সভ্যতার অগ্রগতির নিদর্শন বিজ্ঞানের নানা শাখার উন্নতি। জীবনকে সহজ ও সুন্দর করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আশীর্বাদে আমাদের জীবনযাপন শুধু আরামদায়ক হয়নি, মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে ক্রমান্বয়ে। এজন্য যার অবদান সবচেয়ে বেশি সে হল চিকিৎসা বিজ্ঞান। এমন একটা সময় ছিল যখন সামান্য জ্বর, সর্দিকাশিও হত মানুষের মৃত্যুর কারণ! পক্স, কলেরা, টাইফায়েড, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা (টিবি) প্রভৃতি রোগ হলে তো কথাই নেই। বাঁচানো দূর, ক্যানসার রোগের ফলপ্রসূ চিকিৎসা শুরু করার কথাও ভাবা যেত না। বহু সম্পন্ন পরিবারের সদস্য, এমনকি রাজা-বাদশা, বিখ্যাত ব্যক্তিকেও অকাল মৃত্যু মেনে নিতে হত। নিত্যনতুন ও উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতির উদ্ভাবন এবং ওষুধের আবিষ্কার মানব সভ্যতার সেই দুর্দিনকে ক্রমে দূরবর্তী করে তুলতে পেরেছে। যেকোনও চিকিৎসা পদ্ধতি এবং ওষুধ প্রথমে সাধারণ মানুষের নাগালে থাকে না। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই তা সাধারণের সাধ্যের মধ্যে চলে আসে। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে অবশ্যই কল্যাণকামী হতে হয়। কিন্তু বিজ্ঞান তার আলো যথারীতি জ্বেলে রাখলেও অন্ধকারই যে বহু মানুষের আমৃত্যু সঙ্গী হয়, তার জন্য দূরে তাকাবার দরকার পড়ে না—আমাদের প্রতিবেশে নজর করাই যথেষ্ট। বিজ্ঞানসাধকরা একের পর এক আবিষ্কার করেছেন নাওয়া-খাওয়া ভুলে, সর্বস্ব ত্যাগ করে, এমনকি জীবনের মায়াটুকুও। কিন্তু তাঁদের সেই মহৎ দান নিয়ে এক শ্রেণির লোক মানুষশোষণের ব্যবসা ফেঁদে বসেছে। ওষুধের কারবারকে কেন্দ্র করে ভারতজুড়ে চলছে এটাই।
একটি অ্যান্টি অ্যালার্জিক ওষুধ স্টকিস্ট এবং ডিস্ট্রিবিউটররা কেনেন ১ টাকা ৮৫ পয়সায়। সাধারণ মানুষের কাছে সেই ওষুধ বিক্রি করা হয় ২১ টাকায়! একটি নির্দিষ্ট ওষুধের কম্পোজিশন পাইকারি ব্যবসায়ী কিনেছেন ১১ টাকা ২৫ পয়সায়, আর সেটাই ১১৪ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে দোকানগুলি থেকে। অম্বলের (অ্যাসিডিটি ও গ্যাস) একটি ওষুধ কেনা পড়ে মাত্র ১৩ টাকা ৯৫ পয়সায়, আর সেটারই এমআরপি ফেলা হয় ১৭০ টাকা! ক্যালশিয়াম কার্বোনেটের মতো একটি এসেনশিয়াল সাপ্লিমেন্টের কথাই ধরা যাক। এই জিনিসটির কোনও একটি ব্র্যান্ডের স্টকিস্ট প্রাইস হল ১৬ টাকা ৯৫ পয়সা। কিন্তু তার এমআরপি যা ফেলা হয় তাতে সম্পন্ন ক্রেতারও পিলে চমকে দেওয়ার মতোই—৩২৭ টাকা! সর্দিকাশি থেকে ডায়াবেটিস, হাইপারটেনশন অথবা লাইফস্টাইল ডিজিজ প্রভৃতি রোগের চেনা ওষুধেই মার্জিন রাখা হচ্ছে কোনও ক্ষেত্রে ১০৩৮ শতাংশ, কোথাও আবার ১২৭২ শতাংশ! সোজা কথায়, চিকিৎসার অন্যতম প্রধান উপকরণ ওষুধ নিয়ে দেশজুড়ে দিনেদুপুরেই ভয়াবহ লুটপাট চলছে। এ তো একেবারে ‘বর্গি এল দেশে’! কিছু উদাহরণ তুলে ধরে এই রিপোর্ট দাখিল করেছে খোদ সংসদীয় স্ট্যান্ডিং কমিটি। নির্মম বাস্তব নিয়ে এই রিপোর্ট লোকসভায় পেশ হয়েছে সোমবার। তা থেকে জানা যাচ্ছে, প্রস্তুতকারকদের কাছ থেকে ওষুধ কেনেন পাইকারি বিক্রেতারা। তারপর তা যায় খুচরো বিক্রেতার কাছে বা ফার্মাসিতে। সাধারণ মানুষ তা সংগ্রহ করেন সেখান থেকে। প্রস্তুতকারক বা কোম্পানি থেকে পাইকারি কারবারি (স্টকিস্ট ও ডিস্ট্রিবিউটর) এবং ফার্মাসির মাঝেই ঘটে যাচ্ছে ভয়াবহ জাদু। যেন ছিল রুমাল হয়ে গেল বিড়াল! একই সস্তার ওষুধ শুধু একাধিক হাত ঘুরলেই হয়ে যাচ্ছে কয়েকশো গুণ দামি! সংসদের সংশ্লিষ্ট কমিটি স্বভাবতই সরাসরি প্রশ্ন তুলে দিয়েছে, সরকার তাহলে করছেটা কী?
সোমবার সংসদের শীতকালীন অধিবেশনের প্রথম দিনেই লোকসভায় পেশ করা হয়েছে সার ও রাসায়নিক মন্ত্রক সংক্রান্ত স্ট্যান্ডিং কমিটির রিপোর্ট। রিপোর্টের শিরোনাম প্রাইস রাইজ অব মেডিসিনস ইন দ্য ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টর ইমপ্যাক্টিং দ্য লাইভস অব অর্ডিনারি সিটিজেনস অ্যাডভার্সলি। তাতে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, বিখ্যাত ওষুধ সংস্থাগুলির ব্র্যান্ডের দামের তারতম্য আকাশছোঁয়া। স্টকিস্টরা সরাসরি কোম্পানি থেকে যে দামে ওষুধ কেনেন, তাকে বলা হয় প্রাইস টু স্টকিস্ট (পিটিএস)। আর খুচরো বিক্রেতারা সেই ওষুধ যে দামে কিনে ফার্মাসিতে রাখেন, তার নাম প্রাইস টু রিটেলার (পিটিআর)। এই দুই ধাপ পেরিয়ে সেই ওষুধই যখন সাধারণ মানুষের কাছে আসছে, এমআরপি আর আগের দামের ধারেকাছে থাকছে না। পিটিএস থেকে এমআরপি—কয়েক ধাপেই ফারাক আশমান-জমিন কেন? কারা বিপুল মুনাফা লুটছে? এদের পিছনে কোন মহানরা? সাধারণ মানুষের কথা বেমালুম চাপা পড়ে যাচ্ছে কোন জাদুতে? রাজনীতির কারবারিদের (বিশেষ করে শাসক দলের) ইঙ্গিত ছাড়া যে-দেশে গাছের পাতাও নড়ে না, সেই দেশে এই প্রশ্নের জবাব সরকার বাহাদুরের অজানা থাকার কথা নয়। তাই অবিলম্বে এর সুরাহা করতে হবে সরকারকেই। ভালোভাবে বাঁচার অধিকার সকলের, কোনও হীন কৌশলে সরকার তা কেড়ে নিতে পারে না।