অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: দৈনন্দিনের খাদ্য তালিকায় লুকিয়ে বার্ধক্যরোধের মূল চাবিকাঠি! এটা মোটামুটি সবারই জানা। কিন্তু, মানবদেহের ‘পাওয়ার হাউস’ মাইটোকনড্রিয়াকে সতেজ, সবল রাখতে সুনির্দিষ্টভাবে কোন কোন খাদ্যসামগ্রী অনুঘটকের কাজ করে, সেটা জানতে পারলেই কেল্লাফতে! বয়স বাড়তে চাইবে না আর কিছুতেই। যেমন, সজনে পাতায় এমন কিছু উপাদান রয়েছে, যা মাইটোকনড্রিয়ার উপর দুর্দান্ত প্রভাব ফেলে। এ ছাড়াও নানাপ্রকার ফল, শাক-সবজি সহ বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রীতে রয়েছে বায়ো-অ্যাকটিভ উপাদান। কিন্তু, এগুলি সরাসরি খেলে খুব একটা কার্যকর হয় না। তা হলে উপায়? সেটাই খুঁজছেন বিশ্বের একদল প্রথিতযশা বিজ্ঞানী। নেতৃত্বে রয়েছেন বাঙালি বিজ্ঞানী ডঃ অসীমকান্তি দত্তরায়। বাড়ি নদীয়ার গাংনাপুরে হলে বর্তমানে অসীমবাবু থাকেন নরওয়েতে। সেখানকার ওসলো বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষক, অধ্যাপক। তাঁর গবেষণার মূল বিষয়, দৈনন্দিনের খাদ্যসামগ্রী থেকে বায়ো-অ্যাকটিভ উপাদান থেকে নির্যাস বের করে মানব দেহের ‘পাওয়ার হাউস’-এর শক্তি বৃদ্ধির একটা মডিউল আবিষ্কার করা। নরওয়ের ল্যাবরেটরিতে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে বাংলার সজনে পাতা।
অসীমবাবু জানিয়েছেন, ভ্রূণ থেকে বার্ধক্য—গোটা জৈবিক প্রক্রিয়ায় অন্যতম কাণ্ডারি জীবকোষের মাইটোকনড্রিয়া। এটি আসলে দ্বিস্তরীয় বিশিষ্ট পর্দা দ্বারা আবৃত উপঙ্গকণা। ইউক্যারিওটিক কোষের সাইটোপ্লাজমে থাকে। যা আদতে মানবদেহের মূল শক্তির আধার। ছেলেবেলায় মাইটোকনড্রিয়া যেভাবে সতেজ ও সবল থাকে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা কমে যা। কোষের উপর স্ট্রেস বাড়ায়। তার দরুণ মানব দেহে আস্তে আস্তে বার্ধ্যকের ছাপ পড়তে থাকে। তাই এই কোষীয় উপাদানের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারলেই রুখে দেওয়া যাবে বয়স। একাধিক প্রাক-ক্লিনিক্যাল এবং ক্লিনিক্যাল উভয় ধরনের গবেষণতেই দেখা গিয়েছে যে, বিভিন্ন বায়ো-অ্যাকটিভ যৌগ উপাদান বার্ধক্য এবং বিশেষ করে হৃদরোগজনিত বার্ধক্য কমাতে সহায়তা করে।
বার্ধক্য হলো একটি জটিল জৈব প্রক্রিয়া। যা ধীরে ধীরে শরীরের কাজ করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। কোষগুলোর শক্তি ও সহনশীলতার অধঃগমণ শুরু হয়। দীর্ঘস্থায়ী রোগ প্রতিরোধে মানব শরীরকে অসহায় করে তোলে। সেক্ষেত্রে কোষের সুস্থতা বজায় রাখতে পারলেই দীর্ঘায়ু সুনিশ্চিত বলে মনে করছেন বাঙালি বিজ্ঞানী অসীমবাবু। তিনি জানিয়েছেন, বার্ধক্যের অগ্রগতি বিভিন্ন মৌলিক প্রক্রিয়ার দ্বারা প্রভাবিত হয়। যেমন, প্রদাহজনিত ক্রিয়াকলাপ, কোষের অভ্যন্তরীণ অক্সিডেটিভ ভারসাম্যহীনতা, এপিজেনেটিক স্থায়িত্বের হ্রাস, টেলোমিয়ারের সংক্ষিপ্ততা, কোষের বার্ধক্য, ডিএনএ’র ক্ষতি, প্রোটিন হোমিওস্ট্যাসিসের ব্যাঘাত, মাইটোকনড্রিয়ালে কার্যকরী ক্ষমতা হ্রাস, পুষ্টি সংবেদনশীলতার অসামঞ্জস্য, কোষের মধ্যে ত্রুটিপূর্ণ সংকেত প্রেরণ এবং মাইক্রোবিয়াল ডিসবায়োসিস।
অসীমবাবু বুধবার ওসলো থেকে ফোনে বলেন, ‘আমি বর্তমানে এমন কিছু পুষ্টি উপাদান এবং ওষুধ নিয়ে গবেষণা করছি, যেগুলি বার্ধক্যের প্রক্রিয়াকে ধীর করতে বা উল্টে দিতে পারে। এই উপাদানগুলি মূলত কোষের ভেতরে কাজ করে এবং শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যে থাকা বায়ো-অ্যাকটিভ উপাদানগুলির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। কারণ, এগুলি বার্ধক্যের সঙ্গে জড়িত নানা শারীরিক প্রক্রিয়ায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব ফেলে। এক্ষেত্রে আমাদের বাংলার সজনে পাতার গুরুত্ব অপরিসীম। এই উপাদানটিও আমাদের গবেষণায় রয়েছে।’ অসীমবাবু গবেষণার পাশাপাশি আরও একটি গুরুদায়িত্ব পালন করেন। প্রতিবছর নোবেল কমিটিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বছরের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারগুলির খোঁজ দেন। এছাড়াও বিশ্বখ্যাত ফুড অ্যান্ড রিসার্চ জার্নালের মুখ্য সম্পাদকও। অসীমবাবুর নামে রয়েছে পাঁচটি আন্তর্জাতিক পেটেন্ট। কয়েক বছর আগে হার্ট অ্যাটাকের সমস্যা ঠেকাতে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পন্ন অ্যাস্পিরিণের বদলে টম্যাটো ও কিউই ফলের মধ্যে তিনি একটি কমপাউণ্ডের হদিশ দিয়েছিলেন। তিনশোর বেশি রিসার্চ পেপার রয়েছে অসীমবাবুর।