Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

শাসক...অধিকার রক্ষা করতে বাঙালি জানে

প্রায় ১৫ বছর ধরে কটক-খুড়দায় মশারি আর বেডশিট ফেরি করেন ইন্তাজ আলি। পূর্ব মেদিনীপুরের বসন্তচক গ্রাম থেকে পাড়ি জমান পাশের রাজ্যে।

শাসক...অধিকার রক্ষা করতে বাঙালি জানে
  • ১৫ জুলাই, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

শান্তনু দত্তগুপ্ত: প্রায় ১৫ বছর ধরে কটক-খুড়দায় মশারি আর বেডশিট ফেরি করেন ইন্তাজ আলি। পূর্ব মেদিনীপুরের বসন্তচক গ্রাম থেকে পাড়ি জমান পাশের রাজ্যে। বিক্রিবাটা করেন। ফিরে আসেন একগাল হাসি নিয়ে। তাতে লুকিয়ে থাকে উপার্জনের স্বস্তি, আর পরিবারের স্বপ্নপূরণ। কিন্তু দেড় দশক পর হঠাৎ ওড়িশা সরকারের মনে হয়েছে, ইন্তাজ আলি লোকটা ভারতীয় নাও হতে পারে। পূর্ব মেদিনীপুরে বাড়ি! আধার-ভোটার কার্ড আছে! তাতে কী? বাংলায় কথা বলে। এটাই তাঁর অপরাধ। ডাক পড়েছিল তাঁর থানায়। যাচাই হবে নাগরিকত্ব। পুলিস দেখবে, কখন এবং কোন বর্ডার দিয়ে তাঁকে ধাক্কা মেরে পাঠিয়ে দেওয়া যায় পড়শি দেশে। ততদিন? আটকে থাকবেন ইন্তাজ আলি। নাম হয়তো তার ডিটেনশন ক্যাম্প নয়, কিন্তু ইন্তাজ আলি বন্দি তেমনই এক গারদে। যেখানে স্বাধীনতা নেই, সম্মান নেই, নাগরিকত্ব নেই।

Advertisement

রাজ্যে রাজ্যে বাঙালি বিরোধী যেন একটা হিড়িক উঠেছে। কখনও ওড়িশা, কখনও দিল্লি, কখনও অসম, কখনও মহারাষ্ট্র বা রাজস্থান। তবে বাঙালি বিরোধিতায় অসমের বিজেপি সরকার যে ‘সাফল্য’ ও ‘দক্ষতা’ দেখিয়ে চলেছে, হিমন্ত বিশ্ব শর্মা মোদিরত্ন-টত্ন কিছু একটা পেলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না। জিপিওর সামনে কত রকমের ফর্ম বিক্রি হয়, এটার ফর্মও নিশ্চয়ই পাওয়া যাবে। তিনি তাতে লিখতে পারবেন, কীভাবে সেই স্বাধীনতা পরবর্তী হিংসার যুগে অসমকে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। বাঙালিদের ভোটে জিতেও কীভাবে বাংলাভাষীদের ভিটেমাটিহীন করে ছেড়েছেন। ঘোষণা করেছেন, ‘মাতৃভাষা বাংলা লেখা মানেই সে বিদেশি।’ বাংলাদেশি। এভাবেই তিনি অসমকে বাঙালিশূন্য করবেন। কিন্তু হিমন্তবাবু হয়তো ভুলে যাচ্ছেন, তাঁর রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ বাঙালি। আজ থেকে নয়। প্রায় ১০০ বছর ধরে। তিনসুকিয়ায় বাঙালি থাকেন প্রায় ৭৫ হাজার। ডিব্রুগড়ে ৫০ হাজার। গুয়াহাটির প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষই বাঙালি। বিধানসভা কেন্দ্রের নিরিখে হিসেব কষলে সর্বত্র ২০ থেকে ২৫ হাজার বাঙালি ভোটার মিলবেই। তা সত্ত্বেও অসমের মুখ্যমন্ত্রীর লক্ষ্য একটাই—বাঙালির হাতে ও ভাতে মারা। তাই তাঁর ঘোষণা, অসমের রাজ্য ভাষা একটাই—অসমিয়া। নিশ্চিহ্ন করে দাও বাংলাকে। ভুলিয়ে দাও সেই ভাষা আন্দোলন। গুলিতে লুটিয়ে পড়া ১১টা প্রাণ। ট্রেন চেপে পশ্চিমবঙ্গে পালিয়ে আসার সময় সেই আক্রমণ। লুটপাট। চিরকালের মতো নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বাঙালি মেয়েরা। হিমন্তবাবু ফিরিয়ে আনতে চান গোপীনাথ বরদলৈয়ের সেই সাংবাদিক সম্মেলন। যেখানে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘অসমিয়াই একমাত্র সরকারি ভাষা। স্কুলেও শুধু এই ভাষা ব্যবহার হবে। পড়ানো হবে। এতেই নির্দেশ দেওয়া হবে।’ হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ফিরিয়ে আনতে চান ১৯৪৭ সালের ৫ নভেম্বর। সেদিন তৎকালীন রাজ্যপাল আকবর হায়দরি তাঁর ভাষণে বাঙালিকে সরাসরি ‘বহিরাগত’ বলেছিলেন। এনআরসি সেই ঘৃণা এবং আগ্রাসনের আগুনে ঘি ঢেলেছিল মাত্র। আর তাকে হাতিয়ার করে গত কয়েক বছর ধরে লাগাতার চলছে ‘বাঙালি খেদা’ কর্মসূচি। যা এক সময় ছিল শুধু আগ্রাসনের ফসল, হিংসার বহিঃপ্রকাশ... এখন সেটাই আইনসিদ্ধ। ফলে উপড়ে ফেলো বাঙালিকে। মৌলিক অধিকার? সেটা বাঙালির জন্য নয়। অসমে নয়। বিহারে নয়। মহারাষ্ট্রে নয়। দিল্লিতেও নয়। পশ্চিমবঙ্গ ১১টি ভাষাকে রাজ্যে স্বীকৃতি দিতে পারে। গুজরাত তিন-চারটি ভাষাকে মান্যতা দিতে পারে। অসম বাংলা ভাষাকে নয়। কেন এই নিরাপত্তাহীনতা? মেধায় বাঙালি এগিয়ে বলে? রাজনীতিতে বাঙালির কাছে বিভেদের ফর্মুলা খাটে না বলে? সেই কারণে একটা রাজ্যকে ভেঙে দেওয়ার ষড়যন্ত্র কষতে হবে? ধুলোয় মিশিয়ে দিতে হবে জাত্যভিমান? পদে পদে বোঝানো হবে যে, এই দেশে আমরা থার্ড গ্রেডেড নাগরিক? নাকি নাগরিকই নই? এই অধিকার একটা সাম্প্রদায়িক দলকে কে দিয়েছে? এই দেশের স্বাধীনতায় বাঙালির যা অবদান, তার একচুলও তাদের নেই। দেশ কাকে বলে আদৌ বোঝে কি তারা? এই প্রশাসনিক অপদার্থরা মনে করে, পশ্চিমবঙ্গ নামে একটা রাজ্য যে ভারতের মানচিত্রে নেই। আছে শুধু সীমান্তের ওপারের একটা দেশ—বাংলাদেশ। বাংলায় যারা কথা বলে, তারাই বাংলাদেশি। কাঁটাতার পেরিয়ে তারা এদেশে ঢুকেছে। ভোটার কার্ড, আধার নম্বর জোগাড় করেছে। তারপর সেই ভুয়ো পরিচয়পত্র হাতে নিয়ে ড্যাংড্যাং করে সর্বত্র ঘুরছে। গল্পে গোরু গাছে ওঠে বলে শুনেছি, কিন্তু ডাবল ইঞ্জিনের এই তত্ত্বে গোরুর পাখনা গজালেও অবাক বোধ হবে না। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি এই ধারণা থুপে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। দক্ষিণ ভারতের কোনও রাজ্যে নয়, কংগ্রেস বা আম আদমি পার্টির প্রশাসনও নয়। এটা কেন? রহস্যটা কী? অমিত শাহের দাবিপূরণ? এনআরসির দাবি? বিজ্ঞপ্তি জারি করে, ঢাকঢোল পিটিয়ে গোটা দেশে এনআরসি যে চাপানো যাবে না, সেটা আমাদের মহামান্য ভারত সরকার ভালোই বুঝে গিয়েছে। আর সত্যি বলতে, গোটা দেশ বিজেপির লক্ষ্যও নয়। পাখির চোখ একটিই—বাংলা। এ রাজ্য গেরুয়া বাহিনীকে ক্ষমতার স্বাদ পেতে দেয় না। এই রাজ্য হিন্দু-মুসলিম বিভেদের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। এই রাজ্য জাতপাতের ভিত্তিতে ভোট দেয় না। তাহলে উপায়? ভোটব্যাঙ্কের কোমরটাই ভেঙে দিতে হবে। প্রমাণ করতে হবে, মুসলিম বাঙালি মানেই বাংলাদেশি। সুযোগ আছে। বাংলার হাজার হাজার মুসলিম নাগরিক ভিন রাজ্যে কাজে যান। কেউ ফেরি করতে, কেউ মিস্ত্রির কাজে, কেউ জোগাড়ে, কেউ জরি বা সোনার কাজ নিয়ে। তাঁদের ধরে ধরে পুশব্যাক করে দিলেই তো কেল্লাফতে। উপরন্তু ইন্টেনসিভ রিভিশন শুরু হচ্ছে বাংলায়। ইতিমধ্যেই বুথ লেভেল অফিসাররা বিহারে ‘প্রমাণ’ করে দিয়েছেন—দিকে দিকে বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গা রয়েছে। এটা অবশ্য হওয়ারই ছিল। কারণ, সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে দিন কয়েক আগেই শুনিয়ে দিয়েছে, নাগরিকত্ব স্থির করাটা আপনাদের কাজ নয়। ওটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক দেখবে। কিন্তু অমিত শাহের মন্ত্রক সেটা পারছে কই? সিএএ-এনআরসির ধুয়ো তুললেই বিক্ষোভ আন্দোলন দানা বাঁধছে। ভোট কমছে রাজ্যে রাজ্যে। তাই পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়তেই হবে। তাদের কাছে দেশ শব্দের অর্থ একটা আবেগ নয়, মানুষ নয়, সংস্কৃতি নয়। এই স্বার্থান্বেষী রাজনীতির কারবারিরা দেশ বলতে বোঝে ক্ষমতা, ভোটব্যাঙ্ক, নিজস্ব মতাদর্শ কায়েম। কাকে বলে ‘দেশ’? যথার্থ চিনেছিলেন তো এক বাঙালিই। তিনি লিখেছিলেন, ‘চিরদিন ভারতবর্ষে এবং চীনদেশে সমাজতন্ত্রই প্রবল, রাষ্ট্রতন্ত্র তার 
নিচে। দেশ যথার্থভাবে আত্মরক্ষা করে এসেছে সমাজের সম্মিলিত শক্তিতে। সমাজই বিদ্যার ব্যবস্থা করেছে, তৃষিতকে জল দিয়েছে, ক্ষুধিতকে অন্ন, পূজার্থীকে মন্দির, অপরাধীকে দণ্ড, শ্রদ্ধেয়কে শ্রদ্ধা— গ্রামে গ্রামে দেশের চরিত্রকে রক্ষিত এবং তার শ্রীকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।’ এই বাঙালির নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর থেকে বড় রাজনীতিক ক’জনকে পেয়েছে ভারত? বাকিদের সঙ্গে তাঁর ফারাক ছিল একটাই—তিনি রাজনীতি বলতে মানুষ বুঝতেন। সমাজ বুঝতেন। বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে পথে নামতেন। বিভেদের রাজনীতিকে উড়িয়ে দিয়ে হিন্দু-মুসলিমের হাতে বেঁধে দিতেন রাখি। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে হেলায় ত্যাগ করতেন নাইট উপাধি। কারণ তিনি জানতেন, এর প্রভাব ছড়াবে বিশ্বময়। এই দুনিয়া জানবে বাঙালির মাহাত্ম্য। বাঙালি যেমন অস্ত্র তুলে নিতে পারে, ঠিক তেমনই বিনা হাতিয়ারে জবাব দিতে পারে শাসককে। মুখের উপর। নিজেকে, নিজের ভাষাকে, জাত্যভিমানকে, অহংকে রক্ষা করতে বাঙালি জানে। 
আজ যখন বাঙালির বেঁচে থাকার অধিকারই একদল রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত স্রেফ প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে... এগিয়ে আসতে হবে আমাদেরই। রবি ঠাকুরই লিখে গিয়েছেন, ‘যারা নিজেদের রক্ষা করতে পারে না, দেবতা তাদের সহায়তা করেন না। দেবাঃ দুর্বলঘাতকাঃ। দুর্বলতা অপরাধ। কেননা, তা বহুল পরিমাণে আত্মকৃত, সম্পূর্ণ আকস্মিক নয়। দেবতা এই অপরাধ ক্ষমা করেন না।’ 
বাঙালির জন্য বাঙালিকেই জাগতে হবে। বাপের বাড়ি বাংলায় বলে যে আরতিকে বরপেটায় স্বামীর 
ঘর ছেড়ে আসতে হয়, তাঁকে পৌঁছে দিতে হবে সেখানেই। কোনও নুর মহম্মদ বা আজিমুদ্দিন শেখকে যেন ভিন রাজ্যের পুলিস থানায় ডেকে নিয়ে যাওয়ার আগে দশবার ভাবে। তাঁদের ফোন কেড়ে নেওয়ার ভাবনা যেন তাদের দুঃস্বপ্নেও না আসে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারকে না জানিয়ে দিল্লি বা মহারাষ্ট্র পুলিস যেন রাতবিরেতে বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে কোনও বাঙালিকে পার করে দিতে না পারে। এই দায়িত্ব যতটা এ রাজ্যের সরকারের। ততটা আমাদেরও। ভদ্রতা, সৌজন্য, সাহিত্য, সংস্কৃতিতে যেমন আমাদের জুড়ি নেই, ঠিক তেমনই প্রয়োজনে প্রতিরোধও বাঙালি করতে পারে। ইতিহাস সাক্ষী... শাসক যুগে যুগে সেই আঘাত মনে রেখেছে।  

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ