অশোক মজুমদার: রাগে গা রি রি করছে। মনে হচ্ছে মহামান্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে হাতজোড় করে বলি আমাদের ভালো করার এই মহান দায়িত্ব পালন থেকে মানুষকে মুক্তি দিন। যে রাষ্ট্রযন্ত্র তার কর্মীদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, সেই যন্ত্রের সামাজিক প্রয়োজনীয়তা শূন্য।
অশোক মজুমদার: রাগে গা রি রি করছে। মনে হচ্ছে মহামান্য রাষ্ট্রযন্ত্রকে হাতজোড় করে বলি আমাদের ভালো করার এই মহান দায়িত্ব পালন থেকে মানুষকে মুক্তি দিন। যে রাষ্ট্রযন্ত্র তার কর্মীদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়, সেই যন্ত্রের সামাজিক প্রয়োজনীয়তা শূন্য।
হ্যাঁ শূন্য। রিঙ্কু তরফদারের এই মৃত্যু রাষ্ট্রের মৃত্যু। এটা লজ্জার যে, একটা সামান্য সরকারি ডিউটির চাপে একজন শিক্ষিকা আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
ভরা সংসারের চিন্তা করতে করতে একজন মা, একজন স্ত্রী, একটি মেয়ে ঝুলে পরলো সিলিং থেকে যে চিঠিটি লিখে সেই চিঠির দায় কে নেবে?
বাহ্! কী মহান আপনাদের মানুষের জন্য ভালো কাজের এই ডিউটি। এই ভালো কাজের বলি এর আগেও দুজন হয়েছেন। তাঁরাও চাপে ছিলেন। শরীর অসুস্থ হয়ে মারা যান। কাগজ দেখানোর আতঙ্কে সাধারণ মানুষ মারা গিয়েছেন, এখনও অবধি আঠাশজন।
কী এই SIR? খায় না মাথায় দেয়? কেন চারদিকে এটা নিয়ে একটা জুজুর মতো ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে? এ থাকবে, ও বাদ যাবে, ডিটেনশন ক্যাম্প, বাংলাদেশে পাঠানো ইত্যাদি— এই চলছে।
কারা করছে এসব ? বিরোধী দল বিজেপি ও মিডিয়া। আজব অদ্ভুত এই দুই কম্বোর সান্ধ্য আসর। আলোচনা শুনলে মনে ধারণা হবে যেন ওঁত পেতে বসে আছে যে SIR, তার প্রথম লিস্ট বেরলেই ছোটোবেলার ছেলেধরার গুজবের মতো রোহিঙ্গা ধরা পরবে টপাটপ। আর তাহলেই কেল্লা ফতে।
ঘটনা হচ্ছে, বাংলার ভৌগোলিক অবস্থান অনুপ্রবেশের অনুকূল এটা কোন গর্ধব জানে না বা বোঝে না? এ তো আমি জন্ম থেকে শুনে আসছি। আমার মা ওপার বাংলার মানুষ। সেই দেশভাগের সময় চলে আসে। জীবিতকাল অবধি বাংলাদেশকে পাকিস্তান বলত।
সেই মা গল্প করত একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় ওপার থেকে বর্ডার ঘেঁষা এলাকায় এত মানুষ এসেছিল যে, একটু মাথা মাথা গুঁজতে লোকের বাথরুমের ছাদে অবধি আশ্রয় নিয়েছিল। একসময়ের ফাঁকা বর্ডার পার করে নিত্য যাতায়াত, বাজারহাট, ঘোরাফেরা চলতো, এ তো আমিই নিজে দেখেছি। এমনকি কাগজে কাজ করার সময়ও মাত্র তিনশো টাকার বিনিময়ে ওপার থেকে সারাদিন ঘুরে ফিরে বিকেলে এপারে ছেড়ে দেবার কত লোককে দেখেছি।
এরপর আন্তর্জাতিক সীমান্তরক্ষার প্রয়োজনে ধীরে ধীরে কাঁটাতার দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু তারপরও অনুপ্রবেশ হয়েছে। কারণ এটা সর্বজনবিদিত যে, আশি নব্বইয়ের দশকে সিপিএমই তাদের ভোটব্যাংক বাড়াতে ঢালাও অবৈধ অনুপ্রবেশ করিয়েছে। তাদের ভোটার কার্ড, রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করেছে। এটা নিয়ে তো খোদ তৃণমূল নেত্রী তথা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ই সংসদে সরব ছিলেন। আজও তো তিনি চাইছেন এটা হোক। কিন্তু বৈধ ভোটার যেন বাদ না পরে এবং এত গুরুত্বপূর্ণ কাজ, যার সঙ্গে মানুষের নাগরিক পরিচয় জড়িয়ে আছে সেটা সময় নিয়ে করা হোক।
কী ভুল বলেছেন তিনি? যে রাজ্যের অনুপ্রবেশ একটা দীর্ঘকালীন সমস্যা, সেই রাজ্যে একাজ করার সময়সীমা মাত্র একমাস! আর দায়িত্বভার যাঁদের দেওয়া হয়েছে তাঁদের অনেকেই কম্পিউটার, মোবাইল সিস্টেমে সড়োগড়ো নন।
না হতেই পারেন তাঁরা। এটা তাঁদের অপরাধ নয়। যখন প্রথম কম্পিউটার ই-মেল এসব অফিসে ব্যবহার করা শুরু হল, আমার নিজেরই লেজেগোবরে অবস্থা হয়েছিল। এর ওর ঘাড়ে দায়িত্ব দিয়ে রীতিমত পালাতাম। তারপর ধীরে ধীরে অভ্যস্থ হয়েছি। আজও যে ফটাফট সব পারি তা মোটেও নয়।
সেরকমই এই রিঙ্কুও ছিলেন। তিনিও অভ্যস্থ ছিলেন না ডাটা এন্ট্রির মতো কাজের সঙ্গে। নাই জানতে পারেন। তাতে তাঁকে মরে যেতে হবে কেন? তিনি তো অব্যাহতি চেয়েছিলেন এই দায়িত্ব থেকে; তারপরও কেন তাঁকে ভরসা জোগানো হয়নি? কেন তাঁকে শিখিয়ে দেওয়া হয়নি? তিনি কেন পুলিশের ভয় পাবেন? অব্যাহতি দিতে পারেননি বলে তাঁকে পৃথিবী থেকে অব্যাহতি নিতেই বাধ্য করলেন?
এত তাড়ার কি খুব প্রয়োজন ছিল? নাহয় কিছু অবৈধ মানুষ আছে। তাদের চিহ্নিতকরণ একমাসের বদলে ছমাসে করলে কি তারা জাদুবলে বৈধ হয়ে যেত?
সরকারের সিস্টেমের এই অমানবিক মুখ একটি সাধারণ পরিবারকে যে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিল এর বিচার কে করবে? আপনাদেরও তো পরিবার পরিজন আছে, এই চিঠিটা পড়ে একবার তাদের মুখটা ভাবুন তো? কতটা অসহায় হয়ে একটা সাধারণ ঘর-সংসার আগলে রাখা একটি মেয়ে মৃত্যুর আগে অবধি তার প্রিয়জনের ভালো থাকার নানা উপদেশ দিয়ে যেতে পারে?
এ মরণ তো হত্যা। নিঃশব্দ হত্যার এই দায় রাষ্ট্রযন্ত্রের হোতাদের কি নয়? এই প্রশ্ন তো থেকেই যায়!!
(মতামত ব্যক্তিগত)