Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শিরে সংক্রান্তি আম আদমির

‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’। আকাশপথে ইজরায়েলের ‘রাইজিং লায়ন’-এর মোকাবিলায় ইরানের ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস-৩’-এর তুমুল লড়াই শুরুর তিনদিন পরও দু’দেশের মনোভাব আপাতত এইরকম। ফলস্বরূপ, পশ্চিম এশিয়ায় আরও একটা যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়া।

শিরে সংক্রান্তি আম আদমির
  • ১৭ জুন, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

‘বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্যগ্র মেদিনী’। আকাশপথে ইজরায়েলের ‘রাইজিং লায়ন’-এর মোকাবিলায় ইরানের ‘অপারেশন ট্রু প্রমিস-৩’-এর তুমুল লড়াই শুরুর তিনদিন পরও দু’দেশের মনোভাব আপাতত এইরকম। ফলস্বরূপ, পশ্চিম এশিয়ায় আরও একটা যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়া। গত কয়েক বছর ধরে রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধ দেখছে বিশ্ববাসী। প্যালেস্টাইনে ইজরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় গাজায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষের মৃত্যুর সাক্ষী এই দুনিয়া। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে ইজরায়েল-ইরান মিসাইল যুদ্ধ। এই বিধ্বংসী লড়াইয়ে ইতিমধ্যে দু’পক্ষের কয়েকশো মানুষের প্রাণ গিয়েছে। অন্যান্য ক্ষতির পরিমাণ এখনই পরিষ্কার নয়। আপাতত দু’পক্ষই কোনওরকম মধ্যস্থতা, কূটনৈতিক আলোচনার সম্ভাবনা কার্যত খারিজ করে দিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছে। ফলে এর শেষ কবে, কীভাবে তা কেউ জানে না। কিন্তু এই আচমকা যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর আশঙ্কার ছায়া ফেলতে শুরু করেছে, যার হাত থেকে মুক্ত নয় ভারতও। 

Advertisement

তবে কি ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’— প্রবাদটিই সত্য হতে চলেছে? কারণ, ইজরায়েল-ইরান লড়াই শুরু হতেই বিশ্ববাজারে অশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধি মাথাচাড়া দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ৬০ ডলারে নেমে আসা ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ইতিমধ্যেই ব্যারেল পিছু ৭৮ ডলারে পৌঁছেছে। আর কিছুদিন এই পরিস্থিতি চললে তেলের দর এমনকী ৯৫ ডলার ছাড়াতে পারে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। একথা ঠিক, ইরান সারা বিশ্বের অন্যতম বড় তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ হলেও ভারত বেশিরভাগ অশোধিত তেল আমদানি করে রাশিয়া থেকে। কিন্তু ভারতে এখন কয়েক মাসের তেলের মজুত রয়েছে বলে দাবি করেছে মোদি সরকার। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান পুরোপুরি তেল উৎপাদন ও রপ্তানি বন্ধ করে দিলে গোটা বিশ্বে জ্বালানি সঙ্কট দেখা দেবে। তার রেশ পড়তে বাধ্য ভারতেও। ফলে গত কয়েকমাসে খুচরো বাজারে মূল্যবৃদ্ধিতে যে অধোগতি লক্ষ করা যাচ্ছে, তা ফের মাথাচাড়া দেওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এর অর্থ, বর্ধিত দামের প্রভাব সরাসরি পড়বে আম জনতার উপর। এমনিতেই বিশ্ববাজারে এর আগে অশোধিত তেলের দাম অনেকটা নেমে গেলেও তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এদেশে পেট্রল-ডিজেলের দাম কমায়নি মোদি সরকার। সুতরাং রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল আমদানি করলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির ঘটনাকে অজুহাত হিসাবে দেখিয়ে এদেশে জ্বালানি তেলের দাম যে বাড়াবে না মোদি সরকার এমনটা ভাবা কষ্টকল্পিত। তবে এই পরিস্থিতিতে তেলের দামবৃদ্ধি ছাড়াও আরও একটা বড় আশঙ্কার দরজা খুলে গিয়েছে। তা হল বাণিজ্য। বিশেষত, জল ও আকাশপথের পরিবহণ খরচ বেড়ে গেলে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হবে। তার প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে। ঘটনা হল, ইজরায়েল-ইরান দু’পক্ষের সঙ্গেই ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে। এখন ইজরায়েলের ওই হামলার প্রেক্ষিতে তাদের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে বলে হুঙ্কার দিয়েছে ইরান। এমনটা সত্যি হলে ভারতের প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। পাশাপাশি, এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই ভারতে আসে দুই তৃতীয়াংশ জ্বালানি। ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান এক্সপোর্ট অর্গানাইজেশনের দাবি, আমদানিকৃত পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালী বা লোহিত সাগর দিয়ে না গিয়ে ঘুরপথে গেলে পরিবহণ খরচ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। এতে সংশ্লিষ্ট পণ্যের দাম বাড়বে, যা আদতে মূল্যবৃদ্ধিকে ঠেলে তুলবে। অতএব শিরে সংক্রান্তি আম আদমির। 
ইজরায়েল-ইরান লড়াইকে সামনে রেখে মোদি সরকারের ভূমিকা নিয়ে যথারীতি কূটনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। গাজায় ইজরায়েলের ধ্বংসলীলা চালানোর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রস্তাবে ভোটদানে বিরত থেকেছে ভারত। আবার, গত শনিবার সাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিও-এর তরফে ইরানে হামলার নিন্দা করে যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে, তাতে রাশিয়া, চীনের মতো দেশ স্বাক্ষর করলেও ভারত নিজেকে দূরে রেখেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের এই ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে বিরোধী মহলে। দিল্লির অবশ্য দাবি, আলোচনা ও কূটনৈতিক পথেই সমাধান খুঁজতে হবে। এই কারণে গত কয়েক বছর ধরে সরাসরি কোনও পক্ষ নেয় না মোদি সরকার। সংঘর্ষ, যুদ্ধ, লড়াইয়ের মতো পরিস্থিতিতে নরেন্দ্র মোদিদের অবস্থান যাই হোক, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবশ্য আছেন নিজের তালে! ইরান মনে করে, ইজরায়েলের এই হামলার পিছনে আমেরিকার সমর্থন রয়েছে। ট্রাম্প নিজেও প্রথমে ইরানের বিরুদ্ধে চড়া হুঙ্কার ছেড়েছিলেন। কিন্তু ইরান তাতে দমে না গিয়ে পাল্টা হামলা চালাতেই সুর বদলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলতে শুরু করেছেন, ‘চাইলে আমরা খুব সহজেই ইরান ও ইজরায়েলের মধ্যে সংঘাত বন্ধের জন্য চুক্তি করে দিতে পারি।’ এ প্রসঙ্গে ফের ভারত-পাকিস্তান সংঘর্ষ বিরতি করিয়ে দেওয়ার দাবিও করেছেন ট্রাম্প! প্রশ্ন হল, ট্রাম্পের এই কৌশলী সন্ধি প্রস্তাব মানবে ইরান? নাকি আরও কোনও বড় হামলার পথে জড়িয়ে পড়বে দু’পক্ষ? আর তাদের সমর্থন বা বিরোধিতায় দাঁড়িয়ে যাবে একাধিক রাষ্ট্র? ঘোর বিপদ তাই উলুখাগড়াদের। 

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ