Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শিবরূপ

বিশ্বজীবন একটি বৃহৎ যজ্ঞস্বরূপ। সেই যজ্ঞের দেবতা স্বয়ং ভগবান, প্রকৃতি যজ্ঞদাতা। ভগবান শিব, প্রকৃতি উমা, উমা হৃদয়ের অন্তরে শিবরূপকে ধারণ করিয়াও প্রত্যক্ষ-শিবরূপ-হারা। প্রত্যক্ষ শিবরূপকে পাইবার জন্য লালায়িত। এই লালসা বিশ্বজীবনের নিগূঢ় অর্থ।

শিবরূপ
  • ২২ এপ্রিল, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

বিশ্বজীবন একটি বৃহৎ যজ্ঞস্বরূপ। সেই যজ্ঞের দেবতা স্বয়ং ভগবান, প্রকৃতি যজ্ঞদাতা। ভগবান শিব, প্রকৃতি উমা, উমা হৃদয়ের অন্তরে শিবরূপকে ধারণ করিয়াও প্রত্যক্ষ-শিবরূপ-হারা। প্রত্যক্ষ শিবরূপকে পাইবার জন্য লালায়িত। এই লালসা বিশ্বজীবনের নিগূঢ় অর্থ।

Advertisement

কিন্তু কি উপায়ে সফল মনোরথ হয়? পুরুষোত্তমকে পহুঁছিয়া পাইবার কোন্‌ পথ প্রকৃতির নির্দ্দিষ্ট? নিজ স্বরূপে পহুঁছিয়া পুরুষোত্তমের স্বরূপকে পাইবার কি উপায়? চক্ষে অজ্ঞানের আবরণ, চরণে স্থূলের সহস্র নিগড়। স্থূল সত্তা অনন্ত সৎকেও যেন সান্তে বদ্ধ করিয়া রাখিয়াছে, নিজেও যেন বন্দী হইয়া পড়িয়াছে, স্বয়ংগথিত এই কারাগারের হারান চাবি আর হাতে পায় না। জড়-প্রাণশক্তির অবশ সঞ্চারে অনন্ত উন্মুক্ত চিৎ-শক্তি যেন বিমূঢ়, নিলীন, অভিভূত, অচেতন হইয়া পড়িয়াছে। অনন্ত আনন্দ যেন তুচ্ছ সুখ-দুঃখের অধীন প্রাকৃত চৈতন্য সাজিয়া ছদ্মবেশে বেড়াইতে বেড়াইতে নিজের স্বরূপ ভুলিয়া গিয়াছে, আর তাহাকে খুঁজিয়া পায় না, খুঁজিতে খুঁজিতে আরও দুঃখের অসীম পঙ্কে নিমজ্জিত হইয়া যায়। সত্য যেন অমৃতের দ্বিধাময় তরঙ্গে ডুবিয়া গিয়াছে। মানসাতীত বিজ্ঞানতত্ত্ব অনন্ত সত্যের প্রতিষ্ঠাস্থল। বিজ্ঞানতত্ত্বের ক্রিয়া পার্থিবচৈতন্যে হয় নিষিদ্ধ নয় বিরল, যেন আড়াল হইতে ক্ষণিক বিদ্যুতের উন্মেষ মাত্র। সত্যানৃতে দোলায়মান ভীরু খঞ্জ বিমূঢ় মানসতত্ত্ব ঘুরিয়া ফিরিয়া সত্যকে অন্বেষণ করিতেছ, রাক্ষসী প্রয়াসে সত্যের আভাসকে পাইতেও পারে কিন্তু সত্যের পূর্ণ প্রকৃত জ্যোতির্ম্ময় অনন্ত রূপকে আর পায় না। যেমন জ্ঞানে, তেমনই কর্ম্মেও সেই-ই বিরোধ, সেই-ই অভাব, সেই-ই বৈফল্য। সহজ সত্যকর্ম্মের হাস্যময় দেবনৃত্যের স্থানে প্রাকৃত ইচ্ছাশক্তির নিগড়বদ্ধ চেষ্টা, সত্য-অসত্য পাপ-পুণ্য বিষ-অবিষ কর্ম্ম-অকর্ম-বিকর্ম্মের জটিল পাশে ছটফট করিতেছে। বাসনাবিহীন বৈফল্যহীন আনন্দময় প্রেমময় ঐক্যরসে মত্ত ভাগবতী ক্রিয়া-শক্তি মুক্ত, অকুণ্ঠিত, অসফলিত। তাহার স্বাভাবিক সহজ বিশ্বময় সঞ্চরণ প্রাকৃত ইচ্ছাশক্তির অসম্ভব। সান্তের অমৃত-ফাঁদে পড়া এই পার্থিব প্রকৃতির সেই অনন্ত সৎ, সেই অনন্ত চিৎশক্তি, সেই অনন্ত আনন্দ-চৈতন্য লাভ করিবার কি বা আশা, কি বা উপায়? যজ্ঞই উপায়। যজ্ঞের অর্থ আত্মসমর্পণ, আত্মবলিদান। যাহা তুমি আছ, যাহা তোমার আছে, যাহা ভবিষ্যতে স্বচেষ্টায় বা দেবকৃপায় হইতে পার, যাহা কর্ম্মপ্রবাহে অর্জন বা সঞ্চয় করিতে পার, সবই সেই অমৃতময়ের উদ্দেশ্যে হবিঃরূপে তপঃ অগ্নিতে ঢাল। ক্ষুদ্র সর্ব্বস্ব দানে অনন্ত সর্ব্বস্ব লাভ করিবে। যজ্ঞে যোগ নিহিত। যোগে আনন্ত্য, অমরত্ব ও ভাগবত আনন্দপ্রাপ্তি বিহিত। ইহাই প্রকৃতির উদ্ধারের পথ। জগতী দেবী সেই রহস্য জানেন। অতএব সেই বিপুল আশায় তিনি অনিদ্রিত অশান্ত, দিনরাত্রির বৎসর পর বৎসর যুগ পরে যুগ তিনি যজ্ঞই করিতেছেন। তাঁহার সমস্ত কর্ম্ম, সমস্ত চেষ্টা সেই বিশ্বযজ্ঞের অঙ্গমাত্র। যাহাই উৎপাদন করিতে পারিয়াছেন, তাহাই বলি দিতেছেন। তিনি জানেন, সকলের ভিতরে সে লীলাময় অকুণ্ঠিত মনে রসাস্বাদন করিতেছেন, যজ্ঞ বলিয়া সর্ব্ব চেষ্টা সর্ব্ব তপস্যা গ্রহণ করিতেছেন। 
শ্রীঅরবিন্দের ‘বিবিধ রচনা’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ