অবশেষে নোবেল শান্তি পুরস্কার আদায় করেই ছাড়লেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে তা ‘সেকেন্ড হ্যান্ড’। কারণ, নিজের নোবেল শান্তি পুরস্কার ট্রাম্পের হাতে স্বেচ্ছায় তুলে দিয়েছেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। নির্লজ্জের মতো ট্রাম্প তা গ্রহণও করেছেন। জানা গিয়েছে, ওই পুরস্কার ট্রাম্প নিজের কাছেই রেখে দিতে ইচ্ছুক। আসলে ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলা দখল করেন ট্রাম্প। সেই দেশের প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে এনে বন্দি করে আমেরিকা। আর এই ঘটনার পর থেকেই ভেনেজুয়েলায় পরবর্তী রাজনৈতিক রূপরেখা তৈরির জন্য ব্যস্ত আমেরিকা। খোঁজ চলছে ভেনেজুয়েলার মাটিতে কে হবে আমেরিকার ‘পুতুল’? এমন পরিস্থিতিতে হোয়াইট হাইসে বৈঠক করেন ট্রাম্প এবং মাচাদো। ট্রাম্পের মন জয় করতে নিজের সেরা চাল চালেন লাতিন আমেরিকার ওই পোড়খাওয়া রাজনীতিবিদ। নোবেল কমিটিকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেই বৈঠকের পরই নিজের শান্তি পুরস্কার মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে তুলে দেন মাচাদো। পাশাপাশি তিনি ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান। তাঁর কথায়, ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপর এখন ভরসা রাখতে হবে।’ একইসঙ্গে নোবেল শান্তি পুরস্কারের বিনিময়ে কার্যত গোটা ভেনেজুয়েলা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিলেন মাচাদো।
২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। বিজয়ীর নাম ঘোষণার অনেক আগে থেকেই ট্রাম্প দাবি করছিলেন, এই পুরস্কার তাঁর প্রাপ্য। কারণ, বিশ্বের আটটি যুদ্ধ তিনিই নাকি থামিয়েছেন। সেই কৃতিত্বের জন্যই নোবেল শান্তি পুরস্কার তাঁর প্রাপ্য, দাবি করেছিলেন নিজেই। যদিও এত কিছু করার পরও নোবেল পাননি ট্রাম্প। তাঁর জায়গায় মাচাদোর নোবেল পাওয়ার খবরে রেগে বোম হয়ে গিয়েছিলেন ট্রাম্প। নিজের মুখেই তিনি সেই কথা জানিয়েছিলেন। ট্রাম্পের রাগে জল ঢালতে সেদিনই মাচাদো ওই পুরস্কার ট্রাম্পকে উৎসর্গও করেছিলেন। সেই সময়ই মাচাদো বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, নোবেল পুরস্কারের চেয়েও তাঁর বেশি প্রয়োজন ভেনেজুয়েলা দখল করা। আজ সেই সুযোগ আসতেই সেই পুরস্কার তুলে দিয়েছেন ট্রাম্পের হাতে। ‘সেকেন্ড হ্যান্ড নোবেল’। এই প্রসঙ্গে আপ্লুত ট্রাম্পের দাবি, ‘মাচাদো আমায় বলে, আপনি ৮টি যুদ্ধ থামিয়েছেন। এই পুরস্কারের দাবিদার আপনার থেকে বেশি কেউ নয়।’ আর এই কথাতেই মন গলে যায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। এ কথাটাও নির্দ্ধিধায় জানিয়েছেন। তাঁর কথায়, ‘আমার খুবই ভালো লেগেছে। উনি খুবই দয়ালু মানুষ। আমরা আবার কথা বলব।’
তবে কি নোবেল শান্তি পুরস্কার হয়ে উঠল রাজনীতির হাতিয়ার? কিন্তু অর্জিত নোবেল পুরস্কার কি এভাবে কাউকে দিয়ে দেওয়া যায়? যদি কেউ দেনও, তবে কি নোবেলজয়ীর নাম বদলে যায়? মাচাদো কি নিয়ম ভেঙেছেন? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর ব্যাখ্যা করে বিবৃতি দিয়েছে নরওয়ের নোবেল কমিটি। তাদের বক্তব্য, এই পদক হস্তান্তরের কোনও আইনি মূল্য নেই। নরওয়েজিয়ান নোবেল ইনস্টিটিউট এবং নোবেল কমিটির মতে, একবার প্রদত্ত নোবেল শান্তি পুরস্কার স্থানান্তর, ভাগাভাগি বা পুনর্বণ্টন করা যাবে না। এই নিয়মটি নোবেল ফাউন্ডেশনের আইনের একটি মূল নীতি, যা আলফ্রেড নোবেলের উইলে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু তো নোবেল শান্তি পুরস্কারের পদক নয়, মাচাদো পেয়েছেন একটি ডিপ্লোমা এবং পুরস্কারমূল্য হিসাবে ১১ লক্ষ ৯০ হাজার মার্কিন ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় তার মূল্য প্রায় ১০ কোটি ৮০ হাজার টাকা। এই সব কি তবে ট্রাম্প পাচ্ছেন? বিবৃতিতে নোবেল কমিটি বলেছে, ‘পদক, ডিপ্লোমা বা পুরস্কারমূল্যের যা-ই হোক না কেন, মূল বিজয়ীর নামই নোবেল পুরস্কারের প্রাপক হিসাবে ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে। তিনি তাঁর পদক, ডিপ্লোমা বা অর্থ দিয়ে কী করবেন, সে বিষয়ে নোবেল ফাউন্ডেশনের কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। তিনি সেগুলি নিজের কাছে রাখতে পারেন, কাউকে দিয়ে দিতে পারেন, বিক্রি করে দিতে পারেন বা উৎসর্গ করতে পারেন। পুরস্কারটি, তার সম্মান এবং স্বীকৃতি অবিচ্ছেদ্যভাবে কেবল তিনিই পাবেন, যাঁকে নরওয়ের নোবেল কমিটি মনোনীত করেছে।’ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে— নোবেল পদক কি এখন রাজনীতির ‘উপহার’ হয়ে গেল? মারিয়ার ব্যাখ্যা অবশ্য বেশ কূটনৈতিক। তাঁর দাবি, ভেনেজুয়েলায় ‘স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি’ রাখার জন্যই এই বিশেষ উপহার। ‘সেকেন্ড হ্যান্ড’ নোবেল পেয়ে ট্রাম্পও খুশি। রাজনৈতিক মহলের কটাক্ষ— ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট পদের স্বপ্ন দেখতেই কি নোবেল পৌঁছে গেল ট্রাম্পের ডেস্কে? আজ গোটা দুনিয়ার কাছে স্পষ্ট, নোবেল শান্তির পুরস্কারই এখন অশান্তির কেন্দ্রে!