সমৃদ্ধ দত্ত: ক্রেডিট কার্ড ছিল না। ব্যাঙ্ক থেকে সহজে বাড়ি গাড়ি ব্যবসার জন্য লোন দেওয়ার এই উৎসব ছিল না। পার্সোনাল লোন ছিল না। বিপুল অঙ্কের স্যালারি ছিল না। আজকের মতো শুধুই নিজের স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণকেই জীবনের সাফল্য বলা হতো না। ছিল অনেক পারিবারিক দায়িত্ব। এখনও যা বহু সংসারে রয়েছে। মোবাইল ফোন ছিল না। এমনকী অসংখ্য বাড়িতে ছিল না টেলিফোন। ফ্রিজ এবং রঙিন টিভিও একপ্রকার বিলাসিতাই বলা যায়। ১৯৯১ সালের আর্থিক উদারীকরণের পূর্ববর্তী সময়ে এবং তৎপরবর্তী আরও বহু বছর ধরে এই সময়কালে একাধিক প্রজন্ম সামান্য সরকারি এবং বেসরকারি চাকরি কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসা করে নিজেদের সংসার চালিয়েছেন। সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছেন। অবসরের আগে অথবা পরে একটি নিজস্ব বাড়ি করেছেন। ছেলেমেয়ের বিবাহ দিয়েছেন। যাঁদের আর্থিক অবস্থা একটু ভালো, তাঁরা নিয়ম করে ভ্রমণে গিয়েছেন স্ত্রী, সন্তান, মা বাবাকে নিয়ে। চিকিৎসা করিয়েছেন পরিবারের সদস্যদের। পরিবার মানে কিন্তু শুধুই স্ত্রী সন্তান, পিতা-মাতা নয়। ভাই, বোন, দাদা বউদিও। এই মা বাবারা নিজেদের বিলাসিতা এবং ইচ্ছা অনিচ্ছাকে সবথেকে পিছনে রেখেছেন। মনে করে করে পুজোর আগে বৃহত্তর আত্মীয়স্বজনের জন্য তাঁরা কিনেছেন পুজোর জামাকাপড়। যথাসাধ্য ক্ষমতায় কেনা সেইসব উপহার নিয়ে তাঁরা পুজোর আগে উপস্থিত হয়েছেন, দশমীর পর বিজয়াতেও গিয়েছেন। একক স্যার বা দিদিমণিদের কাছে সন্তানকে টিউশনি পড়িয়েছেন। কিংবা দিয়েছেন টিউটোরিয়ালে। সেখানেই শেষ নয়। সাঁতার, আবৃত্তি, নাচ, গানে আগ্রহ দেখলে কষ্ট করে হলেও দিয়েছেন সন্তানদের সেইসব সুযোগ। এভাবে ধীরে ধীরে এই প্রজন্ম ষাটের কোঠা পার করে ক্রমেই সরে গিয়েছেন মূলস্রোত থেকে। আজ তাঁদের কেউ বৃদ্ধ, কেউ প্রয়াত।
আজকের আধুনিক এই উজ্জ্বল প্রযুক্তি এবং ভাবনায় যে সমাজ আবর্তিত হচ্ছে, তার ভিত্তিটা কিন্তু সেই পূর্ববর্তী প্রজন্ম অত্যন্ত সাদামাঠা জীবন অতিবাহিত করে তৈরি করে দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু ক্রমেই দেখা যাচ্ছে, এই একা হাতে সব দিক সামলানো প্রজন্মরা ক্রমেই সমাজে যেন একঘরে হয়ে পড়ছেন। এর অন্যতম মূল কারণ হল, আজকের সমাজ, রাষ্ট্র প্রশাসন, পরিষেবা সম্পূর্ণভাবে প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তি কি খারাপ? মোটেই না। খুব ভালো। প্রতিটি কাজকে সহজ করে দিয়েছে। কিন্তু সেই প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে যে প্রজন্ম দৌড়াতে পারছেন না, তাঁরা সম্পূর্ণ এক পরনির্ভরশীল শ্রেণিতে পরিণত হয়ে চলেছেন। যা তাঁদের কাছে চরম গ্লানিকর। বিদ্যুৎ, মোবাইল, টিভি নেটওয়ার্ক, ব্যাঙ্কিং, ট্যাক্স, ট্রেন বা এয়ারটিকিট প্রতিটি পরিষেবা এখন অনলাইন নির্ভর। অ্যাপস, ওটিপি, পাসওয়ার্ড, আধার লিংক ইত্যাদি আশ্চর্যজনক সব নতুন নতুন শব্দ একটি বৃহৎ অংশের সিনিয়র সিটিজেন প্রজন্মকে ভিতর থেকে আত্মবিশ্বাসহীন করে দিয়েছে। কারণ তাঁদের কেউ চোখে দেখতে পান না ভালো করে, হয়তো কানে শুনতে পান না, হাত কাঁপে, স্মার্ট ফোন ব্যবহারে অপারগ, পিন জেনারেট করা কাকে বলে জানেন না, ওটিপি এলে সেটা দিয়ে কী করতে হয় এসব সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। অথচ টাকা আছে। মনোবল আছে। কিন্তু রাষ্ট্র এই প্রজন্মকে স্বস্তিকর জীবন উপহার দিতে ব্যর্থ।
হেল্প এজ ইন্ডিয়ার সাম্প্রতিকতম সার্ভের নাম এজিং ইন ইন্ডিয়া। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জীবনযাপন সমীক্ষা করে তারা যে রিপোর্ট তৈরি করেছে সেখানে জানা যাচ্ছে, ৬৫ শতাংশ সিনিয়র সিটিজেনের একক আর্থিক ক্ষমতা দুর্বল। তাঁদের কষ্ট হচ্ছে জীবিকা নির্বাহ করতে। আর্থিক সঙ্কটের কারণে ৭৯ শতাংশ সরকারি হাসপাতালেই চিকিৎসা করান। রিপোর্টে পাওয়া গিয়েছে, আয় কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক অসম্মান, অত্যাচার এবং তাচ্ছিল্য বেড়ে যায়।
৫৯ শতাংশ সিনিয়র সিটিজেনের কাছে কোনও ডিজিটাল অ্যাকসেস নেই। এই যে ‘ডিজিটাল’ শব্দটি উচ্চারণ করা হল, এই শব্দটি দিয়ে যে আসলে কী বোঝায়, সেটাও ওই ৫৯ শতাংশ জানেন না। ঠিক এই কারণেই এই প্রজন্ম ক্রমেই একটি অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের মনোজগতে ফেসবুক নেই, হোয়াটস অ্যাপ নেই, ইনস্টাগ্রাম নেই, গুগল নেই, ইমেল নেই, ডাউনলোড নেই, আপলোড নেই। অথচ তাঁরা তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মুখে, প্রতিটি আলোচনায় সারাক্ষণ এই শব্দগুলি শোনেন।
সুতরাং তাঁদের মধ্যে একটি একাকীত্ব, এলিয়েনেশন এবং একঘরে হয়ে যাওয়ার মনোভাব তৈরি হয়। যাঁদের কাছে স্মার্ট ফোন আছে তাঁদের মোট সংখ্যার মাত্র ১২ শতাংশ ফোনের মাধ্যমে নিজেদের বিভিন্ন বিল পেমেন্ট করতে পারেন নিজেরাই। বাকি ৮৮ শতাংশই পরনির্ভরশীল।
যাঁরা একসময় কমবেশি সব সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতেন, আজ তাঁদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা সবথেকে কম। কারণ অবসরের পর যতই বয়স বেড়েছে, দেখা যায় পারিবারিক যে কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার এই সিনিয়র সিটিজেনদের থেকে সরে যায়। অর্থাৎ মেজো মাসির ছেলের বিয়েতে কী উপহার দেওয়া হবে অথবা কবে বাড়ির রং করানো হবে কিংবা জমানো টাকা কোথায় লগ্নি করা যায়, বাচ্চাদের কোন স্কুলে, কোন মিডিয়ামে পড়ানো হবে, পুজোয় কাদের জন্য উপহার কেনা হবে, কার্যত সিংহভাগ সিদ্ধান্তে আর সিনিয়র সিটিজেনদের গুরুত্ব থাকছে না। অথচ তাঁদের মতামত চাওয়া হয় অনেক সময়। কিন্তু সেটাই যে চূড়ান্ত তা নয়। এই প্রবণতার ফলে সিনিয়র সিটিজেনদের মনের মধ্যে একটি ‘আমি গুরুত্বহীন’ মনোভাব প্রস্ফূটিত হয়। ক্রমেই সেটি বৃদ্ধি পায়। সংসার ও পরিবার থেকে ঠিক কবে কোনও সিনিয়র সিটিজেন নিজেকে বিযুক্ত করে ফেলতে শুরু করলেন, সেটা ব্যস্ত সদস্যদের পক্ষে সর্বদা তীক্ষ্ণভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয় না। পাশাপাশি বিপরীত ঘটনাও ঘটে। বহু সিনিয়র সিটিজেনের নিত্যদিনের ব্যবহার, প্রতিক্রিয়া, অতি কথন, তাৎক্ষণিক রি-অ্যাক্ট করা, ঝগড়ার প্রবণতা, অন্যকে দোষারোপ করা, স্মরণশক্তির বিলোপ আরও বেশি করে তাঁদেরকে পরিবারে এবং সমাজে কোণঠাসা করে দিচ্ছে। বিদেশে একটি পেশা আছে, কেয়ার-গিভার। এদেশেও সেটি বাড়ছে। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রয়োজন একটি স্থায়ী সমাধানের গাইডলাইন তৈরি করা।
নিজেদের জমানো টাকা অথবা পেনশন ব্যাঙ্ক থেকে তুলতে সিনিয়র সিটিজেনদের প্রভূত কষ্ট সহ্য করতে হয়। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা। প্রচণ্ড গরমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করা। কাউন্টার মাত্র একটি। কখনও বলা হবে লিংক ফেলিওর। ডিজিটাল ব্যাঙ্কিং, ইউপিআই ইত্যাদির জয়গান করে ব্যাঙ্কের শাখা, ব্যাঙ্ক কর্মীর সংখ্যা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। একবারও ভাবা হচ্ছে না যে, সব থেকে বড় সঙ্কট সিনিয়র সিটিজেনদের। ২৫ অথবা ৪০ বছর বয়সে সব কিছু ডিজিটাল হয়ে যাওয়াকে আশীর্বাদ ও আধুনিক মনে হতেই পারে, কিন্তু ৮০ বছর বয়স হলে সেই পরিষেবা গ্রহণ করার মতো মানসিক, শারীরিক সক্ষমতা যে থাকে না সর্বদা, এটা বোঝাও দরকার রাষ্ট্রের। এই যে জেলায় জেলায় স্মার্ট মিটার বসানো হচ্ছে, খুব ভালো প্রক্রিয়া। কিন্তু বিল বাড়িতে পাঠানো হবে না। এই প্রিপেইড ব্যবস্থায় একা থাকা সিনিয়র সিটিজেনরা কীভাবে বিদ্যুৎ বিল জানবেন? স্মার্ট ফোন তার মানে বাধ্যতামূলক। সেটা থাকলেই যে সকলেই সক্ষম তাও নয়। সুতরাং আবার সেই একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি। সেটি হল, চলতে ফিরতে অপারগ হলে কারও সাহায্য গ্রহণ করা বৃদ্ধ বয়সে স্বাভাবিক। কিন্তু নিত্যদিনের জীবনে প্রতিটি বিল পেমেন্ট করতে, ব্যাঙ্কিং সেক্টরে, পরিষেবা বিল জমা দিতেও সিনিয়র সিটিজেনদের সর্বদা পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হচ্ছে। প্রযুক্তির মাধ্যমে ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু হোক ক্ষতি নেই। কিন্তু এই প্রবীণ প্রজন্মকে মানসিকভাবে আত্মবিশ্বাস দিতে, তাঁদের আর একটু কম পরমুখাপেক্ষী হওয়ার সুযোগ দিতে কী করা উচিত সেটাও ভাবতে হবে।
বহু বছর ধরে এই প্রজন্ম সরকারকে ট্যাক্স দিয়েছেন। ভোট দিয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা মেনে চলেছেন। রাষ্ট্র যা যা বলেছে সব পালন করেছেন। সন্তানকে অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা শিখিয়ে সমাজ ও দেশকে ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, অধ্যাপক, ব্যবসায়ী, সরকারি আধিকারিক, শিল্পী ও আদর্শ নাগরিক উপহার দিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের জীবনের অবসরকালীন সময়ে ক্রমেই তাঁরা বিচ্ছিন্নতার এক জগতে প্রবেশ করছেন। এটা কি কাম্য? কী করা উচিত? সিনিয়র সিটিজেন সেন্সাস করা দরকার। প্রতিটি এলাকায় সরকারিভাবেই কেয়ার-গিভার সেন্টার চালু করা যেতে পারে। যাই করা হোক, একটি অন্তত উদ্যোগ তো দেখা যাক। সরকার, সমাজ, রাজনীতি সকলেরই কি তা চিন্তা করা উচিত নয়? সিনিয়র সিটিজেনদের সবথেকে বড় সঙ্কট সঙ্গহীনতা। সমাধান কী?