ভারতে ট্রেনযাত্রা আনন্দসফর হয়ে উঠতে পারে খুব কম সময়েই। দূরপাল্লার ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটে আকছার। বস্তুত রেলভ্রমণের এক আতঙ্কই তাড়া করে বেড়াচ্ছে আমাদের। ১২ অক্টোবর, ২০২৪। রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানান, গত পাঁচবছরে দেশে দুশো বড় মাপের রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। আর ওইসব ঘটনায় প্রাণ গিয়েছে ৩৫১ জনের। ওইসব ঘটনায় ৯৭০ জন যাত্রী গুরুতর জখমও হয়েছেন। ভারতীয় রেলের ১৭টি জোনে বর্তমানে রেলভ্রমণের এই ভয়াবহতা তুলে ধরার পাশাপাশি বৈষ্ণব দাবি করেন, ছবিটা আগে আরও ভয়াবহ ছিল। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলেন, ‘রেলের রিপোর্ট অনুসারে, দশবছর আগে দেশজুড়ে বছরে রেলদুর্ঘটনার বার্ষিক সংখ্যা ছিল ১৭১! সংখ্যাটি এখন ৪০-এ নেমে এসেছে।’ প্রাণহানির বিপদ শুধু দূরপাল্লার রেল দুর্ঘটনাতেই আর সীমাবদ্ধ নয়—লোকাল ট্রেনযাত্রাও কিয়দংশে বিপজ্জনক, এমনকী প্রাণঘাতীও হয়ে উঠেছে। যেমন গত ৯ জুন মুম্বইয়ের কাছে মহারাষ্ট্রের থানে এলাকায় কিছু ট্রেনযাত্রী চূড়ান্ত দুর্ভাগ্যের শিকার হয়েছেন। দিনটি ছিল সপ্তাহ আরম্ভের, সোমবার। ব্যস্ত সময়ে লোকাল ট্রেনে যে ভিড় হয় তা এককথায় উপছে পড়া। এদিনও তেমন দুটি চলন্ত ট্রেন থেকে কয়েকজন যাত্রী নীচে পড়ে যান। তাতে চারজন নিহত এবং ন’জন গুরুতর জখম হন। ট্রেন দুটি একটি বাঁক ধরে পাশাপাশি ছুটছিল। তখনই ফুটবোর্ডে দাঁড়ানো কিংবা ঝুলন্ত অবস্থার যাত্রীরা দুর্ঘটনার শিকার হন। এই ঘটনার পরই রেলবোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছে, মুম্বইয়ে আগামী দিনে যত নতুন ট্রেন দেওয়া হবে সেগুলিতে দরজা বন্ধের স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা থাকবে। আর পুরনো ট্রেনগুলিতেও যাতে একই ব্যবস্থা করা যায় সেইমতো বগিগুলির সংস্কার করা হবে। এই প্রসঙ্গে জানানো যায় যে, মুম্বই শহরতলি এলাকার লোকাল ট্রেনগুলিতে দৈনিক ৭৫ লক্ষ যাত্রী যাতায়াত করেন। তবে রেলযাত্রার এই ভয়াবহতা নিয়ে মোদি সরকারকে এবার ভীষণ অস্বস্তিতে পড়তে হয়। বিশেষ করে রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতারা সরকারের অকর্মণ্যতার কঠোর সমালোচনা করেন।
এরপরই এল সুখবর—অদূর ভবিষ্যতে শিয়ালদহ এবং হাওড়া শাখায় ১৬ বগির লোকাল ট্রেন চলবে। ৯ বগির ট্রেন এখন অতীত। শিয়ালদহ এবং হাওড়া শাখায় যত লোকাল ট্রেন চলাচল করছে তার বেশিরভাগই ১২ বগির। তারপরও অবশ্য নিত্যযাত্রীদের সুরাহা হয়নি। দিনের ব্যস্ত সময়ে ভিড়ের চাপে লোকাল ট্রেনের দরজায় বাদুড়ঝোলা হয়ে চলাই দস্তুর আজও। বস্তুত প্রাণ হাতে নিয়েই গন্তব্যে যাতায়াত করতে বাধ্য হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ। সেই ভোগান্তির কাল শীঘ্রই ফুরতে পারে, ইঙ্গিত দিয়েছে মন্ত্রক। ১৬ বগির লোকাল ট্রেন চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা। মঙ্গলবার হরিয়ানার মানেসরে এমনই সুসংবাদই দিয়েছেন স্বয়ং রেলমন্ত্রী। বৈষ্ণব জানান, পরিস্থিতিবিশেষে আরও এগিয়ে পদক্ষেপ করবে তাঁর মন্ত্রক। ২০ কোচের লোকাল ট্রেনও চালাবার পথে হাঁটবে তারা। মুম্বইতে দুর্ঘটনায় যাত্রীমৃত্যুর প্রেক্ষিতেই লোকালের কামরা বৃদ্ধির এই ঘোষণা বলে মনে করা হচ্ছে। মঙ্গলবার মানেসরে গতিশক্তি কার্গো টার্মিনালের উদ্বোধন করেন বৈষ্ণব। সেখানেই তাঁর ঘোষণা, ১৬ এবং ২০ কোচের এমন মোট ১০০টি মেইন লাইন ইএমএউ মেমু ট্রেন তৈরি করা হবে। বর্তমানে লোকাল ট্রেনগুলি প্রধানত ৮ এবং ১২ কোচের। এগুলিতে কোচের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হলে যাত্রীরা আরও স্বচ্ছন্দে যাতায়াত করতে পারবেন। তেলেঙ্গানার কাজিপেটে রেলের নতুন কারখানা চালু হবে শীঘ্রই। সেখানেই বেশি বগির মেইন লাইন ইএমএউ মেমু ট্রেন তৈরি করা হবে।
মন্ত্রক সূত্রে এও স্পষ্ট করা হয়েছে, শুধুমাত্র কোনও একটি শহরের জন্য নয়, মুম্বই, কলকাতা, দিল্লিসহ সারা দেশই এই সুবিধা পাবে। বিপর্যস্ত কলকাতা এবং শহরতলির বাসিন্দারা যে এতে বিশেষভাবে উপকৃত হবেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বভাবতই বাংলার সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের মধ্যে বিশেষ উৎসাহ লক্ষ করা গিয়েছে। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন, দেশজুড়ে লোকাল ট্রেনের কামরা বৃদ্ধির এই সময়োচিত সিদ্ধান্ত ঠিক কবে কার্যকর হবে? তখন পরিষেবায় ঘনঘন খামতি দেখা দেবে না তো? এইসব সংশয়, শঙ্কা দূর করার একটাই রাস্তা—পরিকাঠামোর প্রয়োজনীয় সংস্কার। ১৬ বা ২০ বগির ট্রেন দাঁড়াবার উপযোগী প্ল্যাটফর্ম সব স্টেশনে নেই। পর্যাপ্ত শেড, বসার জায়গাসহ প্ল্যাটফর্মগুলি তাড়াতাড়ি সেইমতো আপগ্রেড করে ফেলতে হবে। যাত্রীসাধারণের প্রত্যাশা থাকবে, রেলমন্ত্রীর ঘোষণার দ্রুত বাস্তবায়নে এই কাজ আন্তরিকতার সঙ্গেই সম্পন্ন হবে। নিরাপদ লোকাল ট্রেন সার্ভিসের উপরেই কোটি কোটি ভারতবাসীর রুটিরুজি বহুলাংশে নির্ভরশীল।