তন্ময় মল্লিক: বাংলায় শুরু হয়ে গেল বহু চর্চিত এসআইআর। নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি বিএলও বাড়িতে গিয়ে তুলে দিচ্ছেন ইনিউমারেশন ফর্ম। বিএলও-র কাজ দেখার জন্য থাকছেন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি বিএলএ। উদ্দেশ্য, ভোটার তালিকা তৈরিতে স্বচ্ছতা বজায় রাখা। কিন্তু, অধিকাংশ বুথেই বিরোধী দলের বিএলএ থাকছেন না। তাতে প্রকট হচ্ছে বিরোধী দলগুলির সংগঠনের কঙ্কালসার চেহারা। তাকে ঢাকতে কখনও তোলা হচ্ছে বিএলও-র বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ, কখনও হাতিয়ার সন্ত্রাস। অনেকে বলছেন, মিশন-২০২৬ মুখ থুবড়ে পড়ার অজুহাতটা এখন থেকেই তৈরি করে রাখছে।
এই মুহূর্তে বাংলায় সমস্ত ইশ্যুকে পিছনে ফেলে দিয়ে এক নম্বরে এসআইআর। চায়ের দোকানে, পাড়ার মোড়ে, কলোনি, মহল্লায় একটাই আলোচনা, ভোটার তালিকায় নাম থাকবে তো? ফের দেশছাড়া হতে হবে নাকি! এই ভয় টুঁটি টিপে ধরেছে সীমান্তবর্তী জেলার বাসিন্দাদের। তবে, সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে ভুগছেন মতুয়ারা। তাঁরা বিজেপির নাগরিকত্ব দেওয়ার আশ্বাসের উপর ভরসা করে বসেছিলেন। ভেবেছিলেন, কেন্দ্রের ক্ষমতায় বিজেপি থাকলে তাঁদের নিঃশর্ত নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। সেই আশাতেই প্রতিটি নির্বাচনে তাঁরা বিজেপিকে ঢেলে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এসআইআর শুরু হতেই ভঙ্গ হয়েছে সেই স্বপ্ন। তাঁরা বুঝতে পারছেন, নাগরিকত্ব ছিল বিজেপির ভোট নেওয়ার ‘গাজর’।
২০১৪ সাল পর্যন্ত যে সমস্ত হিন্দু এদেশে এসেছেন তাঁদের নাগরিকত্ব পেতে সমস্যা হবে না, এটাই ছিল বিজেপির আশ্বাস। হয়েছে সিএএ আইন। বিজেপি বলেছে, একজন হিন্দুকেও দেশছাড়া হতে হবে না। কিন্তু এসআইআর শুরু হতেই বুঝতে পারছেন, নাগরিকত্ব দেওয়ার সালটা ২০০২। ২০০২ সালের ভোটার তালিকা ধরেই শুরু হয়েছে ‘ম্যাপিং’। তাতে দেখা যাচ্ছে, উত্তরবঙ্গ সহ দক্ষিণবঙ্গের সীমান্তবর্তী অধিকাংশ জেলার ৫০ শতাংশ ভোটারের নাম ম্যাপিংয়ের বাইরে রয়েছে। অর্থাৎ তাঁদের প্রমাণ করতে হবে, তাঁরা ভারতীয়। তাতেই ঘুম ছুটেছে বাংলাদেশ থেকে আসা লোকজনের। তাঁরা ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য নেতাদের ও প্রশাসনের দরজায় দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দিয়েছেন। তাঁরা ভোটার হবেন কি না, সেটা বড় কথা নয়। তাঁরা জানতে চান, নাম বাদ গেলে দেশে থাকতে পারবেন কি না!
শুধু বাংলাদেশ থেকে আসা লোকজনেরই নয়, সীমান্ত এলাকার বিজেপি নেতাদেরও ঘুম কেড়ে নিয়েছে এসআইআর। নেতারা বুঝতে পারছেন, এসআইআর ইশ্যুতে মানুষ বিজেপির উপর চটে রয়েছে। ভোটব্যাংকে ধস নামার আশঙ্কা প্রবল। তাই সীমান্ত এলাকায় তাঁরা ক্যাম্প খুলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। দিনভর মাইকিং চলছে, ‘ভোটার তালিকায় নাম না উঠলেও আতঙ্কিত হবেন না।’ কিন্তু নেতাদের আশ্বাসে চিঁড়ে ভিজছে না।
নদীয়া জেলার ধানতলা থানার কামালপুর পঞ্চায়েত বিজেপির আঁতুড়ঘর বলেই পরিচিত। এলাকার অধিকাংশ মানুষই বাংলাদেশ থেকে এসেছেন। কেউ এসেছেন ৪০ বছর আগে, কেউ এসেছেন ১০ বছর আগে। আবার কেউ এসেছেন হাসিনা সরকারের পতনের পর। এই পঞ্চায়েত এলাকাতেই বিজেপির বিধায়ক অসীম বিশ্বাসের বাড়ি। সেখানেও ক্যাম্প খোলা হয়েছে। দু’চারজন লোক যাচ্ছেন বটে, কিন্তু ভরসা পাচ্ছেন না। তাঁরাও জানেন, কমিশনের দেওয়া ১১টি শর্তের অন্তত একটি পূরণ করতে হবে। সেটা না করলে ভোটার হওয়া যাবে না। আর নাম কাটা গেলে যেতে হতে পারে ডিটেনশন ক্যাম্পে। সেই আতঙ্কেই মানুষ একবার এই নেতা, আর একবার ওই নেতার কাছে ছুটছে।
কামালপুর পঞ্চায়েতের দৌলা বটতলায় পিনাকী বিশ্বাসের বাড়ি। এলাকার বিজেপির প্রথম সারির নেতা ছিলেন। সেই পিনাকীবাবুই বিজেপির ‘দ্বিচারিতা’য় চটে লাল। তিনি বলেন, ‘একসময় আমরাই লোকজনকে বোঝাতাম, বিজেপি থাকলে হিন্দুদের চিন্তা নেই। মানুষ আমাদের কথা বিশ্বাস করেছিল। বিজেপিকে ভোটও দিয়েছে। কিন্তু এখন দেখছি, সবাইকেই নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে হবে। আর একবার নিজেকে বাংলাদেশি দাবি করে নাগরিকত্ব চাইলে আরও বিপদ। এরপর সরকার যখন বদলাবে তখন কী হবে? সেই সরকার এই নাগরিকত্ব নাও মানতে পারে। তখন এই আবেদনপত্রকেই অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর প্রমাণ হিসেবে ধরবে না, তার গ্যারান্টি কে দেবে? দিন যত যাচ্ছে মানুষের মনে এই সব প্রশ্ন উঠছে। তাই কাজকর্ম লাটে তুলে দিয়ে কেউ টাকা দিয়ে, কেউ নেতা ধরে বার্থ সার্টিফিকেট জোগাড় করছেন। তাতে যে বিপদ আরও বাড়ছে, সেটা অনেকেই বুঝতে পারছেন না।’
সব সীমান্তবর্তী এলাকায় উৎকণ্ঠার একই ছবি। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁ মহকুমার এক বিজেপি নেতার সরল স্বীকারোক্তি, ‘এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে ছাব্বিশের লড়াই কঠিন হবে।’ তবে তাঁর বিশ্বাস, অবস্থার পরিবর্তন হবেই। মাস দু’য়েকের মধ্যেই একটা মিরাকেল কিছু ঘটবে। আর তখনই হাওয়া পুরো ঘুরে যাবে। কথাটা মিলিয়ে নেবেন।’
অনেকে বলছেন, মানুষ খাদের কিনারায় পৌঁছে গেলে মিরাকেলের আশাতেই থাকে। প্রিয়জনের অন্তিম সময়েও মানুষ মিরাকেল কিছু ঘটার আশা করে। টাইটানিকের মতো জাহাজ যখন ডুবতে বসেছিল তখনও তার যাত্রীরা মিরাকেলের আশাতেই ছিলেন। কিন্তু পরিণতি সকলেরই জানা। বঙ্গ বিজেপি এখন দাঁড়িয়ে আছে তেমনই এক জায়গায়। ওদের মিরাকেলের আশায় থাকা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।
গেরুয়া শিবিরের অনেকে এই অবস্থার জন্য বঙ্গ বিজেপির কিছু নেতার লম্ফঝম্ফকেই দায়ী করছেন। তাঁদের বক্তব্য, এসআইআর একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। নির্বাচন কমিশন নিয়ম মেনে ভোটার তালিকা সংশোধন করে। তাকে রাজনৈতিক ইশ্যু বানাতে যাওয়ায় বিপদ বাড়ল। এক কোটি ভোটারের নাম বাদ যাবে, নেতাদের এই হুঙ্কারে দলের লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে। কারণ ভোটার হতে গেলে কমিশনের শর্ত পূরণ করতেই হবে। না পারলে নাম বাদ যাবে। যাঁদের নাম বাদ যাবে তাঁরাই বিজেপির প্রতিপক্ষ হয়ে যাবেন।
এখন প্রশ্নটা হচ্ছে, এক কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার হুঙ্কার কি শুধুই কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য, নাকি পিছনে ছিল অন্য কোনও অঙ্ক! অনেকে বলছেন, অঙ্ক কষেই বিজেপি নেতৃত্ব এই হুঙ্কার দিয়েছিল। কী সেই অঙ্ক? একুশের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের সঙ্গে বিজেপির ভোটের ফারাক ছিল প্রায় ৬০ লক্ষের মতো। এসআইআর করে এক কোটি সংখ্যালঘু ভোটারদের নাম কাটিয়ে দিলেই হবে কিস্তি মাত। বিজেপি ড্যাং ড্যাং করে জিতে যাবে। এই কথাটা বিজেপির কর্মী-সমর্থকদের মাথায় ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছিল বঙ্গ বিজেপির একাংশ। সেই উদ্দেশ্যে এসআইআর শুরুর অনেক আগেই রাজ্যে এক কোটি বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গার নাম ভোটার তালিকায় আছে বলে প্রচার করেছিল। নেতৃত্ব মনে করেছিল, এটাই হবে দলীয় কর্মীদের হতাশা কাটানোর মোক্ষম ‘টনিক’। কিন্তু, হচ্ছে উল্টো। কারণ নাম কাটানোর দায় গিয়ে চাপছে বিজেপির উপর।
এসআইআর করে রাজ্যের কত ভোটারের নাম বাদ যাবে, তা জানা যাবে ছাব্বিশ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। ওই দিনই চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু তার আগে এ রাজ্যে অনেক কিছু ঘটবে। বিএলও-দের পক্ষপাতিত্ব, বিএলএদের উপর হামলা নিয়ে চাপানউতোরে রাজনীতির বাজার গরম হবে। নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক আসবেন। তাঁর কাছে নালিশ করা হবে। তোলা হবে রাষ্ট্রপতি শাসনে ভোট করার দাবি। তবে, আসল খেলা শুরু ৯ ডিসেম্বর। চলবে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ওই সময়ের মধ্যে জমা পড়া আবেদনপত্র নিয়ে হবে শুনানি। বিভিন্ন অজুহাতে বাতিল করা হবে আবেদনপত্র। তখনই স্পষ্ট হবে, পায়ের মাপে জুতো হল, নাকি জুতোর মাপে পা তৈরি করা হচ্ছে।
তবে শুধু নাম বাতিলই নয়, এসআইআর-এর আর একটা দিক রয়েছে। এই মুহূর্তে সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনের কর্মী থেকে কর্তা সকলেই চরম ব্যস্ত। এসআইআর ছাড়া কেউ কোনও কথা শুনতে চাইছেন না। থমকে যাচ্ছে উন্নয়নের কাজ। অথচ প্রতি বছর বর্ষার পরই শুরু হয় কাজ। সেই সময়টাকেই ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। তালিকা চূড়ান্ত হলেই ঘোষণা হবে নির্বাচনের দিনক্ষণ। লাগু হবে ‘মডেল কোড অব কন্ডাক্ট’। তখন নতুন কোনও কাজ করা যাবে না। তাই উঠছে প্রশ্ন, নির্বাচনের মুখে এসআইআর অজুহাতে প্রশাসনকে ব্যস্ত রাখাটা বাংলাকে পিছিয়ে দেওয়ার আর এক কৌশল নয় তো?