জয়রামবাটীর পাঠশালা। সারদা ছিলেন বিদ্যাদায়িনী দেবী সরস্বতী। তাঁকে পাঠশালায় যেতে দেখলে কার না কৌতূহল হয়। আমরা অবাক হয়ে দেখি দেহধারিণী মা সরস্বতী জয়রামবাটীর পাঠশালায় মাটির মেঝেতে বসে তালপাতায় নারকেলের ছোবড়া পোড়ানো কালি ও কঞ্চির কলম দিয়ে অ, আ, ক, খ লিখছেন ও বর্ণপরিচয়ের প্রথম ভাগ পড়ছেন। বিদ্যাশিক্ষার ব্যাপারে সারদার আত্মকথা:
ছেলেবেলায় প্রসন্ন, রামনাথ (জ্ঞাতিভাই) ওরা সব পাঠশালায় যেতো, ওদের সাথে কখনও কখনও এক-আধটু স্কুলে যেতুম। তাইতে একটু শিখেছিলুম। পরে কামারপুকুরে লক্ষ্মী (ঠাকুরের ভাইঝি) ও আমি ‘বর্ণপরিচয়’ পড়তুম। ভাগনে (হৃদয় মুখুজ্যে) বই কেড়ে নিলে। বললে—মেয়েমানুষের লেখাপড়া করতে নেই। শেষে কি নাটক পড়বে?’ লক্ষ্মী তার বই ছাড়লে না—ঝিয়ারি কি না, জোর করে রাখলে। আমি আবার লুকিয়ে আর একখানি এক আনা দিয়ে কিনে আনলুম। লক্ষ্মী পাঠশালায় গিয়ে পড়ে আসত, এসে আবার আমায় পড়াতো। ভাল করে শেখা হয়েছিল দক্ষিণেশ্বরে। ঠাকুর তখন শ্যামপুকুরে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলেন। একাটি আছি, ভব মুখুজ্যের একটি মেয়ে গঙ্গা নাইতে আসত। সে মাঝে মাঝে অনেকক্ষণ আমার কাছে থাকত। সে রোজ নাইবার সময় পড়া দিত ও নিত্য বাগান থেকে যা শাক-পাতা এখানে দিত, তাই থেকে তাকে খুব করে দিতুম।
আমরা মায়ের মুখে তাঁর বিদ্যাশিক্ষার কাহিনি শুনলাম। মা পড়তে পারতেন, এ বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী নিবেদিতা লিখেছেন, “শ্রীমা পড়তে পারেন। রাময়ণ পাঠে অনেক সময় কাটে। কিন্তু লিখতে পারেন না।” নিবেদিতা মাকে কখনো লিখতে দেখেননি। স্বামী অরূপানন্দ লিখেছেন, “[মা] রামায়ণাদি পড়িতেন কিন্তু পত্রাদি লিখিতে তাঁহাকে কখনও দেখা যাইত না।” কথাটা হলো লেখাপড়া। আগে লেখা শেষে পড়া। আমাদের বিদ্যারম্ভ হয় ‘হাতেখড়ি’ দিয়ে। আমরা অ, আ, ক, খ, শিখি স্লেটে বা কাগজে লিখে—যা শিক্ষক হাত ধরে লেখান এবং তার ওপর বারবার দাগ বুলোতে বলেন। এভাবে অক্ষরজ্ঞান হলে শিশু পড়তে শেখে। একথা হয়তো সত্য মা নিজহাতে কোনো চিঠি লেখেননি বা মনি অর্ডার কুপনে নাম সই করেননি, কিন্তু তাঁর অক্ষরজ্ঞান ছিল। এ প্রসঙ্গে আমরা দুটি তথ্য পরিবেশন করছি। প্রথম, মিসেস ওলি বুলের শেষ অসুখের সময় মা নিবেদিতাকে দিয়ে একটি চিঠি লেখান (২৮/৭/১৯১০) এবং নিজে ‘মা’ লিখে সই করেছিলেন।
স্বামী চেতনানন্দের ‘ধ্যানলোকে শ্রীমা সারদা দেবী’ থেকে