই বহিরাগত থিঙ্কট্যাঙ্ক এবং আগমার্কা দলবদলু এবং মেরুকরণ বাদ দিলে এ রাজ্যে বিজেপি আজও আঁতুড়ঘরে। এত কাঠখড় পুড়িয়ে যিনি সভাপতির আসনে বসেছেন, তাঁর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কতটুকু! পুরোনো বসে যাওয়াদের ফেরানোর চেয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতাই বরং তাঁর নিরাপদ আশ্রয়। একুশের তুলনায় বঙ্গ বিজেপিতে অনৈক্য এবং নেতৃত্বের মধ্যে রেষারেষি আরও চরমে। দলের সবচেয়ে সফল রাজ্য সভাপতি অজ্ঞাত কারণে কোনও অনুষ্ঠানে ডাক পান না। ব্রাত্য দিলীপ ঘোষের সবচেয়ে বড় অপরাধ বোধহয় তিনি তৃণমূল থেকে কোনও ধান্দায় বিজেপিতে যোগ দেননি, আগাগোড়া সংঘ পরিবারের বিশ্বস্ত সৈনিকই থেকে গিয়েছেন!
নির্বাচনের ৬ মাস আগে সংগঠন কতটা তৈরি, লক্ষাধিক বুথের সর্বত্র প্রয়োজনীয় লোকলস্কর আছে কি না সেদিকে খুব নজর আছে বলে মনে হচ্ছে না। রাজ্যের সমস্ত ব্লকে দলবদলুদের বাদ দিয়ে নিজ ক্ষমতায় বঙ্গ বিজেপির পক্ষে সকাল সন্ধে মিটিং মিছিল করার সাংগঠনিক শক্তি কতটা তৈরি, ভোটের সকালে রাস্তায় সর্বত্র দলের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি চোখে পড়বে কি না, সেদিকে নজর দেওয়ার বদলে একটাই লক্ষ্য ভোটার তালিকাটা কেটে গোলপোস্টটাকেই পকেটে পুরে নাও। ব্যাস অতঃপর ইচ্ছেমতো গোল দাও। কেন্দ্রে ক্ষমতায় থাকার সুবাদে মাঠের ভিতরে ও বাইরে বাঁশি বাজানোর লোক তো মজুতই আছে, অমিত শাহদের একান্ত অনুগত ও বিশ্বস্ত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। কয়েক হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং অমিত শাহের বশংবদ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। এখন থেকেই ৩৫৫ কিংবা ৩৫৬ জারির হুমকিও জারি রয়েছে সমানে। বিহারে দু’দফায় ২৪৩ আসনে নির্বাচন হচ্ছে, বাংলায় দশ কিংবা তারও বেশি দফায় ভোট এবারও নিশ্চিত। যদি ওলিম্পিক্স প্রতিযোগিতার আগে কোনও কুস্তিগীর নিজেকে তৈরি রাখার বদলে বিপক্ষের স্বাস্থ্যহানির ফন্দি আঁটেন এবং প্রতিযোগিতা শুরু হতেই প্রতিদ্বন্দ্বীকে নানা মতলবে ডিসকোয়ালিফাই করে জয়ের খোয়াব দেখেন তাহলে বলতেই হবে পুরো প্রক্রিয়াটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, বাংলার ভোটের আগে এসআইআর স্রেফ একটি প্রক্রিয়া না চক্রান্ত। কারণ রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল জেলায় জেলায় প্রায় অস্তিত্বহীন সংগঠনকে ঢেলে সাজার বদলে ক্রমাগত তাঁদের কাজকর্মকে ভোটার তালিকার সংশোধনে সীমাবদ্ধ করে তুলছে। এর একটাই কারণ সংগঠন ঘুমিয়ে। কিছুতেই তাকে জাগানো যাচ্ছে না। কেউ ভোটার তালিকা সংশোধনের বিরোধী নন। তালিকায় মৃত ভোটারের নাম থাকুক তাও কেউ চায় না। একইসঙ্গে দু’জায়গায় যাঁদের নাম আছে তাও বর্জনীয়। কিন্তু একুশে কেন্দ্রীয় এজেন্সি নামিয়ে এবং দলভাঙার পরও যেমন তৃণমূলকে পর্যুদস্ত করা দূরে থাক গায়ে একটা আঁচড় কাটাও হয়নি, এবারও যদি পরিণাম তাই হয়, তখন কী বলবেন, এসআইআর ফ্লপ!
ইতিমধ্যেই সিংহভাগ জেলায় ভোটার তালিকার ম্যাপিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে মাত্র ৫৪ শতাংশ মিল পাওয়া যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি মিল পাওয়া গিয়েছে পূর্ব মেদিনীপুরে ৬৮ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম মিল পাওয়া গিয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা ( ৪২ শতাংশ), পশ্চিম বর্ধমান ৪০ শতাংশ, নদিয়া ৫২ শতাংশ এবং  দক্ষিণ ২৪ পরগনা ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ বহু জেলাতেই অর্ধেক ভোটারকে নাম ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় কাগজ দেখাতে হবে। প্রক্রিয়াটা খুব সহজ নয়। আর যদি গোটা তালিকাটাই ভুলে ভরা হবে তাহলে গত বছরের লোকসভা ভোটের ফলও তো ঠিক ছিল না। বিজেপি যে ২৪০ টি আসনে জেতার সুবাদে দিল্লিতে ছড়ি ঘোরাচ্ছে তাও তো সম্পূর্ণ মিথ্যের উপর দাঁড়িয়ে! কেন্দ্রে বিজেপির আসন যদি সেক্ষেত্রে ২৪০ থেকে আরও ৪০ টা কমে যেত! টানা তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়া স্বপ্নই থেকে যেত, মোদিজিরা কি মানবেন সেকথা। কিংবা দিল্লি ও মহারাষ্ট্রের বিধানসভা ভোটের ফল? রাহুল গান্ধীর যাবতীয় অভিযোগ খণ্ডন করার সময় ভোটার তালিকা একশো শতাংশ নির্ভুল আর বাংলায় ভোট এলেই তালিকাটাকেই আমূল বদলে দাও! এই দু’মুখো নীতি কতদিন চলবে? ঝোলা থেকে বেড়াল কিন্তু ক্রমেই বেরিয়ে পড়ছে।
বাংলার উৎসব মরশুম প্রায় শেষ। জগদ্ধাত্রী পুজো কাটলেই এসআইআর পার্বণের শুরু। রাজ্যে একটা সমান্তরাল রাজনৈতিক অর্থনীতি পরের ৬ মাস সচল থাকবে বলাই যায়। এটাকেই বলে নির্বাচনী অর্থনীতি। নেতাদের এক জেলা থেকে অন্যত্র চলাচল বেড়ে যায়। বিস্তর হেলিকপ্টার ওড়ে। সকাল বিকেল মঞ্চ বাঁধা হয়। সভা পিছু ডজন ডজন মাইক লাগে। লাইটওয়ালার পকেটে দু’পয়সা আসে। গাড়িভাড়া, দেওয়াল লেখা, ফেস্টুন ব্যানার টাঙানো তো আছেই। এর নামই ভোটযজ্ঞ। কিন্তু একুশের মতো এবারও বঙ্গ বিজেপির কর্তারা চোখে ঠুলি পরে বসে আছেন। দেখেশুনে মনে হচ্ছে, যা নাম বাদ যাবে সবই সংখ্যালঘুদের, একজনও বেআইনি হিন্দু অনুপ্রবেশকারী নেই! একাধিক বিজেপি বিধায়ক বলতে শুরু করেছেন, সীমান্ত জেলায় ইতিমধ্যেই এসআইআর বিরোধী একটা মনোভাব তৈরি হতে শুরু করেছে। লোকে বলছে, এরা একশো দিনের কাজ বন্ধ করেছে, আবাসের টাকা আসা লাটে তুলেছে। বাংলার আড়াই লক্ষ কোটি টাকা বকেয়া। এবার এক কোটি মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত করছে। এমন বাংলা ও বাঙালি বিরোধী দলকে রাজ্যে ক্ষমতায় আনবেন? গেরুয়া নেতাদের মনেই ক্রমে আশঙ্কা চেপে বসছে শেষে এসআইআর ব্যুমেরাং হয়ে একুশের অর্ধেক আসনে বিজেপিকে বেঁধে ফেলবে না তো!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ