Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

নমুনাই যথেষ্ট

দেশকে আলোয় তুলে আনাই ছিল দেশনেতাদের স্বপ্ন ও সংকল্প। তার জন্য যেমন শিক্ষা সংস্কার ও শিক্ষার বিস্তার জরুরি ছিল, তেমনই ছিল ঘরে ঘরে দূষণমুক্ত আলোর ব্যবস্থা করা।

নমুনাই যথেষ্ট
  • ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

দেশকে আলোয় তুলে আনাই ছিল দেশনেতাদের স্বপ্ন ও সংকল্প। তার জন্য যেমন শিক্ষা সংস্কার ও শিক্ষার বিস্তার জরুরি ছিল, তেমনই ছিল ঘরে ঘরে দূষণমুক্ত আলোর ব্যবস্থা করা। স্বাধীন ভারত দুটি কাজ নিশ্চিতভাবেই শুরু করেছিল। কিন্তু গৃহীত প্রকল্পগুলি রূপায়ণের ছবিটা কখনওই আশানুরূপ হয়নি। নরেন্দ্র মোদির বরাবরের দাবি, দেশের যাবতীয় দুর্দশার মূলে নেহরু-গান্ধী পরিবার এবং কংগ্রেস। তাঁদের পার্টি অন্য সকলের চেয়ে আলাদা এবং তাঁরা প্রকৃত জনগণের সরকার উপহার দেবেন। বিদ্যুদয়ন প্রসঙ্গে জানানো যায়, মনমোহন সিং সরকারের দেশব্যাপী বিদ্যুদয়নের অন্যতম ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প ছিল রাজীব গান্ধী গ্রামীণ বৈদ্যুতিকীকরণ যোজনা। সেই প্রকল্পেরই নাম পালটে দেয় মোদি সরকার। সোজা কথায়, নতুন বোতলে পুরোনো মদ ঢেলে উল্লাস আহ্লাদের চেনা কারবারে মনোনিবেশ গোড়া থেকেই। আনা হয় দীনদয়াল উপাধ্যায় গ্রাম জ্যোতি যোজনা। এছাড়া নেওয়া হয় প্রধানমন্ত্রী সহজ বিজলি হর ঘর যোজনা (সৌভাগ্য)। ২০১৪ সালে ১০০ শতাংশ গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেন মোদি। পরে তা পূর্ণ সফল হয়েছে বলেই দাবি করা হয়। সম্প্রতি প্রকল্প দুটি নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ অডিট সংস্থা ক্যাগ যে রিপোর্ট সংসদে পেশ করেছে তা কিন্তু অন্য সাক্ষ্য দিচ্ছে। সেখানে তারা প্রকল্প দুটির ছত্রে ছত্রে আর্থিক অনিয়ম চিহ্নিত করেছে। 

Advertisement

১০০ শতাংশ গ্রামীণ বিদ্যুদয়ন দূর অস্ত, সংযোগের হার সরকারি দাবির ধারেকাছেও নেই। দীনদয়াল নামাঙ্কিত প্রকল্পের আওতায় মোট ৬০৫টি প্রকল্পকে রাখা হয়। ক্যাগ বলেছে, এগুলির মধ্যে ৪৯৪টি প্রকল্পই নিয়ম মেনে হয়নি। কী সেই অনিয়ম? কোন কোন গ্রামে প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, সেই ব্যাপারে যথাসময়ে তার যথাযথ সমীক্ষাই করা হয়নি। প্রতিটি রাজ্যে তৈরি হয়েছিল একটি করে কমিটি। প্রকল্প শুরুর আগে তার গুণমান যাচাইয়ের পাশাপাশি, ডিপিআর তৈরির সংস্থা নির্বাচন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব ছিল ওই কমিটিগুলির। কিন্তু বাস্তবে রাজ্যগুলিকে এড়িয়েই দিল্লিতে ডিপিআর জমা পড়েছে। সেগুলি গৃহীতও হয়েছে অম্লান বদনে। ক্যাগের পর্যবেক্ষণ, একাধিক রাজ্যে এই প্রকল্পের অধীনে প্রায় ৫৪২ কোটি টাকা কেন্দ্র আগেভাগেই পেমেন্ট করেছে। অথচ সেসব ক্ষেত্রে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট এজেন্সি নিয়োগ করা হয়েছে পেমেন্টের ৩৬০ দিন পর। অর্থাৎ নিয়মমাফিক প্রাথমিক কাজকর্ম সম্পন্ন হওয়ার বহু আগেই ১,৬০৪ কোটি টাকা পেমেন্ট করেছে দিল্লি। ‘সৌভাগ্য’-এর বাস্তব ছবিটা কেমন? ক্যাগের পর্যবেক্ষণ এইরকম: এই প্রকল্পে ৩ কোটি বাড়িতে বিদ্যুৎ যাওয়ার কথা। আগের বক্তব্য থেকে সরে এসে কেন্দ্র পরে জানায়, ৩ নয়, ২.৬৩ কোটি বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হবে। এরপর দিল্লির কর্তারা সরকারিভাবে ঘোষণা করেন যে, ২০১৯-এর মার্চের মধ্যেই নাকি তাঁরা ওই লক্ষমাত্রা পূরণ করে ফেলেছেন। অর্থাৎ প্রকল্প রূপায়িত হয়েছে ১০০ শতাংশই! কিন্তু ক্যাগের বক্তব্য, ওইসময়ে বাস্তবে ১.৫২ কোটি বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ কেন্দ্র দিয়েছিল। অর্থাৎ সরকারের দাবি ও বাস্তবের মধ্যে যে ফারাক তা বিরাট। আসলে সাত রাজ্যের ১৯ লক্ষাধিক গৃহ এখনও অন্ধকারে ডুবে (বিদ্যুৎহীন) রয়েছে। 
দীনদয়ালের নামাঙ্কিত প্রকল্প ও সৌভাগ্য প্রকল্পের মধ্যে যেকোনও একটির মাধ্যমে গ্রামবাসীদের বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ পাওয়ার কথা। সমীক্ষায় প্রকাশ, প্রায় ১৭ হাজার বাড়িতে যুগপৎ দুটি প্রকল্পে নাকি বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে! অর্থাৎ, বাস্তবে একবার সংযোগ দিয়ে দুটি প্রকল্পের টাকা নিয়েছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সংস্থা। এমনকি, বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাগুলির একাংশকেও একই কাজের জন্য দু’বার পেমেন্ট করা হয়েছে। সৌভাগ্য-এর খরচ বাবদ কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে যখন ৩৫০ কোটিরও বেশি টাকা পড়েছিল, তখন তারা চড়া সুদে বাজার থেকে ঋণ নিয়েছিল ৫০০ কোটি টাকা! যদিও নিয়মানুযায়ী তার জন্য বাজেট অনুমোদন নেওয়া হয়নি। অথচ প্রকল্প শেষে তার থেকে মাত্র ৯৫ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। ক্যাগের পর্যবেক্ষণ, বাদবাকি টাকা স্রেফ পড়ে আছে। অথচ তার জন্য চড়া সুদ গুনতে হচ্ছে মোদি সরকারকে। হায় রে মোদির ‘স্বচ্ছ ভারত’! রঙিন পোশাকে মুখে চওড়া হাসি নিয়ে ঝাড়ু হাতে পোজ দেওয়াটাই  নরেন্দ্র মোদির মূল লক্ষ্য। কারণ ভোটের বাজারে এই ছবি ভালোই বিকোয়। প্রধানমন্ত্রী পদে তাঁর হ্যাটট্রিকের পিছনে এই ছবির মাহাত্ম্য সত্যিই অপরিমেয়। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও আর্থিক সংস্কার যে প্রচার-পুস্তিকা বা ইস্তাহার (থুড়ি সংকল্পপত্র) সামগ্রীর ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি তা পরিষ্কার। সামান্য একটি বিদ্যুদয়ন প্রকল্পের ‘ময়নাতদন্ত’ করে ক্যাগ সেটাই বেআব্রু করে ছেড়েছে। বস্তুত মোদি সরকারের এটা একটা শোরুম মাত্র, গোডাউনের চেহারা ভয়াবহ, দুর্গন্ধে নিশ্চিত মাথা ঘুরে যাবে দেশবাসীর।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ