Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

সেবা

জগৎ কারণ ব্রহ্মের সহিত পিতা মাতা প্রভু বা অন্য যে কোন জাগতিক ও ব্যবহারিক সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া ইন্দ্রিয় সংযম, একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সহিত সাধনায় প্রবৃত্ত শ্রদ্ধাবান সাধকের সাংসারিক অনর্থ নিবৃত্তি, চিরশান্তি ও আনন্দময় মুক্তিলাভ বা নিত্যধামে সেবানন্দলাভ হইবেই।

সেবা
  • ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

জগৎ কারণ ব্রহ্মের সহিত পিতা মাতা প্রভু বা অন্য যে কোন জাগতিক ও ব্যবহারিক সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া ইন্দ্রিয় সংযম, একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সহিত সাধনায় প্রবৃত্ত শ্রদ্ধাবান সাধকের সাংসারিক অনর্থ নিবৃত্তি, চিরশান্তি ও আনন্দময় মুক্তিলাভ বা নিত্যধামে সেবানন্দলাভ হইবেই। কিন্তু সাধনার উদ্দেশ্যে স্বীকৃত লৌকিক ভাবসমূহের মধ্যে মাতৃভাবের অর্থাৎ বিশ্বকারণ ব্রহ্মকে মহাশক্তি জগন্মাতা ভাবিয়া উপাসনার মধ্যে অনুপম বৈশিষ্ট্য, চমৎকারিতা, সারল্য, অল্পায়াসসাধ্যতা ও অন্যান্য বিষয়—নিরপেক্ষ বিচারে সকলকেই অবশ্য মানিতে হইবে বলিয়া মনে করি। ইহা অন্যভাবের উপাসনার সমালোচনা বা অপকর্ষ খ্যাপন নহে, কিন্তু মাতৃভাবে উপাসনার বাস্তব ও সত্য বৈশিষ্ট্যের কথা মাত্র। আমরা গৃহে জননীকে এবং দেবমন্দিরে জগন্মাতা মহামায়াকে ‘মা মা’ বলিয়া আহ্বানে প্রাণে আনন্দ ও শান্তি পাই। এই ‘মা’ শব্দটিকে মাতৃবাচক সংস্কৃত পদ, কেবল চলতি ভাষা নহে। মা শব্দের আর এক অর্থ লক্ষ্মী এবং লক্ষ্মীপতি নারায়ণকে ‘মাধব’ বলে। ‘পরব্রহ্মমহিষী’ মহাশক্তি মহামায়াই ব্রহ্মার গৃহিণী সরস্বতী, বিষ্ণুপত্নী লক্ষ্মী এবং শিবজায়া পার্বতীর রূপে শোভমানা। রূপ ভিন্ন কিন্তু স্বরূপ অভিন্ন। অতএব মা শব্দের আর এক অর্থ মহামায়া।

Advertisement

এই ব্রহ্মশক্তি স্বরূপতঃ ব্রহ্মই। কারণ শক্তিমান ও শক্তির ভেদ নাই। ব্রহ্মের শক্তি কথাটি রাহুর মস্তকের মতই; কারণ মস্তকটিই রাহু। বিদ্যামায়া ও অবিদ্যামায়া মহামায়ার দুই প্রকাশ। তিনি অবিদ্যারূপে বন্ধকারী এবং বিদ্যারূপে মুক্তিদায়িনী। সা বিদ্যা পরমামুক্তের্হেতুভূতা সনাতনী। সংসার বন্ধহেতু শ্চ সৈব সর্ব্বেশ্বরেশ্বরী।।—চণ্ডী। বিদ্যাবিদ্যে মম তনু……বন্ধ মোক্ষকরী।।–ভাগবত। উপনিষদে আছে, ব্রহ্ম তাঁহার লীলায় একাকী আনন্দ পান না বলিয়া নিজেকে পুরুষ ও প্রকৃতি দুইভাগে বিভক্ত করিলেনঃ একাকী নৈব রমতে। আত্মানাং দ্বেধাকরোৎ।। দুইভাগে বিভক্ত হইলেও তত্ত্বতঃ ব্রহ্ম একই; দুইটি দলে বল্কলের মধ্যে স্থিত চণক (ছোলা) তুল্য। ব্রহ্মের এই যে যুগলামূর্ত্তি—রাধাশ্যাম, সীতারাম, লক্ষ্মীনারায়ণ ও শিবকালী প্রভৃতি রূপ তাহারই ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ মাত্র। একে দুই, আবার দুয়ে এক। মহামায়া বা মূল প্রকৃতির বিলাসে ব্রহ্ম সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা। পালনকর্তা বিষ্ণু ও সংহার কর্তা রুদ্ররূপে প্রকাশিত হইয়াছেন। বিষ্ণু শরীরগ্রহণমহমীষাণ এব চ। কারিতাঃ।–চণ্ডী। ব্রহ্মের বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি স্থিতি ও বিনাশাদি সকল লীলা এবং যাহা কিছু কার্য সবই শক্তির ক্রিয়া। শক্তির ক্রিয়া যখন বন্ধ থাকে, তখন ব্রহ্ম নিষ্ক্রিয়, শিব শবাকার। ব্রহ্মা বিষ্ণু শিবা রাজন্‌ প্রধানা ব্রহ্মশক্তয়ঃ।–বিষ্ণুপুরাণ।
ব্রহ্ম চৈতন্যের জ্যোতিঃতেই স্থাবরজঙ্গম জীবজগৎ প্রভৃতি প্রকাশিত এবং তাঁহার ‘নিত্যা জগন্মূর্ত্তি’ শক্তির বিলাসে এত বিচিত্র দৃশ্যের দর্শনবিলাস। ব্রহ্মের তিনটি শক্তিঃ অন্তরঙ্গা বা স্বরূপ শক্তি, বহিরঙ্গা বা মায়াশক্তি এবং তটস্থা বা জীবশক্তি। স্বরূপ শক্তির (স্বাভাবিকী জ্ঞান-বল-ক্রিয়া চ।–শ্রুতি) ত্রিবিধ প্রকাশ—সকল মূর্ত্তি, ধাম, পরিকর, নাম মন্ত্র ও সেবোপকরণরূপে সন্ধিনী, সম্বিৎ বা জ্ঞানশক্তি এবং হ্লাদিনী বা প্রেমভক্তি আনন্দ শক্তি।
জ্যোতির্ময় নন্দের ‘শক্তিপূজার মহত্ত্ব’ থেকে

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ