এসআইআরের ইউনিউমারেশন ফর্ম যত্রতত্র বসে বিলির অভিযোগ উঠেছিল আগেই। সেক্ষেত্রে কঠোর পদক্ষেপই করেছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। তারা ডিআরওদের নির্দেশ দিয়েছে, বাড়ি বাড়ি গিয়েই ফর্ম বিলি করতে হবে বিএলওদের। এর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উঠল আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ, টাকার বিনিময়েও এসআইআর ফর্ম বিলি করা হচ্ছে! সরাসরি কমিশনের হেল্পলাইন নম্বরে ফোন করেই জানানো হয়েছে এই গুরুতর অভিযোগ। জলপাইগুড়ি থেকে পাওয়া অভিযোগের তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে বলেছে সিইও অফিস। শনিবার থেকেই বিএলওদের উপর নজরদারি চালাতে বিশেষ সেল গঠন করেছে তারা। চালু করা হয়েছে নতুন কন্ট্রোল রুম নম্বর। তাতে ফোন করে বিএলওদের কাজ নিয়ে অভিযোগ জানানো যাবে। এর পাশাপাশি সবধরনের মিডিয়াতেও নজরদারি চলবে কমিশনের। মিডিয়ায় প্রকাশিত/প্রচারিত খবরের ভিত্তিতেও সরাসরি বিএলওদের জবাব তলব করা হবে। রিপোর্ট চাওয়া হবে সংশ্লিষ্ট ইআরওর কাছেও। জলপাইগুড়ি বিধানসভা কেন্দ্রের একটি বুথে ফর্ম বিলি করার সময় কোনও কোনও ভোটারের কাছ থেকে ২০ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ভয়ানক বেআইনি কাজ নিয়ে ক্ষুব্ধ সিইও অফিস। কারণ প্রত্যেক ভোটারের ২ কপি ফর্ম সম্পূর্ণ বিনামূল্যেই প্রাপ্য। সেগুলি প্রত্যেক বিএলওকে সরবরাহও করা হয়েছে। জলপাইগুড়ির পাশাপাশি আরও একাধিক স্থান থেকে এমন অভিযোগ পেয়েছে সিইও অফিস। কর্তৃপক্ষ অবশ্য অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখছেন। প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণেরই আশ্বাস দিয়েছেন তাঁরা। এই পরিস্থিতিতে রাস্তায় এসআইআর ফর্ম বিলি করার অভিযোগও কমিশনের নজরে এসেছে। নির্দেশ উপেক্ষার নজির আছে আরও একাধিক। সব মিলিয়ে আটজন বিএলওকে শোকজ করেছে কমিশন। জবাব সন্তোষজনক না-হলে শাস্তিমূলক পদক্ষেপই যে করা হবে, তার ইঙ্গিত কমিশন দিয়েছে। তার ছাপ পড়তে পারে সরকারি কর্মীদের চাকরি জীবনে। হতে পারে পদাবনতি। কোপ পড়তে পারে বেতনে। এমনকি, চাকরি থেকে বহিষ্কারের মতো চূড়ান্ত সাজার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই প্রসঙ্গে বিহারে এসএইআর পর্বে শ-পাঁচেক বিএলওর বিরুদ্ধে বিভাগীয় পদক্ষেপের নজিরের উল্লেখ করা যেতে পারে।
এসআইআর ফর্ম অনলাইনে পূরণের সুবিধা চালু হয়েছে শনিবার থেকে। প্রথম দিনে ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে হোঁচট খেতে হয়েছে বহু মানুষকে। কমিশনের ভোটারস সার্ভিস পোর্টালে এপিক নম্বর বা ই-মেইল আইডি বা ফোন নম্বর দিয়ে লগইন করে কিছুটা এগোনোর পরেই থমকে যেতে হয়েছে অনেককে। কারণ, ভোটার কার্ড বা এপিকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ভোটারের ফোন নম্বর লিংক না-থাকলে অনলাইনে তা পূরণ করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে প্রথমে শুধুমাত্র ফোন নম্বর লিংক করার জন্য ফর্ম ৮ পূরণ করতে হবে। সিইও অফিস জানাচ্ছে, সেই আবেদন অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই মঞ্জুর হয়ে যাবে। তারপর অনলাইনে পূরণ করা যাবে ইউনিউমারেশন বা গণনা ফর্ম। আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, অনলাইনে ফর্ম পূরণের ক্ষেত্রে আধারের সঙ্গে মোবাইল নম্বর সংযুক্ত থাকাও বাধ্যতামূলক। আর একটি শর্ত হল, এক্ষেত্রে আধার এবং ভোটার কার্ডে নামের বানানে কোনও পার্থক্য থাকা চলবে না। এই বিষয়গুলি ঠিকঠাক থাকলে কয়েক মিনিটেই অনলাইনে ফর্ম পূরণ সেরে ফেলা যাবে। প্রদত্ত তথ্যাদি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে যাচাই করার পরই সম্পূর্ণ হবে গোটা প্রক্রিয়া।
এদিকে, গণনা ফর্ম বিলি শুরু হয়েছে ৪ নভেম্বর। এই পর্ব শেষ করতে হবে আগামী ১১ তারিখ। কিন্তু এখনও সকলের হাতে ফর্ম পৌঁছায়নি। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন হওয়া কঠিন বলেই মনে করছেন বহু বিএলও। কারণ, বহু ভোটারের ফর্মই এখনও তাঁদের কাছে পৌঁছায়নি। বহু বাড়িতে মাত্র একাংশ সদস্যের ফর্ম পৌঁছেছে। বাকিরা কবে পাবেন বিএলওরা জানাতেই পারছেন না। ফলে উৎকণ্ঠায় ভুগছেন বহু ভোটার। স্বভাবতই ফর্ম বিলির সময়সীমা বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়েছে সিইওর কাছে। এরপর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ-পরবর্তী ঝামেলার জন্যও বহু মানুষকে তৈরি থাকতে হবে। দেশবাসীর অবস্থা ঘরপোড়া গোরুর মতোই। কারণ নির্ভুল ভোটার এবং আধার কার্ড সকলের নেই। ওই দুই নথিতে বহু ব্যক্তিরই নাম, পদবি ও ঠিকানায় অমিল রয়েছে। এমন ভুল নাগরিকের নয়, ক্লারিকাল ভুলের জন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলি। বারবার সংশোধনের আবেদন করেও সকলে সুরাহা পাননি। অথচ তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং পরিবারকে বয়ে বেড়াতে হয় বছরের পর বছর। তারই মধ্যে চাপিয়ে দেওয়া হল আজকের এসআইআর আতঙ্ক। এই উদ্দেশ্য সৎ কী অসৎ—এসম্পর্কে শেষকথা বলার সময় এখনও আসেনি। তবে এটা এখনই হলফ করে বলে দেওয়া যায় যে, এসআইআর ধুয়োয় বহু নির্দোষ মানুষকে আগামী দিনে বেশ ভুগতে হবে।